একসময় বর্ষা এলেই হাঁটুসমান পানি জমে থাকত। ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে স্কুলে যেতে হতো শিশুদের, রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানো ছিল দুর্ভোগের নাম। বাজারে ব্যবসা করতে হতো অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। দেশের বহু পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের সাধারণ মানুষের কাছে এ ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। আজ সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
আধুনিক সড়ক, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিরাপদ ফুটপাত, পাবলিক টয়লেট, আধুনিক মার্কেট, সড়কবাতি, ঘাটলা এবং সবুজায়নের মাধ্যমে দেশের নগর জনপদে দৃশ্যমান পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে লোকাল গভর্নমেন্ট কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রজেক্ট (এলজিসিআরআরপি)। বাংলাদেশ সরকার ও The World Bank-এর যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে দেশের ৩২৮টি পৌরসভা ও ১১টি সিটি কর্পোরেশনে নাগরিক জীবনমান উন্নয়নে এটি একটি যুগান্তকারী উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে। যা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক হবে।
মানুষের জীবনে পরিবর্তনের গল্প: কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক মন্দা ও কর্মসংস্থানের সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এলজিসিআরআরপি শুধু অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রকল্পের আওতায় সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ২৮.৭০ লাখ জনদিনের অস্থায়ী কর্মসংস্থান, যার মধ্যে ৯.৩২ লাখ জনদিন নারীদের। অনেক পরিবার নতুন করে জীবিকা ফিরে পেয়েছে, সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পেরেছে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন পৌর এলাকায় এখন উন্নত সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে কমেছে জলাবদ্ধতা, সহজ হয়েছে যাতায়াত, বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান।
ইউএলজিআই কর্তৃক সমাপ্ত উপ-প্রকল্পের স্থিরচিত্র
উন্নয়নের দৃশ্যমান অর্জন: প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে প্রায় ২,৫৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন হয়েছে-প্রায় ১,৬৯০ কিলোমিটার আধুনিক সড়ক নির্মাণ যার মধ্যে জলবায়ু সহিঞ্চু ইউনিব্লক রোড ১৮৬ কিঃমিঃ; প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা; ৩৪ কি:মি: ফুটপাত; ৫৯৩ মি: কালভার্ট; ৫৩টি পাবলিক টয়লেট; ৫৫টি মার্কেট; ২৯টি ঘাটলা; ৬৫টি ডাস্টবিন; ৪৭৯৬টি সড়কবাতি; ১৭টি পার্ক; ৬০টি কবরস্থান; ১২টি শ্মশান; ১৩টি কমিউনিটি বিল্ডিং; ১৩টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র; ০১টি সাইক্লোন সেন্টার কাম বিদ্যালয় (চলমান); ১৭টি পার্ক; ১১টি পার্কিং এরিয়া; ৮৭৫০ মিঃ পানি সরবরাহ সংয়োগ লাইন; ৬৫০ বর্গমিটার লেক সাইড সৌন্দর্যবর্ধন; ০২টি ডিজিটাল সেন্টার; ১১২টি রোড সাইড প্রোটেকটিভ ওয়ার্ক; ১৫০০টি গাছ লাগিয়ে সবুজায়ন; ও অন্যান্য নাগরিক অবকাঠামো। বর্তমানে ৮৩৫টি প্যাকেজের অধীন ১৮৪৯টি উপ-প্রকল্প চলমান রয়েছে, যা ডিসেম্বর”২৬ নাগাদ শেষ হবে বলে আশা করা যায়। এতে করে অনেক মানুষ উন্নত নগর সেবা ও জীবনযাত্রার সুবিধা পাচ্ছেন বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জলবায়ু সহনশীল নগর গঠনে নতুন মাইলফলক: এলজিসিআরআরপির অন্যতম উদ্ভাবনী উদ্যোগ হলো লোকাল প্রিপেয়ার্ডনেস প্ল্যান (এলপিপি)। জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশের ৩৩৯টি নগর স্থানীয় সরকারের জন্য প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত ডিজিটাল ও জিআইএসভিত্তিক ঝুঁকি তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে। এই তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে প্রতিটি নগর এলাকার ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, অগ্রাধিকারভিত্তিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়ন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রকল্পভুক্ত সকল নগর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে চালু করা হয়েছে Integrated এফএম (Financial Management) এবং এমআইএস (Management Information System) সফটওয়্যার। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি, ব্যয় ও গুণগত মান রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া নাগরিক সেবা আরও সহজলভ্য করতে ওয়েবভিত্তিক পৌরসেবা সফটওয়্যারে ই-পেমেন্ট সুবিধা সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট সিটি গঠনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে এগিয়ে চলা: প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে বিলম্ব, প্রশাসনিক পরিবর্তন, স্থানীয় পর্যায়ে নীতি-নির্ধারকদের ঘন ঘন পরিবর্তন এবং নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটি সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৮৪.১৪ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৯০.২৫ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে সন্তোষজনক বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও “Satisfactory” রেটিং এর কারণে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নেও প্রকল্পটি বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল দেশের বিভিন্ন পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে বাস্তবায়িত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিদর্শন করে কাজের গুণগত মান ও অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
মানুষের জন্য, মানুষের অংশগ্রহণে: এলজিসিআরআরপির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বটম-আপ ও অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা পদ্ধতি। স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, নারী, যুবক, প্রবীণ ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের প্রতিটি বিনিয়োগ সরাসরি নাগরিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে।
একজন দক্ষ ও চৌকস প্রকৌশলী হিসেবে পরিচিত, প্রকল্প পরিচালক নাজমুস সাদাত মোঃ জিল্লুর রহমান বলেন, “জলবায়ু সহনশীল, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। দেশের নাগরিকদের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।”
তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য বিশ্বব্যাংক, স্থানীয় সরকার বিভাগ, অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি, ইআরডি, এলজিইডি এবং প্রকল্পভুক্ত সকল পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দেশের নগরায়ণের এই ক্রান্তিলগ্নে এলজিসিআরআরপি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীল নগর গঠন এবং একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ নির্মাণের এক অনন্য যাত্রা। হাজারো মানুষের হাসি, নিরাপদ চলাচল, উন্নত নাগরিক সেবা এবং নতুন সম্ভাবনার গল্পই আজ এলজিসিআরআরপির সবচেয়ে বড় সাফল্য।