
X
ডা. সামিনা আরিফ
প্রচলিত ভুল ধারণা ১: হাম একটি সাধারণ রোগ; এটি নিয়ে বিশেষ চিন্তার কোনো কারণ নেই।
বাস্তব তথ্য: হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মারাত্মক নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং এমনকি শিশুর মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।
প্রচলিত ভুল ধারণা ২: হাম শুধুমাত্র শিশুদের হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের নয়।
বাস্তব তথ্য: প্রাপ্তবয়স্কদেরও হাম হতে পারে। যারা শৈশবে হামে আক্রান্ত হননি, তারা সারা জীবনই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
প্রচলিত ভুল ধারণা ৩: শরীরে লাল র্যাশ (ফুসকুড়ি) উঠলেই নিশ্চিতভাবে হাম হয়েছে।
বাস্তব তথ্য: অ্যালার্জি, ডেঙ্গু বা রুবেলাসহ অন্যান্য রোগেও একই ধরনের র্যাশ হতে পারে। তাই উচ্চ জ্বর, তীব্র কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং অন্যান্য লক্ষণ বিবেচনা করে রোগ নির্ণয় করতে হয়।
প্রচলিত ভুল ধারণা ৪: হাম রোগীকে গোসল করানো বা শরীর মুছে দেওয়া যাবে না।
বাস্তব তথ্য: হামে শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যেতে পারে। কুসুম গরম পানিতে শরীর মুছে দিলে অস্বস্তি কমে এবং ত্বকে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ঝুঁকিও কমে।
প্রচলিত ভুল ধারণা ৫: হাম হলে স্বাভাবিক খাবার বন্ধ রেখে শুধু পানি খাওয়াতে হবে।
বাস্তব তথ্য: হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। বুকের দুধ পানকারী শিশুদের নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের নরম, পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার খেতে হবে, পর্যাপ্ত তরল পান করতে হবে এবং ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে, যা দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করে।
প্রচলিত ভুল ধারণা ৬: হাম রোগীকে বাতাস থেকে দূরে রাখতে হবে এবং সব জানালা-দরজা বন্ধ রাখতে হবে।
বাস্তব তথ্য: ঘরের সব জানালা-দরজা বন্ধ রাখলে ভাইরাস বাতাসে আটকে থাকতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই সরাসরি ঠান্ডা বাতাস এড়িয়ে ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
প্রচলিত ভুল ধারণা ৭: র্যাশের ওপর তেল, পাউডার বা ভেষজ রস লাগালে দ্রুত ভালো হয়।
বাস্তব তথ্য: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ত্বকে কোনো পদার্থ লাগালে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ এবং ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
প্রচলিত ভুল ধারণা ৮: পরিবারের একজনের হাম হলে অন্যদের সুরক্ষার জন্য কিছুই করার নেই।
বাস্তব তথ্য: রোগীকে আইসোলেশনে রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া, ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।
প্রচলিত ভুল ধারণা ৯: অ্যান্টিবায়োটিক হাম ভালো করে।
বাস্তব তথ্য: হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ। তাই অ্যান্টিবায়োটিক হামের চিকিৎসা নয়। কেবল চিকিৎসক যদি দ্বিতীয় কোনো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ শনাক্ত করেন, তখনই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
প্রচলিত ভুল ধারণা ১০: জ্বর কমে গেলেই রোগী স্কুল, কর্মস্থল বা বাইরে যেতে পারে।
বাস্তব তথ্য: র্যাশ ওঠার প্রায় ৪ দিন পর্যন্ত হাম রোগী অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। তাই এ সময় পর্যন্ত বাড়িতেই থাকা উচিত।
প্রচলিত ভুল ধারণা ১১: ভিটামিন 'এ' হাম প্রতিরোধ করে।
বাস্তব তথ্য: ভিটামিন 'এ' হাম প্রতিরোধ করে না। তবে হামে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এটি গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
প্রচলিত ভুল ধারণা ১২: র্যাশ দেখা দিলে আর চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ হাম নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।
বাস্তব তথ্য: অনেক রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও হাম থেকে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, পানিশূন্যতা এবং কানের সংক্রমণের মতো গুরুতর জটিলতা হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রচলিত ভুল ধারণা ১৩: সুস্থ ও পুষ্টিসম্পন্ন মানুষের গুরুতর হাম হয় না।
বাস্তব তথ্য: যে কেউ গুরুতর হামে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে ছোট শিশু, গর্ভবতী নারী, অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের ঝুঁকি বেশি।
প্রচলিত ভুল ধারণা ১৪: হাম শুধুমাত্র আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলেই ছড়ায়।
বাস্তব তথ্য: আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ভাইরাস ছড়ায়। এই ভাইরাস বাতাসে এবং বিভিন্ন পৃষ্ঠে প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। তাই হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ।
সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ-কাম-অধীক্ষক (ভারপ্রাপ্ত), বি. ফার্ম (অনার্স), এম. ফার্ম, এমবিএ (এইচআরএম), ডিএইচএমএস, ফেডারেল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
ফার্মগেট, ঢাকা।