
X
ফাইল ছবি
বর্তমানের ব্যস্ত ও প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাত্রায় সুস্থ থাকা যেন এক বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মব্যস্ততা, অনিয়মিত খাবার গ্রহণ, ফাস্টফুডের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং পর্যাপ্ত পানি পান না করার কারণে দিন দিন বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি।
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি, মৌসুমি ফলমূল এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি অন্তর্ভুক্ত করলে শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখা অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে। এই তিনটি উপাদান শুধু শরীরের পুষ্টির চাহিদাই পূরণ করে না, বরং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, হজমশক্তির উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। সবুজ শাক, লাল ও হলুদ রঙের সবজি, লাউ, কুমড়া, গাজর, টমেটো, শিম, বাঁধাকপি কিংবা ফুলকপির মতো সবজিতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ, খাদ্যআঁশ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এসব পুষ্টি উপাদান শরীরের কোষকে সুরক্ষা দেয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
শাকসবজিতে থাকা খাদ্যআঁশ হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত আঁশসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমে, অন্ত্রের কার্যক্ষমতা ভালো থাকে এবং শরীর থেকে বর্জ্য সহজে বের হয়ে যায়। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি থাকায় অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক।
অন্যদিকে, ফলমূলকে বলা হয় প্রকৃতির সবচেয়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর উপহার। বিশেষ করে মৌসুমি ফল শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। আম, জাম, লিচু, পেয়ারা, কলা, পেঁপে, তরমুজ, আনারস, কমলা, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ফলিক অ্যাসিড এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ত্বকের উজ্জ্বলতা বজায় রাখা, চোখের সুস্থতা রক্ষা এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করে।
পুষ্টিবিদরা ফলের রসের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ফল খাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ সম্পূর্ণ ফলে থাকা প্রাকৃতিক খাদ্যআঁশ রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়তে দেয় না এবং দীর্ঘ সময় শরীরে শক্তি জোগায়। এছাড়া ফলের প্রাকৃতিক পানি শরীরকে আর্দ্র রাখতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
পর্যাপ্ত পানি পান করা সুস্থ জীবনের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত। মানবদেহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পানি দিয়ে গঠিত। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি উপাদান পরিবহন, রক্ত সঞ্চালন, হজম প্রক্রিয়া সচল রাখা এবং বর্জ্য অপসারণ—সব ক্ষেত্রেই পানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, যার ফলে ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মনোযোগ কমে যাওয়া, প্রস্রাবের সংক্রমণ এবং কিডনিজনিত নানা সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। তবে আবহাওয়া, বয়স, শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই চাহিদা কম বা বেশি হতে পারে। গরমের দিনে কিংবা অতিরিক্ত পরিশ্রমের সময় শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে বেশি পানি বের হয়ে যায়, তাই সে সময় আরও বেশি পানি পান করা জরুরি।
অনেকেই তৃষ্ণা না লাগা পর্যন্ত পানি পান করেন না। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, তৃষ্ণা অনুভব করা মানেই শরীরে পানির ঘাটতি শুরু হওয়ার একটি সংকেত। তাই তৃষ্ণার অপেক্ষা না করে নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ভ্রমণের সময় সঙ্গে পানির বোতল রাখলে নিয়মিত পানি পান করা সহজ হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি মেশানো পানীয় কিংবা কৃত্রিম ফ্লেভারযুক্ত পানীয় কখনোই বিশুদ্ধ পানির বিকল্প হতে পারে না। বরং এসব পানীয় অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের মাধ্যমে স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই তৃষ্ণা মেটানোর সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর উপায় হলো বিশুদ্ধ পানি পান করা।
পরিবারে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। বিভিন্ন রঙের সবজি দিয়ে আকর্ষণীয়ভাবে খাবার পরিবেশন কিংবা ফল দিয়ে স্বাস্থ্যকর নাশতা তৈরি করলে শিশুরা সহজেই এসব খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে পরিবারের বড়দের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শিশুদের জন্য ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে কাজ করে।
বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও শাকসবজি, ফলমূল ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হজমশক্তি কমে যায় এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। তাই সহজপাচ্য সবজি, আঁশসমৃদ্ধ ফল এবং নিয়মিত পানি পান নিশ্চিত করলে তাদের সুস্থতা বজায় রাখা সহজ হয়।
পুষ্টিবিদরা মনে করেন, শুধু খাবারের পরিমাণ নয়, খাবারের বৈচিত্র্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও মৌসুমি ফল খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীর প্রয়োজনীয় সব ধরনের পুষ্টি উপাদান পায়। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তাজা ফল ও সবজি বেছে নেওয়া স্বাস্থ্যকর এবং অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই লাভজনক।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান ও অতিরিক্ত জাঙ্কফুড পরিহার করাও সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য। এসব অভ্যাস একসঙ্গে অনুসরণ করলে শরীর যেমন সুস্থ থাকে, তেমনি কর্মক্ষমতা ও জীবনমানও উন্নত হয়।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সুস্থ থাকার জন্য সবসময় ব্যয়বহুল খাবারের প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি, মৌসুমি ফলমূল এবং বিশুদ্ধ পানি রাখার মতো ছোট ছোট সচেতনতাই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই নিজের এবং পরিবারের সুস্থতা নিশ্চিত করতে আজ থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার বিকল্প নেই।