
X
ডাঃ সামিনা আরিফ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, বিষন্নতা (Depression) হলো একটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যজনিত ব্যাধি, যার বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘস্থায়ী বিষন্নতা, দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ বা আনন্দ হারিয়ে ফেলা এবং মানসিক, চিন্তাগত, শারীরিক ও আচরণগত বিভিন্ন উপসর্গে উপস্থিতি, যা ব্যক্তির স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাপন ও কর্মক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করে।
DSM-৫-TR অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিষন্নতার লক্ষণ যদি টানা কমপক্ষে ২ সপ্তাহ ধরে, দিনের অধিকাংশ সময় এবং প্রায় প্রতিদিন থাকে, এবং তার স্বাভাবিক জীবনযাপন, পড়াশোনা, চাকরি বা সামাজিক সম্পর্ককে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করে, তাহলে বিষন্নতা (Depression) মনে করা হয়।
বিষন্নতার উপসর্গ:
১. দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ, বিষন্নতা বা শূন্যতা অনুভব করা ২. আগে ভালো লাগত এমন কাজেও আগ্রহ বা আনন্দ হারিয়ে ফেলা ৩. ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাশ বা আশাহীন অনুভব করা ৪. সারাক্ষণ ক্লান্তি বা শক্তিহীনতা অনুভব করা ৫. অনিদ্রা, খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া বা অতিরিক্ত ঘুমানো ৬. ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া ৭. ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া ৮. মনোযোগ ধরে রাখা, চিন্তা করা বা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা ৯. স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া বা সহজেই ভুলে যাওয়া ১০. নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া বা অতিরিক্ত অপরাধবোধে ভোগা ১১. সহজেই বিরক্ত বা রাগান্বিত হয়ে যাওয়া ১২. অস্থিরতা বা চলাফেরা ও কথা বলার গতি ধীর হয়ে যাওয়া ১৩. পরিবার, বন্ধু বা সামাজিক কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া ১৪. পড়াশোনা, চাকরি বা দৈনন্দিন কাজে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া ১৫. যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া ১৬. কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, পিঠব্যথা বা হজমের সমস্যা হওয়া ১৭. অকারণে বা সামান্য কারণেই কান্না পাওয়া ১৮. বারবার মৃত্যু নিয়ে ভাবা, আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মক্ষতির ইচ্ছা হওয়া।
বিষন্নতার কারণসমূহ
বংশগত কারণ ক্স পরিবারে বিষন্নতার ইতিহাস ক্স মস্তিষ্কের রাসায়নিক পদার্থে ভারসাম্যহীনতা হরমোনের পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক রোগ দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা মানসিক চাপ পূর্ণ জীবন ঘটনা প্রিয়জনের মৃত্যু বা হারানো দাম্পত্য বা সম্পর্কে সমস্যা পারিবারিক দ্বন্দ আর্থিক সমস্যা বেকারত্ব কর্মক্ষেত্র বা পড়াশোনার চাপ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা একাকীত্ব শৈশবের মানসিক আঘাত শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতন আত্মসম্মানবোধ কম থাকা নেতিবাচক চিন্তার প্রবণতা উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যা পর্যাপ্ত বা মানসম্মত ঘুমের অভাব শারীরিক ব্যায়ামের অভাব অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অ্যালকোহল বা মাদকের অপব্যবহার কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জীবনের বড় পরিবর্তন পারিবারিক বা সামাজিক সহায়তার অভাব পূর্বে বিষন্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস
বিষন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোন ও নিউরোট্রান্সমিটার
বিষন্নতা একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি কোনো একটি হরমোনের কারণে হয় না; বরং মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার, হরমোন, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশগত বিভিন্ন কারণের সম্মিলিত প্রভাবে সৃষ্টি হয়। নিচে বিষন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান হরমোন ও নিউরোট্রান্সমিটারগুলো উল্লেখ করা হলো।
১. সেরোটোনিন: মেজাজ, ঘুম, ক্ষুধা, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২. ডোপামিন: প্রেরণা, আনন্দ, পুরস্কারের অনুভূতি এবং দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ নিয়ন্ত্রণ করে।
৩. নরএপিনেফ্রিন (নরঅ্যাড্রেনালিন): মনোযোগ, সতর্কতা, শক্তি এবং মানসিক চাপ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. কর্টিসল: এটি শরীরের প্রধান স্ট্রেস হরমোন। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত কর্টিসল নিঃসরণ বিষন্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৫. থাইরয়েড হরমোন (টি৩ ও টি৪): শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন এবং মস্তিষ্কের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিতে বিষন্নতার উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
৬. ইস্ট্রোজেন: বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মেজাজ ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পর এবং মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের পরিবর্তন বিষন্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৭. প্রোজেস্টেরন: প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর মাত্রার পরিবর্তন আবেগের ওঠানামা ঘটাতে পারে।
৮. টেস্টোস্টেরন: শক্তি, আত্মবিশ্বাস, প্রেরণা এবং যৌনস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর মাত্রা কমে গেলে, বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে, বিষন্নতার উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
৯. মেলাটোনিন: ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। এর ভারসাম্যহীনতা ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করে এবং বিষন্নতার উপসর্গ বাড়াতে পারে।
১০. অক্সিটোসিন: সামাজিক সম্পর্ক, বিশ্বাস ও আবেগীয় বন্ধন গঠনে সাহায্য করে।
বিষন্নতার জটিলতা:
বিষন্নতা এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা আবেগীয় সুস্থতা, শারীরিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন কার্যক্ষমতার ওপর বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সময়মতো রোগ নির্ণয়, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা এবং ধারাবাহিক মানসিক সহায়তার মাধ্যমে এসব জটিলতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
আত্মহত্যা মাদকাসক্তি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাজীবনে ব্যাঘাত দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক রোগের অবনতি
বিষন্নতা মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:
নিয়মিত দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখুন প্রতিদিন ৭-৯ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করুন নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করুন প্রতিদিন কিছু সময় সূর্যে আলো ও প্রাকৃতিক পরিবেশে কাটান একাকী না থেকে বিশ্বস্ত পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলুন শিথিলকরণ (Relaxation) কৌশল অনুশীলন করুন; যেমন গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, ধ্যান ((Meditation) বা যোগব্যায়াম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার সীমিত করুন এবং অতিরিক্ত নেতিবাচক বিষয়বস্ত দেখা থেকে বিরত থাকুন সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন নিজেকে শখের বা সৃজনশীল কর্মকান্ডে ব্যস্ত রাখুন অ্যালকোহল, ধূমপান এবং মাদকদ্রব্য থেকে বিরত থাকুন প্রতিদিন ডায়েরি বা ব্যক্তিগত জার্নাল লেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন নেতিবাচক চিন্তা না করে ইতিবাচক চিন্তা করা উপসর্গ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা আরও গুরুতর হলে একজন মনোবিজ্ঞানী (Psychologist)) বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের (Psychiatrist) বা রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসক এর পরামর্শ নিন মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকেই নয়, পরিবার, সমাজ এবং দেশের সার্বিক অগ্রগতিকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই বিষন্নতাকে অবহেলা না করে সময়মতো শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা এবং পরিবারের আন্তরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি সুস্থ মনই একটি সুস্থ পরিবার, সুস্থ সমাজ এবং সমৃদ্ধ জাতি গঠনের ভিত্তি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক অধ্যক্ষ-কাম-অধীক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) বি.ফার্ম (অনার্স), এম.ফার্ম, এমবিএ (এইচআরএম), ডি.এইচ.এম.এস ফেডারেল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ফার্মগেট, ঢাকা