
X
কলম্বিয়ান ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার-ফাইল ছবি
মাঠের একটি ভুল কি কখনো একজন ফুটবলারের মৃত্যুর পরোয়ানা লিখে দিতে পারে? ‘জীবন এখানেই থমকে যায় না’—১৯৯৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর বোগোতার এক সংবাদপত্রের কলামে দেশবাসীকে সান্ত্বনা দিয়ে এই কথাটি লিখেছিলেন কলম্বিয়ান ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, নিজের লেখা সেই সান্ত্বনার বাণী নিজের জীবনে আর সত্য করতে পারেননি তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচে অসাবধানতাবশত করা সেই একটিমাত্র আত্মঘাতী গোলের খেসারত তাঁকে দিতে হয়েছিল নিজের তাজা প্রাণ দিয়ে।
২০২৬ সালে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশ্বকাপের এই প্রত্যাবর্তন স্বাভাবিকভাবেই কলম্বিয়ার সমর্থকদের মনে করিয়ে দিচ্ছে ১৯৯৪ সালের সেই আসরটির কথা, যেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল উত্তর আমেরিকার এই দেশটিতেই। আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে, আত্মঘাতী গোল দিয়ে কলম্বিয়াকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেওয়ার ঠিক দশ দিন পর নৃশংসভাবে খুন হন ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার। এই কালো অধ্যায়টি কলম্বিয়ার ইতিহাসের মাদক পাচারের এক উত্তাল ও সহিংস সময়ের গল্পকে মনে করিয়ে দেয়।
আন্দ্রেস এসকোবার তাঁর ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময়ই কাটিয়েছেন আতলেতিকো নাসিওনাল ক্লাবে—১৯৮০-এর দশকে পাবলো এসকোবারের ‘নারকো-ফুটবল’ (মাদক চক্রের অর্থায়নে পরিচালিত ফুটবল)-এর ছায়ায় যে ক্লাবগুলোর জয়জয়কার শুরু হয়েছিল, এটি ছিল তারই একটি। তবে একই পদবি হলেও, এই দুজনের মধ্যে পারিবারিক বা রক্তসম্পর্কের কোনো আত্মীয়তা ছিল না।
১৯৮৯ সালে আতলেতিকো নাসিওনালের ঐতিহাসিক লিবার্তাদোরেস কাপ জয়ের অন্যতম মূল কারিগর ও ডিফেন্ডার আন্দ্রেস তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেছিলেন। সেবারের কলম্বিয়া দলটিতে ছিলেন ভালদেরামা, ফ্রেডি রিনকন এবং আস্প্রিলার মতো তারকা ফুটবলাররা। গ্রুপ ‘এ’-তে তাদের সঙ্গী ছিল স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, রোমানিয়া ও সুইজারল্যান্ড।
রোমানিয়ার কাছে ৩-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করায় কলম্বিয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচটি হয়ে উঠেছিল বাঁচা-মরার লড়াই। কিন্তু ম্যাচের একপর্যায়ে যা ঘটল, তা কেউই কল্পনা করতে পারেনি—নিজের জালেই বল জড়িয়ে বসলেন আন্দ্রেস এসকোবার!
যুক্তরাষ্ট্রের একটি ক্রস রুখে দিতে গিয়ে অসাবধানতাবশত নিজেদের জালে বল ঠেলে দেন এসকোবার, যা স্বাগতিকদের ম্যাচে প্রথম লিড এনে দেয়। পরে স্টুয়ার্ট ব্যবধান বাড়ালে এবং ভালেন্সিয়া কলম্বিয়ার হয়ে একটি গোল শোধ করলেও ম্যাচে আর ফিরতে পারেনি তারা।
২-১ ব্যবধানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত হার দক্ষিণ আমেরিকার পরাশক্তি কলম্বিয়াকে আসর থেকে অনেক আগেই বিদায় করে দেয়। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের ঠিক কয়েক দিন পর, বোগোতার বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘এল তিয়েম্পো’তে একটি কলাম লেখেন আন্দ্রেস এসকোবার। সেখানে কলম্বিয়া জাতীয় দলের ‘সাহসিকতার’ অভাব নিয়ে আফসোস প্রকাশ করেন তিনি। কলামের বিভিন্ন লাইনের মাঝে তিনি নিজের দেশের মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করেছিলেন এমন একটি বাক্য দিয়ে, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের জীবনের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি, ‘জীবন এখানেই থমকে যায় না।’
কলামের শেষ দিকে এসকোবার আরও লিখেছিলেন, ‘জয়ের পর আমাদের যেমন উদার হওয়া উচিত, পরাজয়ের পর সেই উদারতা দেখানো আরও বেশি জরুরি। (...) সত্যি বলতে, এটি একটি অসাধারণ, অনন্য সুযোগ এবং অভিজ্ঞতা ছিল—যা আমি আমার জীবনে আগে কখনও অনুভব করিনি। আবার দেখা হবে, কারণ জীবন তো আর এখানেই থমকে যায় না।’
কিন্তু সেই দেখা আর কোনোদিন হয়নি। মেদেয়িনে ফিরে আসার পর, ২ জুলাইয়ের শেষ রাতে (ভোররাতে) একটি রেস্তোরাঁ ও নাইটক্লাবের পার্কিং লটে উসকানিমূলক ও অপমানজনক মন্তব্যের শিকার হন আন্দ্রেস এসকোবার। সেখানে কলম্বিয়ার কুখ্যাত মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত দুই ভাই-সান্তিয়াগো গ্যালন হেনাও এবং পেদ্রো গ্যালনের সঙ্গে এই ডিফেন্ডারের তীব্র কথা কাটাকাটি শুরু হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম আঘাতটি এসেছিল পেছন থেকে, আর সঙ্গে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল এক উপহাসমূলক বাক্য—‘আত্মঘাতী গোলটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’ এরপর গ্যালন ভাইদের গাড়িচালক উমবার্তো মুনিয়োজ কাস্ত্রো সরাসরি গুলি চালান। অপরাধের দিন আন্দ্রেস এসকোবারের বাবা এবং ভাইয়েরা, যারা বিশ্বকাপ দেখতে গিয়েছিলেন, তখনও যুক্তরাষ্ট্রেই অবস্থান করছিলেন।
১৯৯৫ সালে সেই গাড়িচালককে ৪৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও, সাজা কমানোর কারণে মাত্র দশ বছর পরেই সে মুক্তি পেয়ে যায়। অন্যদিকে, মাদক ব্যবসায়ী দুই ভাই অপরাধের সহযোগী হিসেবে ১৫ মাস জেল খাটলেও তাঁদের কখনোই আনুষ্ঠানিক বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।
দীর্ঘদিন পর, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেক্সিকোতে আততায়ীর হাতে নিহত হন সান্তিয়াগো গ্যালন হেনাও। এই হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো মন্তব্য করেন যে, আন্দ্রেস এসকোবারের সেই মর্মান্তিক মৃত্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কলম্বিয়ার ভাবমূর্তি ‘একেবারে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল’।
কলুষিত সেই অতীত পেছনে ফেলে আসা কলম্বিয়া এবারের বিশ্বকাপে আছে দারুণ ছন্দে। গ্রুপচ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে ওঠা ল্যাটিন আমেরিকার দলটি এবার শেষ ষোলো নিশ্চিতের লড়াইয়ে ঘানার মুখোমুখি হবে। আগামী শনিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে শেষ ৩২ এর মহারণে নামবে দুই দল।