
X
জয় নিশ্চিত হওয়ার পর উল্লাসে ফেটে পড়ে মিসর।
বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ যখন টাইব্রেকারে গড়ায়, তখন ভাগ্য নয়, গড়ে দেয় ছোটখাটো সব কৌশল। মাঠের সেই স্নায়ুযুদ্ধে সামান্যতম খুঁটিনাটি সুবিধাই দিনশেষে গড়ে দিতে পারে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিসরের শেষ ৩২-এর ম্যাচের আগেই যেন তার প্রমাণ মিলল। শেষ ষোলো নিশ্চিতের লড়াইয়ে নির্ধারিত সময় শেষে অতিরিক্তি সময়ে পর ১-১ গোলে সমতায় শেষ হয়। এরপর টাইব্রেকার শুরুর আগে মিসরের ফুটবলারদের একটি বিশেষ ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়েছিল; যেখানে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার গোলকিপার ম্যাথু রায়ানের বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি নেওয়ার দৃশ্য ছিল।
গত ১৭ জানুয়ারি রিয়াল মাদ্রিদ বনাম লেভান্তের মধ্যকার ম্যাচে রিয়াল ২-০ ব্যবধানে জয় পায়। সেই ম্যাচেই কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং ম্যাথু রায়ানের পেনাল্টি লড়াইটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে স্পট-কিক নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, অস্ট্রেলিয়ার এই গোলকিপার গোললাইনে দাঁড়িয়ে দুই পাশে নাটকীয়ভাবে শরীর দুলিয়ে ফরাসি ফরোয়ার্ডের মনোযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করছিলেন।
তবে এমবাপ্পে মোটেও দমে যাননি; রায়ানকে সম্পূর্ণ বোকা বানিয়ে উল্টো দিকে বল জালে জড়িয়ে রিয়ালকে এগিয়ে নেন। গোল করার ঠিক পরপরই রায়ানকে খোঁচা দিতে ছাড়েননি এই মাদ্রিদ তারকা। রায়ানের সেই ‘নাচের’ ভঙ্গি হুবহু নকল করে, তাঁর সামনে দাঁড়িয়েই কাঁধ ঝাঁকিয়ে গোল উদযাপনে মেতে ওঠেন এমবাপে।
৩৪ বছর বয়সি রায়ান রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে হোম ও অ্যাওয়ে—উভয় ম্যাচেই পেনাল্টি হজম করেছিলেন, যেখানে তাঁকে পরাস্ত করেছিলেন কিলিয়ান এমবাপে। আর্সেনাল ও ব্রাইটনের সাবেক এই গোলকিপারের মুখোমুখি হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মিশরের ফুটবলাররা গোললাইনে রায়ানের গতিবিধি ও নড়াচড়া খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। একই সঙ্গে এমবাপে ঠিক কোন কৌশলে তাঁকে স্পট-কিক থেকে পরাস্ত করেছিলেন, সে সম্পর্কেও একটি পরিষ্কার ধারণা পেয়ে যান তাঁরা।
উদ্দেশ্যটা স্রেফ বিশ্বের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ডের খেলা উপভোগ করা ছিল না; বরং মিশরের কোচিং স্টাফ চেয়েছিলেন তাঁদের ফুটবলাররা যেন ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অগ্নিপরীক্ষায় নামার আগে রায়ানের নড়াচড়া, পজিশনিং এবং পেনাল্টি ঠেকানোর ধরন বা অভ্যাসগুলো খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নেন।
মিশরীয়দের ওই ভিডিও বিশ্লেষণ যে শতভাগ কাজে লেগেছে, তা রায়ানের পারফরম্যান্সেই স্পষ্ট; টাইব্রেকারে মোহাম্মদ সালাহদের নেওয়া ৪টি শটের একটিও তিনি ঠেকাতে পারেননি তিনি। রায়ানের জন্য বিষয়টি আরও বেশি হতাশার ছিল কারণ, ম্যাচের ১১৯ মিনিটে কেবল এই টাইব্রেকার ঠেকানোর জন্যই প্যাট্রিক বিচের পরিবর্তে তাঁকে মাঠে নামানো হয়েছিল। অথচ বিচ পুরো ম্যাচে ৩টি চমৎকার সেভ করেছিলেন।
দারুণ এই কৌশল প্রমাণ করে যে, আধুনিক ফুটবলে ম্যাচের প্রস্তুতি কতটা নিখুঁত ও চুলচেরা বিশ্লেষণধর্মী হয়ে উঠেছে। টাইব্রেকারকে এখন আর স্রেফ ভাগ্যের খেলা হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হয় না; দলগুলো এখন গোলকিপারদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে, ডেটা ও ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করে, এমনকি চাপের মুখে খেলোয়াড়দের মাথা ঠান্ডা রাখতে স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট বা ক্রীড়া মনোবিদদেরও সাহায্য নেয়।
অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর এখন শেষ ষোলোতে মিসরের সামনে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আগামী মঙ্গলবার আটালান্টা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় মুখোমুখি হবে দুই দল।