
X
যমুনা সার কারখানা
গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল)-এ আড়াই বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ফলে উৎপাদনমুখী এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি এখন কার্যত বাফার গুদামে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা এবং দেশের অন্যান্য কারখানায় উৎপাদিত ইউরিয়া সার এখানে মজুত করে নিবন্ধিত ডিলারদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন দানাদার ইউরিয়া উৎপাদনক্ষম এই কারখানা সচল রাখতে ৪২ থেকে ৪৩ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকায় দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। এতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে কারখানাটি পুনরায় চালু করা গেলে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে, আমদানি কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি কৃষি খাতও আরও শক্তিশালী হবে।
যমুনা সার কারখানার নিবন্ধিত ডিলার চাঁন মিয়া চানু বলেন, একসময় এই কারখানা থেকেই দেশের ১৯টি জেলার কৃষকদের নিয়মিত ইউরিয়া সার সরবরাহ করা হতো। এটি ছিল বিসিআইসির অন্যতম লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। উৎপাদন বন্ধ থাকায় এখন বিদেশ থেকে সার আমদানি করতে হচ্ছে। এতে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী লাভবান হলেও রাষ্ট্র আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছে। কারখানাটি পুনরায় চালু হলে কৃষক, কৃষি ও জাতীয় অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক এই সার কারখানা দীর্ঘদিন ধরে কেবল সংরক্ষণ ও বিতরণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে দেশের উৎপাদন সক্ষমতারও অপচয় ঘটছে।
যমুনা সার কারখানার জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) মো. ফজলুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় আড়াই বছর ধরে কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এ মুহূর্তে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়
কারখানার জেনারেল ম্যানেজার (বাণিজ্যিক) আব্দুল হামীম সাংবাদিকদের বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকায় দেশের চাহিদা পূরণে সার আমদানি করতে হচ্ছে। যমুনা সার কারখানা বাফার গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ বাফার গুদামগুলোতে সার সরবরাহ করে। তাই যমুনা সার কারখানায় আসা চালানপত্রে 'বাফার গুদাম' উল্লেখ করা হচ্ছে। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয় নয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ রেখে যদি শুধু সার সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তাহলে বাস্তবে সেটি আর উৎপাদন কারখানা নয়; কার্যত বাফার গুদাম হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ বিষয়ে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফাজ উদ্দিনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় যমুনা সার কারখানায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন পুনরায় চালু করা জরুরি। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন উৎপাদনহীন অবস্থায় থেকে কেবল সংরক্ষণ ও বিতরণকেন্দ্র হিসেবেই ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।