
X
লিওনেল মেসিসহ আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা-ইন্টারনেট
কয়েক বছর আগে আর্জেন্টিনার হয়ে একটি ট্রফির জন্য যখন হাপিত্যেশ করছিলেন লিওনেল মেসি, তখন সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় একটি কথা ছিল, ‘মেসি একা কী করবেন!’ এখন তার ট্রফির খরা কেটে গেছে। বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে দুবার কোপা আমেরিকাও জিতেছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপেও ঘুরেফিরে ফুটে উঠছে সেই পুরনো কথাটি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের যে বলতে গেলে একাই টেনে নিচ্ছেন তিনি!
কেপ ভার্দের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়ের পরদিন নির্ধারিত অনুশীলন করতে পারেনি আর্জেন্টিনা দল। মায়ামিতে ঝড়ের কারণে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের শনিবার সকালের অনুশীলন সেশন বাতিল করা হয়েছে। শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে ৩-২ গোলে জয়ের পর, শনিবার স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১১টায় আর্জেন্টিনা দলের অনুশীলন করার কথা ছিল। যারা আধা ঘণ্টার বেশি খেলেছেন, তাদের রিকভারি নিয়ে কাজ করার কথা ছিল, আর যারা খুব কম বা একেবারেই খেলেননি, তাদের মাঠে আরও বেশি অনুশীলন করার কথা ছিল। আজ আটলান্টায় বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় (পিএম) কোয়ার্টার-ফাইনালে মিসরের মুখোমুখি হবে স্কালোনির দল।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়েও তা ফুটে উঠেছে প্রবলভাবে। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে আবারও সবটুকু আলো কেড়ে নিয়েছেন মেসি। তবে এখানেই বোঝা গেছে, বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা এখনও একজনের ওপর কতটা নির্ভরশীল। ২০২২ বিশ্বকাপের শিরোপা জয়টিও ছিল মেসিময়। বহু প্রতীক্ষিত শিরোপা জয়ের পথে আর্জেন্টিনার মহানায়ক ম্যাচের পর ম্যাচে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতেন। দল যখনই চাপে পড়ত, কোনো সমাধান যখন মিলত না, সতীর্থরা তখন অধিনায়কের দিকেই তাকাতেন এবং তিনি ঠিকই উপায় বের করতেন।
কাতারে সেই আসরে সাতটি গোল করেছিলেন মেসি। পাঁচ বিশ্বকাপে যা ছিল তার সেরা পারফরম্যান্স। এবার চার ম্যাচেই সাত গোল করে ফেলেছেন। বয়স ৩৯ পেরিয়েও রাজত্ব করছেন বিশ্ব আসরে। ইতিহাসের পাতায় পাতায় আঁচড় কেটে চলেছেন ম্যাচের পর ম্যাচে। রেকর্ডের পর রেকর্ড লুটিয়ে পড়ছে তার পায়ে।
বয়স আর দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক আগেই দিয়েছেন মেসি। সবাইকে ছাড়িয়ে পৌঁছেছেন অনন্য উচ্চতায়। এখন কেবলই নিজেকে নতুন উচ্চতায় তুলে নেওয়ার পালা। মেসির দীর্ঘায়ু নিয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক আগেই মিলে গেছে, কিন্তু কোচ লিওনেল স্কালোনির ধাঁধাটি এখনও রয়ে গেছে — আর্জেন্টিনা আর কতদিন এই একজনের ওপর ভর করে পার পেয়ে যাবে!
মেসিকে কেন্দ্র করেই সবকিছু
মায়ামি তো এখন ফুটবল বিশ্বে পরিচিত মেসির শহর হিসেবেই। কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে ম্যাচের দিন এই শহর রূপ নিয়েছিল যেন আর্জেন্টিনার এক প্রদেশে। আকাশী-সাদা জার্সি পরা দর্শকের সমুদ্র যখন উত্তুঙ্গ হয়ে উঠেছিল গ্যালারিতে, মনে হচ্ছিল যেন ঘরের মাঠেই খেলছে আর্জেন্টিনা। তবে সেই উত্তাল তরঙ্গের উৎসও মূলত একজনই। মেসিই তাদেরকে জাগিয়ে তুলছিলেন বারবার।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার সব আক্রমণ মেসিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছিল। তাকে দিয়েই কেইপ ভার্ডের রক্ষণভাগে ফাঁক খুঁজছিল। হাইড্রেশন বিরতির পরই আফ্রিকার দেশটির মনোযোগ নড়ে যায়, তাদের ছন্দ নড়বড়ে হয় এবং সেটির খেসারত বুঝিয়ে দেন মেসি। উড়ে আসা একটি লম্বা বলকে তিনি প্রথম স্পর্শেই নিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সংকীর্ণ কোণ থেকে গোল করেন। দারুণ গোল। তবে তার জন্য খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
রেফারি যখন মাঝবিরতির বাঁশি বাজালেন, কেইপ ভার্ডের কোচ বুবিস্তা তখন ডাগআউটে তার সহকারীদের সঙ্গে গভীর আলোচনায় মগ্ন। বিশ্বকাপে ২০ গোল করা ফুটবলারকে আটকানোর উপায় খুঁজে হয়রান ছিলেন তারা। কেপ ভার্দে পরে যেভাবে খেলায় ফিরে আসে এবং যতটা লড়াই করে, কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। তবে শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেনি তারা ওই একজনের কাছেই।
মহাকর্ষীয় আকর্ষণ
আর্জেন্টিনা যখন জয়সূচক গোলের খোঁজে ছিল, তখন আবারও পুরো খেলার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন মেসিই। মাঠের মাঝখানে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণকে উপেক্ষা করা ছিল কঠিন, কারণ তার সতীর্থরা কেইপ ভার্ডের বক্সে ঢুকতেই হিমশিম খাচ্ছিল। মেসি ক্রমাগত ফ্রি-কিক আদায় করছিলেন এবং অন্য কেউ সেগুলো নিতে এগিয়ে আসার সাহস করছিল না।
গোলরক্ষক ভজিনিয়া যখন তার মানবপ্রাচীর সাজাচ্ছিলেন, তখন তাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় পাওয়ার চেষ্টা করেও যখন তিনি গোল করতে পারছিলেন না, তখন কর্নার থেকে গোল করার দায়িত্বও তার ওপরেই এসে পড়ে। প্রতিবার কর্নার পাওয়ার পর ধীরগতিতে তার কর্নার পতাকার দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। এভাবেই আর্জেন্টিনা অবশেষে আবারও জালে বল জড়াতে পারে - একবার নয়, দুবার!
দূরের পোস্টে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের পায়ে এসে পড়া বল থেকে তিনি গোল করেন, আর জয়সূচক গোলটি আসে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর একটি হেড থেকে, যা কেই ভার্ডের রক্ষণে প্রতিহত হয়ে জালে জড়ায়। গোলটি হয় মেসির নিখুঁত ডেলিভারি থেকে।
২০২২ বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ ছিল মেসির সারাজীবনের কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ জয় দিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রায় প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে আর্জেন্টিনার তাকে প্রয়োজন ছিল। এবারের আসরেও তিনি শুধু আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ স্কোরার ও সেরা ফুটবলারই নন, বরং তার ওপর গোটা দল এমন এক বিশ্বাস নিয়ে ভরসা নিয়ে ভর করেছে, যা প্রায় নির্ভরতার পর্যায়ে চলে গেছে।
এবার তিনি দলকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে নিতে পারবেন কি না, উত্তর মিলবে সময়ে। এছাড়াও, লিওনেল স্কালোনির কোচিং স্টাফ তিন জনের ওপর বাড়তি মনোযোগ দিতে চাচ্ছিলেন, যারা কিছু শারীরিক সমস্যা নিয়ে ম্যাচ শেষ করেছিল। ফাকুন্দো মেদিনাকে নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে ক্র্যাম্পের কারণে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। এন্সো ফের্নান্দেসেরও ক্র্যাম্প হয়েছিল, তবে তিনি ম্যাচ শেষ করতে পেরেছিলেন। নিকোলা হন্সালেস অতিরিক্ত সময়ে গোড়ালি মচকে যাওয়ায় কয়েক মিনিটের জন্য মাটিতে শুয়ে ছিলেন।
আগামী সোমবার আটলান্টায় যাওয়ার আগে মায়ামিতে মাঠে আর্জেন্টিনা দুটি অনুশীলন সেশন করবে। আটলান্টায় ৭ জুলাই ১০টায় (পিএম) কোয়ার্টার-ফাইনালে মিশরের মুখোমুখি হবে স্কালোনির দল।