
X
ফ্রান্স ম্যাচের জন্য অনুশীলনে ঘাম ঝরাচ্ছেন স্পেনের ফুটবলাররা। ছবি: রয়টার্স
দুই দলের খেলার ধরন ভিন্ন। ফ্রান্সের শক্তির জায়গা গতি, আর স্পেনের ছন্দ। সেমিফাইনালে ফরাসিদের মুখোমুখি হওয়ার আগে, প্রতিপক্ষের গতিময় ফুটবল নিয়ে সতর্ক লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তাই বলে নিজেদের কৌশলে বদল আনার পক্ষে নন তিনি। স্বাভাবিক খেলাটা খেলেই অতীতের মতো এবারও ফ্রান্সকে হারাতে আত্মবিশ্বাসী স্পেন কোচ।
এবারের বিশ্বকাপে গতি দিয়ে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিচ্ছে ফ্রান্স। দাপুটে ফুটবলে শতভাগ জয় নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। শেষ বত্রিশ, শেষ ষোলো, শেষ আটে; নকআউটের কোনো ম্যাচে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হয়নি তাদের।
গত দুই বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট, ২০১৮ আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে এবারও মনে করা হচ্ছে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার। তবে ফেভারিটদের তালিকায় আছে স্পেনও। ২০১০ আসরের চ্যাম্পিয়দের আসরের শুরুটা কিছুটা অপ্রত্যাশিত হলেও, সময়ের সঙ্গে ছন্দ খুঁজে পেতে শুরু করেছে তারা।
নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ গোলশূন্য ড্র করে স্পেন। পরে সৌদি আরব ও উরুগুয়েকে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয় তারা। এখন পর্যন্ত কোনো নকআউট ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হয়নি তাদেরও।
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত ১টায় ডালাসে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসেদের মুখোমুখি হবে স্পেন। তিন বছরের মধ্যে ফরাসিদের বিপক্ষে স্প্যানিশদের এটি তৃতীয় লড়াই। সবশেষ দুটিতেই হেসেছিল দে লা ফুয়েন্তের দল। ২০২৪ সালে ইউরোর সেমিফাইনালে ও পরের বছর নেশন্স লিগের সেমিফাইনালে জয় পায় স্পেন।
ফ্রান্সের বিপক্ষে গত দুই ম্যাচের সাফল্য স্বাভাবিকভাবেই আত্মবিশ্বাস যোগাচ্ছে স্পেনকে। তবে বর্তমান ফরাসি দলকে একটু ভিন্ন চোখেই দেখছেন স্পেনের ইউরো জয়ী কোচ দে লা ফুয়েন্তে। তিনি বলেন,‘ যেকোনো প্রতিযোগিতার এই পর্যায়ে, ফ্রান্স সবসময়ই শিরোপার প্রধান দাবিদারদের একটি। বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ওঠা অনেক কঠিন। সব প্রতিপক্ষই ভীষণ শক্তিশালী থাকে, দল হিসেবে আমরাও যথেষ্ট শক্তিশালী। ফাইনালের পথ এখন উন্মুক্ত।
দুই বছর আগের কথা? তারা এখন পুরোপুরি ভিন্ন এক দল। অনেক খেলোয়াড় আগে থেকেই দলে থাকলেও, এটা একদমই ভিন্ন একটা সময়। খেলার ধরন এবং কৌশল- উভয় ক্ষেত্রেই অনেক পরিবর্তন দেখা যাবে। আমার মনে হয় দুটি দলই আগের চেয়ে উন্নতি করেছে।”
দে লা ফুয়েন্তের মতে, ভিন্ন দুই বৈশিষ্ট্যের দল মুখোমুখি হবে এবারের বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে। প্রতিপক্ষের শক্তি-সামর্থ্য, নিজেদের দুর্বলতা; সবই জানা স্পেন কোচের। ফ্রান্সের বিপক্ষে নিজেদের ধরনেই আস্থা রাখছেন তিনি।
“পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বলেছিলাম, প্রায় একই বৈশিষ্ট্যের দুটি দল মুখোমুখি হবে। এই ম্যাচের ক্ষেত্রে, আমরা সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা গতিময় ফুটবলে স্বচ্ছন্দ, তাই আমাদের নিজেদের খেলার ধরনটাই বজায় রাখতে হবে। জানি আমাদের দুর্বলতা আছে, মাঝেমধ্যে রক্ষণ একটু বেশিই অরক্ষিত হয়ে যায়। আমাদের অসাধারণ রক্ষণভাগ রয়েছে এবং আমরা একটি দলগত ভারসাম্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি।
“ফ্রান্সের শক্তি সম্পর্কে আমরা জানি, তবে আমাদের নিজেদের পরিকল্পনায় অবিচল থাকতে হবে। আমরা কোনো নির্দিষ্ট ছকে আটকে থাকা দল নই। কিছু পরিবর্তনের দরকার হলে সেটি অবশ্যই করা হবে। নিজেদের ধরনে খেলেই ফ্রান্সের বিপক্ষে সবশেষ দুটি ম্যাচ জিতেছি।”
এদিকে স্পেনের হাতে যদি বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা ওঠে, তবে তিনি নিজে গোল পেলেন কি পেলেন নাÑতা নিয়ে কেউ হিসাব কষতে বসবে না। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে ২-১ ব্যবধানের রুদ্ধশ্বাস জয়ের পরও নিজের নামের পাশে গোল না দেখে এমনটাই মন্তব্য করেছেন স্প্যানিশ তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল।
চলতি বিশ্বকাপে যখন লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ড কিংবা হ্যারি কেনের মতো বড় তারকারা গোলবন্যা ভাসাচ্ছেন, সেখানে ১৮ বছর বয়সি ইয়ামালের ঝুলিতে রয়েছে মাত্র এক গোল। তা-ও এসেছে গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ৪-০ ব্যবধানের এক একপেশে ম্যাচে।
তবে গোলখরা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছেন না বার্সেলোনার এই উইঙ্গার। লস অ্যাঞ্জেলেসের ম্যাচ শেষে অবলীলায় বললেন, ‘অবশ্যই গোল করতে ভালো লাগে, তবে গোল করার তাড়না নিয়ে আমি মাঠে নামি না। আমার মাথায় থাকে কেবল দলকে সাহায্য করার চিন্তা।’
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এই ফুটবলার আরও যোগ করেন, ‘আমরা যদি বিশ্বকাপটা জিততে পারি, তবে আমার গোল না পাওয়ার আফসোস কেউ মনে রাখবে না। দিনশেষে ট্রফি জয়টাই শেষ কথা।’
দলের জয়ে নিজের ভূমিকা নিয়ে ইয়ামালের উপলব্ধি বেশ পরিপক্ব, ‘আমি জানি গোল না করেও দলে কতটা অবদান রাখা যায়। মাঠের ভেতর আমার মুভমেন্ট যে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখে এবং অন্য সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়, সেটা আমি বুঝি। তাই দলের প্রয়োজনে আমি আমার সর্বোচ্চটা দিতে প্রস্তুত।’
দুই বছর আগে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চে স্পেনের জার্সিতে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল ইয়ামালের। স্প্যানিশদের সেই ইউরো জয়ের অভিযানেও তিনি পুরো টুর্নামেন্টে করেছিলেন মাত্র একটি গোল। তবে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ২-১ ব্যবধানে জেতার ম্যাচে তার সেই চোখধাঁধানো দূরপাল্লার বাঁকানো শটের গোলটি এখনও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে লেগে আছে।
স্মিত হেসে ইয়ামাল মনে করিয়ে দিলেন সেই স্মৃতি, ‘সবার মনে একটা ধারণা জন্মেছে যে আমার আরও বেশি গোল করা উচিত। কিন্তু একটা গোল নিয়েও তো আমরা ইউরো জিতেছিলাম। এবারও আমার একটা গোল হয়ে গেছে, তাই এ নিয়ে আমি একেবারেই শান্ত আছি।’
তবে সেমিফাইনালের ঠিক আগের দিন ১৯ বছরে পা দিতে যাওয়া ইয়ামালের বুট থেকে আরও কিছু জাদুকরী মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকবে স্পেন। কারণ ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট ফ্রান্স।
ফরাসিদের রুখে দেওয়ার ব্যাপারে অবশ্য বেশ আত্মবিশ্বাসী এই
তরুণ তুর্কি। হুঙ্কার ছেড়ে ইয়ামাল বলেন, ‘এখানে দুটো সম্ভাবনাই আছেÑহয় তারা টানা তিনবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠবে, না হয় আমরা তাদের টানা তিনবার হারিয়ে বিদায় করব। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।’
ফরাসিদের কোনো রকম সমীহ না করেই ইয়ামালের শেষ কথা, ‘কাউকে ভয় পাওয়ার পাত্র আমরা নই।’