
X
দলীয় অনুশীলনে ফ্রান্স দলের ফুটবলাররা-ইন্টারনেট
আসরে সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগের একটি ফ্রান্সের। গত ছয় ম্যাচে, প্রতিপক্ষের জালে ১৬ গোল করে দলটি দেখিয়েও দিয়েছে নিজেদের সামর্থ্য। স্পেনের আক্রমণভাগও দুর্বল নয় মোটেও; সেরা চারে তারা উঠে এসেছে ১১ গোল করে। পরিসংখ্যানের এই পাতায় ফ্রান্স এগিয়ে থাকলে, গোল কম হজমের পাতায় এগিয়ে স্পেন।
ছয় ম্যাচে তারা গোল খেয়েছে মাত্র একটি। এর অর্থ, বাকি পাঁচ ম্যাচে ক্লিনশিট নিয়ে মাঠ ছাড়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল স্পেন। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দল দুটি। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত ১টায় শুরু হবে ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যকার এই ম্যাচটি।
যদিও এই ম্যাচের আগে ঘুরে ফিরে আসছে দল দুটির সবশেষ কয়েকটি মুখোমুখি লড়াই। ২০১৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও গত আসরের রানার্সআপ দলটির যে, স্পেনের বিপক্ষে সাম্প্রতিক সাক্ষাতের স্মৃতি সুখকর নয় মোটেও। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ চারে ও নেশন্স লিগের সেমি-ফাইনালে স্প্যানিশদের বিপক্ষে হেরেছিল দিদিয়ের দেশেমের দল ফ্রান্স।
আর ওই দুই আসরের মধ্যে, ইউরোতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। উয়েফা নেশন্স লিগে হয়েছিল রানার্সআপ। ২০১০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জেতা ‘লা রোজা’রা এবার দ্বিতীয়বার এই স্বাদ নিতে মুখিয়ে। সব বিভাগে নির্ভযোগ্য ফুটবলার থাকায় দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ দল স্পেন; তাদের রক্ষণ প্রতিপক্ষের জন্য রীতিমতো দূর্ভেদ্যই। কোয়ার্টার-ফাইনালে এসে বেলজিয়াম কেবল সেখানে পেরেছে একটু চিড় ধরাতে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল ওলিসে, উসমান দেম্বেলেকে নিয়ে স্পেনের আক্রমণভাগ ধারাল, ক্ষিপ্র। লামিন ইয়ামাল, মিকেল ওইয়ারসাবালের উপস্থিতিতে স্পেনের অ্যাটাকিং লাইন-আপ অতটা গতিময় না হলেও, দলের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে দারুণ কার্যকরী। আর তাইিতো ইব্রাহিমা কোনাতে, দাইয়ু উপামেকানোদেরও ডালাসের ডামাডোলে দৃঢ়তার পরীক্ষা দিতে হবে।
ফরাসি সেন্টার-ব্যাক কোনাতে প্রত্যয়ের সুরে বললেন, প্রস্তুত তারা,‘ আপনি কাউকে ভয় পেতে পারেন না। এখন আমরা সম্ভাব্য সেরা উপায়ে প্রস্তুতি নিব এবং আশা করি, ম্যাচের ফল দিন শেষে আমাদের পক্ষে আসবে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যনির্ভর খেলোয়াড়দের নিয়ে স্পেন ব্যতিক্রমী একটা দল। তো, আমরা কেবল একজন খেলোয়াড়ের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি না, যদিও লামিন (ইয়ামাল) দুর্দান্ত একজন খেলোয়াড়।’
নরওয়ের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বদলি নেমেছিলেন কোনাতে। রক্ষণে তার চেয়ে দেশেমের বেশি পছন্দ উপামেকানো ও উইলিয়াম সালিবা। পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে মুখিয়ে থাকা ফ্রান্সের রক্ষণভাগ আগলে রাখার দায়িত্ব তাদের ঘাড়ে। তবে, মাটিতে পা রাখতেন চান কোনাতে। পরিসংখ্যান বা ইতিহাসের চক্করেও পড়তে চান না তিনি কোনোভাবেই। তিনি বলেন,‘ আমরা বিনয়ী আছে, আমরা ওই কোনো ফাঁদে পা দেব না।’
অপরদিকে ইয়ামাল-ওইয়ারসাবালদের ফাঁদে ফেলার পথ অবশ্য খুঁজতে হবে ফ্রান্সকে। আরেক সেন্টার-ব্যাক মাক্সোস লাকোয়াও বিগত ম্যাচের পরিসংখ্যান টেনে, স্পেনকে নিয়ে কথা বললেন সমীহের সুরে। তবে, তিনিও পাত্তা দেননি ভয়-ভীতি পাওয়ার বিষয়টি। তিনি বলেন,‘ আমি ‘ভয়’ শব্দটা বলব না, কিন্তু তাদের মান নিয়ে আমরা সতর্ক। কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে লড়াই ছাড়া, তারা তাদের সব ম্যাচ জিতেছে। তো, আমরা তাদের শ্রদ্ধা করি। তাদের দলে উঁচু মানের খেলোয়াড় আছে, কিন্তু আমরা জিততে চাই।’
চলতি আসরে স্পেনের ‘বিস্ময়বালক’ ইয়ামাল অবশ্য এখনও আছেন নিজের ছায়া হয়ে। তার পাশে এখন পর্যন্ত স্রেফ এক গোল। একটু বেমানানই। ওইয়ারসাবাল দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৪টি)। আর তাইতো লাকোয়া অবশ্য ১৮ বছরের টগবগে তরুণ ইয়ামালকে নিয়ে সতর্ক। তিনি বলেন,‘ আমরা ভালোভাবে, সেরা উপায়ে রক্ষণ সামলাবো। লামিন খুবই ভালো একজন খেলোয়াড় এবং এই বিশ্বকাপে দেখিয়েছে, সে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারে। (তাকে আটকাতে) যা যা করা দরকার, সেটাই করব আমরা।”
এদিকে বিশ্বকাপের দুটি সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল বাকি। কিন্তু কে শিরোপা জিতবে সেটা মোটামুটি আন্দাজ করতে পারছেন থিবো কোর্তোয়া। বেলজিয়ামের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক মনে করছেন ফ্রান্সে ও স্পেনের প্রথম সেমিফাইনালের জয়ী দলই শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতে নেবে।
আগামী ১৫ জুলাই বাংলাদেশ সময় ১টায় (এএম) ডালাসে ফাইনালে যাওয়ার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও স্পেন। আর এই দুই দল ছাড়াও বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত টিকে আছে শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা, সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। তবে এই দুই দলকে ঠিক শিরোপা লড়াইয়ে দেখছেন না কোর্তোয়া। স্পেনের বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরে কোয়ার্টার-ফাইনাল থেকে বিদায়ের পর সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বললেন ‘ফাইনালের আগে ফাইনালের’ কথা। ফ্রান্স ও স্পেনের সেমিফাইনালের জয়ী দলই হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। শিরোপা জয়ের জন্য স্পেন ফেভারিট। তারা ফ্রান্স ও অন্য যেকোনো দলকে হারাতে পারে, সেটা তারা প্রমাণ করেছে। ’
এদিকে স্পেনের হাতে যদি বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা ওঠে, তবে তিনি নিজে গোল পেলেন কি পেলেন নাÑতা নিয়ে কেউ হিসাব কষতে বসবে না। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে ২-১ ব্যবধানের রুদ্ধশ্বাস জয়ের পরও নিজের নামের পাশে গোল না দেখে এমনটাই মন্তব্য করেছেন স্প্যানিশ তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল।
চলতি বিশ্বকাপে যখন লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ড কিংবা হ্যারি কেনের মতো বড় তারকারা গোলবন্যা ভাসাচ্ছেন, সেখানে ১৮ বছর বয়সি ইয়ামালের ঝুলিতে রয়েছে মাত্র এক গোল। তা-ও এসেছে গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ৪-০ ব্যবধানের এক একপেশে ম্যাচে।
তবে গোলখরা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছেন না বার্সেলোনার এই উইঙ্গার। লস অ্যাঞ্জেলেসের ম্যাচ শেষে অবলীলায় বললেন, ‘অবশ্যই গোল করতে ভালো লাগে, তবে গোল করার তাড়না নিয়ে আমি মাঠে নামি না। আমার মাথায় থাকে কেবল দলকে সাহায্য করার চিন্তা।’
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এই ফুটবলার আরও যোগ করেন, ‘আমরা যদি বিশ্বকাপটা জিততে পারি, তবে আমার গোল না পাওয়ার আফসোস কেউ মনে রাখবে না। দিনশেষে ট্রফি জয়টাই শেষ কথা।’
দলের জয়ে নিজের ভূমিকা নিয়ে ইয়ামালের উপলব্ধি বেশ পরিপক্ব, ‘আমি জানি গোল না করেও দলে কতটা অবদান রাখা যায়। মাঠের ভেতর আমার মুভমেন্ট যে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখে এবং অন্য সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়, সেটা আমি বুঝি। তাই দলের প্রয়োজনে আমি আমার সর্বোচ্চটা দিতে প্রস্তুত।’
দুই বছর আগে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চে স্পেনের জার্সিতে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল ইয়ামালের। স্প্যানিশদের সেই ইউরো জয়ের অভিযানেও তিনি পুরো টুর্নামেন্টে করেছিলেন মাত্র একটি গোল। তবে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ২-১ ব্যবধানে জেতার ম্যাচে তার সেই চোখধাঁধানো দূরপাল্লার বাঁকানো শটের গোলটি এখনও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে লেগে আছে।
স্মিত হেসে ইয়ামাল মনে করিয়ে দিলেন সেই স্মৃতি, ‘সবার মনে একটা ধারণা জন্মেছে যে আমার আরও বেশি গোল করা উচিত। কিন্তু একটা গোল নিয়েও তো আমরা ইউরো জিতেছিলাম। এবারও আমার একটা গোল হয়ে গেছে, তাই এ নিয়ে আমি একেবারেই শান্ত আছি।’
তবে সেমিফাইনালের ঠিক আগের দিন ১৯ বছরে পা দিতে যাওয়া ইয়ামালের বুট থেকে আরও কিছু জাদুকরী মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকবে স্পেন। কারণ ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট ফ্রান্স।
ফরাসিদের রুখে দেওয়ার ব্যাপারে অবশ্য বেশ আত্মবিশ্বাসী এই তরুণ তুর্কি। হুঙ্কার ছেড়ে ইয়ামাল বলেন, ‘এখানে দুটো সম্ভাবনাই আছেÑহয় তারা টানা তিনবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠবে, না হয় আমরা তাদের টানা তিনবার হারিয়ে বিদায় করব। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।’
ফরাসিদের কোনো রকম সমীহ না করেই ইয়ামালের শেষ কথা, ‘কাউকে ভয় পাওয়ার পাত্র আমরা নই।’