
X
সংগৃহীত ছবি
বিশ্বকাপে শুরু থেকে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি একাদশে বড় পরিবর্তন করেননি। এবার সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নামার আগে শুরুর একাদশে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই আর্জেন্টাইন কোচের। টিওয়াইসি স্পোর্টস জানিয়েছে, নিয়মিত খেলোয়াড়দের ওপরই আস্থা রাখছেন বিশ্বকাপজয়ী এই কোচ।
আটালান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ১টায় ফাইনালে ওঠার মিশনে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার দলের অনুশীলনের আগ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্কালোনির কোচিং স্টাফ শুরুর একাদশে খুব বেশি রদবদলের পরিকল্পনা নেই।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারে উঠেছে আর্জেন্টিনা। জিতলেও সেই ম্যাচে আলবিসেলেস্তেদের পারফরম্যান্স খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধের ২৭ মিনিটে সুইজারল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হলেও নির্ধারিত সময়ে গোলের দেখা পায়নি স্ক্যালোনির দল। তবু সেই ম্যাচের একাদশের ওপরই ভরসা রাখছেন স্ক্যালোনি।
সুইজারল্যান্ড ম্যাচে কঠিন পরীক্ষা দিলেও কোচিং স্টাফের বিশ্বাস, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার হাতেই। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি পরিষ্কার গোলের সুযোগও তৈরি করেছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। মূল সমস্যা ছিল সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা এবং রক্ষণে কয়েকটি ভুল।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই খেলোয়াড়দের ওপর আস্থা রাখার পেছনে রয়েছে ভিন্ন কারণ। দীর্ঘদিন ধরে এই খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করায় তাদের সামর্থ্য সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে স্ক্যালোনির। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এসব খেলোয়াড়রা নিজেদের সেরা ছন্দে ফিরবে এবং কাতার বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের পুনরাবৃত্তি করতে পারবে— এমনটাই বিশ্বাস এই কোচের।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে মাঝমাঠ নিয়ে। এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মাঝমাঠ থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফরম্যান্স পাননি স্ক্যালোনি। তবে শেষ ম্যাচে পেশিতে টান ধরা লিয়ান্দ্রো পারেদেস ছাড়া এই জায়গায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি পজিশনে কৌশলগত পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। যদিও এই বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে অসুস্থতা থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠেননি ডেকলাইন রাইস। অথচ, আর্জেন্টিনা ম্যাচে কড়া নাড়ছে দুয়ারে। শেষ পর্যন্ত আটলান্টার ম্যাচে ইংলিশ মিডফিল্ডার খেলতে পারবেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ১৬ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। আর এই ম্যাচে রাইসের জন্য শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন দলটির কোচ টমাস টুখেল।
নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালের আগে অসুস্থ বোধ করেন রাইস। দ্বিতীয়ার্ধে আর্সেনালের এই মিডফিল্ডারকে তুলে নেন টুখেল। জুড বেলিংহ্যামের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে, সেমিফাইনালে উঠে আসে ইংল্যান্ড। টুখেল জানিয়েছিলেন, নরওয়ের ম্যাচের আগে তিন দিন বিছানায় কাটান রাইস। ধারণা করা হচ্ছে, মেক্সিকো গিয়ে অসুখ বাধিয়েছেন তিনি। তবে, গত ৪৮ ঘণ্টায় তার উন্নতি হয়েছে বেশ। তাতে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে, তার খেলার সম্ভাবান জোরাল হচ্ছে।
মেসি-মার্তিনেসদের বিপক্ষে নিশ্চিতভাবেই খেলতে মুখিয়ে থাকবেন রাইস। তবে, বিবিসি লিখেছে, তিনি খেলার জন্য উপযুক্ত কিনা, সেটা দলের চিকিৎসকরা জানানোর পর সিদ্ধান্ত নিবেন টুখেল। জাতীয় দলের হয়ে ৭৮ ম্যাচ খেলা রাইস পানামা ছাড়া চলতি আসরে বাকি সব ম্যাচে ছিলেন শুরুর একাদশে।
গত কয়েক দশকের মাঠের নানা নাটকীয় ঘটনা নিয়ে আলোচনা তো আছেই, সঙ্গে যোগ হয়েছে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রসঙ্গও। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালের আগে সমর্থকদের কেবল ফুটবলেই মনোযোগ দিতে বলেছে আর্জেন্টিনার প্রবীণ যোদ্ধাদের একটি সংগঠন। দক্ষিণ আটলান্টিকের দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে সার্বভৌমত্বের দাবি প্রতিষ্ঠার মঞ্চ হিসেবে ম্যাচটিকে ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচের আগে ঘুরে ফিরে আসছে চার দশকের বেশি পুরোনো ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রসঙ্গ। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টাইনদের কাছে মালভিনাস নামে পরিচিত। ১৯৮২ সালে এখানে সংঘাতে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন সামরিক সদস্য, ২৫৫ জন ব্রিটিশ ও তিনজন দ্বীপবাসী নিহত হন। সেই সময় থেকে আজও দুই দেশের মধ্যে ওই প্রসঙ্গ খুব সংবেদনশীল।
‘এপ্রিল টু ওয়ার ভেটেরানস ফেডারেশন’ নামের সংস্থাটি সোমবার বিবৃতিতে বলেছে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আসছে ম্যাচটি আর্জেন্টাইনদের জন্য কোনো ‘সশস্ত্র প্রতিশোধ কিংবা ইতিহাসের ক্ষতিপূরণ নয়।’ একই সঙ্গে তারা কোনো ধরনের ঘৃণা বা উগ্র জাতীয়তাবাদ না ছড়িয়ে, যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইন সৈন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সমর্থক ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
“সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা হয় আন্তর্জাতিক ফোরামে কূটনীতির মাধ্যমে, ঐতিহাসিক সত্যের ভিত্তিতে এবং আমাদের জাতীয় সংবিধানে সুরক্ষিত শান্তিপূর্ণ ও আপসহীন দাবির মধ্য দিয়ে। খেলাধুলার আবেগ আর জাতীয় স্বার্থের মধ্যে একটি স্পষ্ট ও অনড় সীমারেখা টানা জরুরি বলে আমরা মনে করি। বল মাঠে গড়াবে, আমাদের জার্সির গর্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, তবে (যুদ্ধের) স্মৃতিও অক্ষুণ্ন থাকবে।”
ফকল্যান্ডের উপর সার্বভৌমত্ব দাবি করা যুক্তরাজ্য এখনও সেখানে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। অন্য দিকে কূটনৈতিক মাধ্যম ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিজেদের দাবি জানিয়ে আসছে আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্ট চলার সময়েও এই প্রসঙ্গ এসেছে। আর্জেন্টিনার জয়ের পর দর্শকরা গানে মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ, মারাদোনা ও আরেকটি বিশ্বকাপ দিয়ে লিওনেল মেসিকে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করার কথা বলেছেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ কমানোর চেষ্টা করেছেন। কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন, আটলান্টায় দুই দলের লড়াইয়ে ফুটবল ছাড়া অন্য কোনো বিষয় জড়িত থাকবে না।
ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডও একই সুরে কথা বলেছেন। ফাইনালে ওঠার লড়াইকে ‘ফুটবলের স্রেফ আরেকটি ম্যাচ’ হিসেবে দেখছেন তারা,‘এটা দুই গর্বিত জাতির লড়াই। মাঠে ফুটবলই কথা বলবে।’
আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ ঐতিহাসিক এক দ্বৈরথ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বকাপে বেশ কয়েকটি রোমাঞ্চ-উত্তেজনায় ঠাসা ম্যাচ উপহার দিয়েছে দুই দল। যার মধ্যে অন্যতম, ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার-ফাইনাল, যেখানে দিয়েগো মারাদোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি হয়েছিল। আরেকটি হলো, ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনাল, যেখানে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্টের একমাত্র গোল ব্যবধান গড়ে দেয়। আর্জেন্টিনার দাবি ওই গোল ছিল অফসাইড, তাদের কাছে ইংল্যান্ডের ওই জয় ‘শতাব্দীর সেরা ডাকাতি।’
বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে ইংল্যান্ডে নানান কথা ভেসে বেড়াচ্ছে। তাদের একজনের ভবিষ্যদ্বাণী, ‘আমরা মেসিকে ঘুম পাড়িয়ে দেব।’ থ্রি লায়ন্সের (ইংল্যান্ড) সাবেক মিডফিল্ডার জো কোল আগামী বুধবারের ম্যাচকে সামনে রেখে দারুণ আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন এবং দাবি করেছেন তার দলই বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছাবে। তিনি বলেন, ‘আমি এটা মনে-প্রাণে অনুভব করছি।’
২০২৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আসন্ন এই লড়াইটি ইংল্যান্ডে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অসংখ্য তারকা এখন থেকেই চাপ অনুভব করতে শুরু করেছেন। সবাই আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, তবে জো কোলের মতো এতটা কেউই নন। তিনি তো আগামী বুধবারে আটলান্টায় হতে যাওয়া ম্যাচটিতে লিওনেল মেসির বিরুদ্ধে সরাসরি একটি ইঙ্গিতপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীই করে বসেছেন।
গ্যারি লিনেকার, অ্যালান শিয়ারার এবং মিকাহ রিচার্ডস-জাতীয় দলের এই সাবেক তারকাদের সাথে নেটফ্লিক্স স্পোর্টসের একটি অনুষ্ঠানে আলোচনা চলছিল থ্রি লায়ন্সের বিরুদ্ধে মেসির প্রথম ম্যাচটি নিয়ে। তখনই তিনবারের বিশ্বকাপ খেলা এই সাবেক খেলোয়াড় বেশ চ্যালেঞ্জিং ভঙ্গিতে উত্তর দেন, ‘ঠিক আছে, আমাদের তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে। আমরা তাকে ঘুম পাড়াতে যাচ্ছি। হ্যাঁ, শতভাগ সত্য!’
আর সেখানে উপস্থিত বাকি সবাই তাকে নিজের কথার জালে ফেঁসে যাওয়া থেকে আটকানোর চেষ্টা করেন-পাছে রোজারিওর এই মহাতারকা যদি আরও একটি স্বপ্নের মতো ম্যাচ খেলে ফেলেন! তারা বলেন, ‘এমনটা বলো না। আমরা এটা কিছুদিন পরে বলব।’ কিন্তু চেলসি ও লিভারপুলের সাবেক এই তারকা নিজের অবস্থানে অনড় থেকে দ্বিগুণ আত্মবিশ্বাসে বলেন, ‘আমি এখনই বলছি, আমরা বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছাতে যাচ্ছি।’
অন্যদিকে রিচার্ডস দাবি করেন, আর্জেন্টিনাকে বাদ দিতে ইংল্যান্ডকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি খেলতে হবে এবং ঘাম ঝরাতে হবে, কারণ তাদের খেলোয়াড়রা ‘চতুর এবং জন্মগতভাবেই বিজয়ী’। তবে একই সঙ্গে তিনি টমাস টুখেলের দলের শক্তির দিকগুলোও তুলে ধরেন, ‘আর্জেন্টিনার শক্তির সঙ্গে টেক্কা দেয়ার মতো যথেষ্ট গতি আমাদের আছে এবং আমরা তাদের হারাতে যাচ্ছি। আমি এটা মনে-প্রাণে অনুভব করছি।’