
X
কিলিয়ান এমবাপ্পে-ইন্টারনেট
মাঠের লড়াইয়ে যা দেখা গেছে, ম্যাচ শেষে তা ফুটে উঠল কিলিয়ান এমবাপ্পের কণ্ঠেও। অকপটেই তিনি স্বীকার করলেন, টেকনিক্যালি ও ট্যাকটিক্যালি তারা স্পেনের ধারেকাছেও ছিলেন না এবং ফাইনালে যাওয়ার মতো কিছুই করতে পারেননি। কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি অধিনায়ক হিসেবে নিজের দায়টুকুও মাথা পেতে নিচ্ছেন ফরাসি তারকা এমবাপ্পে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে ফাইনালের স্বপ্নভঙ্গের পর নিজেদের পারফরম্যান্স নিয়ে কঠোর আত্মসমালোচনা করেছেন ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। ম্যাচ শেষে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে সেদিন তার সতীর্থরা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করতে পারেননি। যেভাবে খেলার পরিকল্পনা ছিল, মাঠে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি তার দল।
ম্যাচ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় এমবাপ্পে বলেন, কৌশলগত, কারিগরি কিংবা সামগ্রিক পারফরম্যান্স; কোনও দিক থেকেই আমরা যে ম্যাচটি খেলতে চেয়েছিলাম, তা খেলতে পারিনি। আর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে যা করার কথা, তা না করলে জেতা যায় না। তিনি জানান, স্পেনকে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে না দিতে শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা ছিল ফ্রান্সের। তবে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।
এমবাপ্পের ভাষায়, মিডফিল্ডে আমরা বারবার ৩ বনাম ২ পরিস্থিতিতে পড়েছি। স্পেনের বিপক্ষে এটি বড় সমস্যা। সব মিলিয়ে এর ফলই পরাজয়। ফ্রান্স যেভাবে খেলেছে, তাতে এই পারফরম্যান্স দলটিকে ফাইনালে নিয়ে যাওয়ার যোগ্য ছিল না বলে স্বীকার করতে এমবাপ্পের কোনও দ্বিধা ছিল না।। তিনি বলেন, ফাইনালে ওঠা, দেশকে স্বপ্ন দেখানো এবং ইতিহাস গড়ার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল দলের লক্ষ্য।
চলতি আসরে ৮ গোল করা ২৭ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড জানান, জিতলে যেমন মাথা উঁচু করে জিততে হয়, হারলেও মাথা উঁচু করেই হারতে হয়। তবে এই মুহূর্তে হতাশা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দল এবং আমি ভীষণ হতাশ। ‘টেকনিক্যালি ও ট্যাকটিক্যালি আমরা পারিনি, ফাইনালে যাওয়ার মতো মান আমাদের ছিল না’, সেমিফাইনালে হারার পর কিলিয়ান এমবাপের অকপট উপলব্ধি।
বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে শিরোপার লড়াই থেকে ছিটকে গেছে ফ্রান্স। এই স্কোরলাইনও আসলে ম্যাচের প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তুলছে না। স্পেনের চোখধাঁধানো ছন্দময় ও কৌশলী ফুটবলের সামনে স্রেফ অসহায় ছিল ফরাসিরা। টানা দুই বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলা দলটিকে যেন শ্বাসরোধ করে আটকে রেখেছিল স্প্যানিশরা।
কোচ দিদিয়ের দেশেমের কৌশলের দিকে আঙুল তুলে ম্যাচের পর এমবাপ্পে বললেন, এই ম্যাচে তাদের কৌশল উপযুক্ত ছিল না। ম্যাচের একদম শুরু থেকেই আমরা দুজন খেলোয়াড়ের বিপক্ষে তিনজন নিয়ে চাপ সৃষ্টি করছিলাম এবং স্পেনের বিপক্ষে ব্যাপারটি ছিল বেশ কঠিন। ফাবিয়ান (রুইস) এবং রদ্রি খেলার জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। প্রেসিংয়ের সময় আমাদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব ছিল। আমার মনে হয়, আমাদের ম্যান-টু-ম্যান প্রেসিং করা উচিত ছিল এবং আমাদের সঙ্গে তাদের দৌড়াতে বাধ্য করা উচিত ছিল।”
ম্যাচের ৫১ শতাংশ সময় বল ছিল স্পেনের কাছে, ৪৯ শতাংশ ফ্রান্সের। এই পরিসংখ্যানের মতো অন্যান্য আরও কিছু সমীকরণেও দুই দল ছিল কাছাকাছি। এমনকি স্পেন দুটি শট লক্ষ্যে রেখে দুটিই কাজে লাগায়, সেখানে ফ্রান্স লক্ষ্যে রেখেছিল ৪টি শট। কিন্তু খেলাটি যারা দেখেছেন, তারা জানেন যে ম্যাচের চিত্র কতটা ভিন্ন ছিল। স্পেনের অসাধারণ গোছানো ও উজ্জীবিত ফুটবলের সামনে পাত্তাই পায়নি ফ্রান্স।
এমবাপ্পেও সেটি মেনে নিচ্ছেন শতভাগ। স্পেনের সঙ্গে নিজেদের পার্থক্য তুলে ধরলেন তিনি নিজেই,‘ আমরা যেভাবে খেলতে চেয়েছিলাম, সেভাবে নিজেদের খেলা খেলতে পারিনি—টেকনিক্যালি ও ট্যাকটিক্যালি। বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে যখন কোনো দল জানে না কী করতে হবে, তখন সেই দল জিততে পারে না। স্পেন তাদের পরিকল্পনায় অটল থেকেছে, সাধারণত তারা সসময়ই যেটা করে থাকে। তারা বল এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পছন্দ করে।’
আমাদের পরিকল্পনা ছিল তাদের ওপর উঁচু থেকে চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা নিজেদের ছন্দ খুঁজে না পায়। কারণ খেলা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তারা আমাদের চেয়ে ভালো। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারিনি। আমাদের কৌশলগত দিকটা খুব ঢিলেঢালা ছিল। যখন সুযোগ ছিল, তখন আমরা তাদের আঘাত করতে পারিনি।”
শুধু কৌশলগত দুর্বলতাই নয়, মাঠে নিজেদের পারফরম্যান্সের ঘাটতির কথাও বললেন এই ম্যাচের আগ পর্যন্ত অসাধারণ ফর্মে থাকা ফরোয়ার্ড,‘এমনকি যখন আমরা বল পুনরুদ্ধার করছিলাম, আমাদের প্রথম স্পর্শগুলো যথেষ্ট ভালো ছিল না। এটাই পরাজয়ের কারণ। এটা একটা বিরাট হতাশা। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠভাবে বলতে গেলে, ফাইনালে যাওয়ার জন্য মান আমাদের ছিল না, প্রয়োজনীয় সব উপাদান আমরা কাজে লাগাতে পারিনি।’
আট গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে থেকে ম্যাচটি শুরু করেছিলেন এমবাপ্পে। এই ম্যাচে তিনি পারেননি এগিয়ে যেতে। আগে দুবার বিশ্বকাপ খেলে দুটিতেই ফাইনালে উঠলেও এবার পা রাখতে পারলেন না শেষের মঞ্চে।
তাইতো শেষ দিকে তার মধ্যে সেই হতাশা প্রকাশ্যও হয়ে ওঠে। ম্যাচের ৮৬তম মিনিটে স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন বল তোলার জন্য ঝুঁকে পড়ার ঠিক মুহূর্তে তিনি তার দিকে ছুটে যান। দুজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, যার ফলে সিমন মাটিতে পড়ে যান এবং এমবাপ্পে হলুদ কার্ড পান।
ম্যাচ শেষে অবশ্য নিজেকে সামলে নিয়েই বাস্তব উপলব্ধিগুলো তুলে ধরেন ২৭ বছর বয়সি তারকা। নিজের দায়টুকু নিতেও তার আপত্তি নেই। তিনি বলেন,‘ অধিনায়ক হিসেবে, আমাকে সমস্ত দায়িত্ব নিতে হবে এবং এতে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমরা ফাইনালে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যেতে পারিনি।’