
X
আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা।
এবারের বিশ্বকাপে আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তু ছিল ‘হাইড্রেশন ব্রেক’। দুই অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে ৩ মিনিটের এই পানি পানের বিরতি নিয়ে কম তর্ক-বিতর্ক হয়নি। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল ‘হাইড্রেশন ব্রেকে’ দলগুলোর খেলায় মোমেন্টাম বা গতিপথ বদলে যাওয়া। ছোট্ট বিরতিগুলো ম্যাচের গতিপথ সত্যিই বদলে দিয়েছে। পানি পানের বিরতি শেষ হওয়ার ঠিক পরের মুহূর্তগুলোতেই সবচেয়ে বেশি গোল হতে দেখা গেছে।
ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘ইউওএল’-এর একটি জরিপ বলছে, চলতি বিশ্বকাপের মোট ১০২টি ম্যাচের মধ্যে ৪০টিতেই (যা মোট ম্যাচের ৩৯.২ শতাংশ) পানি পানের বিরতির ঠিক পরপরই গোল হয়েছে-যা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে অথবা বদলে দিয়েছে খেলার মোড়। টুর্নামেন্টের গোল সংখ্যা হিসাব করলে এই বিরতির পরের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুরো আসরে হওয়া মোট ২৯৭টি গোলের মধ্যে ৭৪টি গোলই এসেছে পানি পানের বিরতিগুলোর ঠিক পরপরই, যা মোট গোলের ২৪.৯ শতাংশ এবং প্রতিটি গোলই ম্যাচে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
পানি পানের এই বিরতি নিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেন, ‘হতে পারে এই ছোট্ট বিরতি পেয়ে কোচেরা মাঠের পরিস্থিতি নতুন করে বোঝার সুযোগ পান এবং নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নেন। ফুটবলাররাও কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে মাঠে ফেরেন। এখন প্রশ্ন হলো, এটা কি আসলেই খারাপ কোনো বিষয়? হতে পারে এটি বেশ ভালো একটি সিদ্ধান্ত।’
ভবিষ্যতের টুর্নামেন্টগুলোতে এই নিয়ম বহাল রাখা হবে কি না, তা নিয়ে অভিজ্ঞতা ও ফলাফল বিশ্লেষণ করে নতুন করে ভাবার আশ্বাস দিয়েছেন ফিফা সভাপতি। ২০২৬ বিশ্বকাপে পানি পানের বিরতির (হাইড্রেশন ব্রেক) পর তাৎক্ষণিক গোল করার পরিসংখ্যানে সবার ওপরে রয়েছে আর্জেন্টিনা। বিশেষ করে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে এই কৌশলের কার্যকারিতা সবচেয়ে দারুণভাবে প্রমাণিত হয়েছে। টুর্নামেন্টে নিজেদের চারটি ম্যাচে এই বিরতির ঠিক পরপরই আর্জেন্টিনা ৯টি অতি গুরুত্বপূর্ণ গোল আদায় করে নিয়েছে।
সবচেয়ে স্মরণীয় ও রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলো ঘটেছে টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে। মিশরের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে একপর্যায়ে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে চরম বিপদে ছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু পানি পানের বিরতিতে ফুটবলাররা শরীর রিহাইড্রেট করে ফেরার পর যেন নতুন রূপ নেয় আলবিসেলেস্তেরা। বিরতির পরের সময়টিতে দুর্দান্ত ৩টি গোল করে অবিশ্বাস্য এক জয় ছিনিয়ে নেয় তারা।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের গল্পটাও ছিল প্রায় একই রকম। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা শুরুতে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে পানি পানের বিরতির পরপরই আরও একবার ম্যাচের চিত্রপট বদলে দেয় আর্জেন্টিনা। বিরতি থেকে ফিরে দুর্দান্ত ২টি গোল করে ম্যাচ নিজেদের করে নেয় তারা এবং নিশ্চিত করে ফাইনালের টিকিট।
ফিফার এই নতুন নিয়মে আর্জেন্টিনার আপাতদৃষ্টিতে সুবিধা হচ্ছে বলে মনে হলেও, কোচ লিওনেল স্কালোনি কিন্তু এই ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এটি ফুটবলের স্বাভাবিক গতিকে নষ্ট করছে।
স্কালোনির ভাষায়, ‘আমার তো মনে হয় একটা ফুটবল ম্যাচ এখন চার ভাগে (চারটি কোয়ার্টারে) ভাগ হয়ে গেছে। খেলোয়াড়দের সঙ্গে কৌশল নিয়ে কথা বলার জন্য একেকবারে সাড়ে তিন মিনিট করে সময় পাওয়া যাচ্ছে। একটা ম্যাচের শুরু থেকে মাথায় যে পরিকল্পনা থাকে, খেলার ২২ বা ২৩ মিনিটের মাথায় গিয়ে এই বিরতির কারণে তা পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। ফুটবলকে এভাবে চার ভাগে ভাগ করার বিষয়টি আসলেই বড্ড অবাস্তব ঠেকে।’
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা যেখানে এই নিয়মের পূর্ণ সুবিধা লুটে নিয়েছে, ঠিক তার উল্টো চিত্র বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা দলে। এই পানি পানের বিরতির কারণে সবচেয়ে বেশি খেসারত দিতে হয়েছে দলটির। পুরো টুর্নামেন্টে মোট তিন-তিনবার এই বিরতির পর গোল হজম করে ম্যাচ হাতছাড়া করেছে তারা।
প্রথম পর্বে কানাডার বিপক্ষে ড্র এবং সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হারের ম্যাচে পানি পানের বিরতির ঠিক পরপরই গোল হজম করতে হয়েছিল বসনিয়াকে। আর সবশেষ দ্বিতীয় পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচেও একই ভুল করে বসে দলটি। বিরতির ঠিক পরপরই হুট করে ২ গোল হজম করে বসে তারা, যা শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকে তাদের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।
বিশ্বকাপের এই নতুন নিয়মের ভালো-মন্দ দুই পিঠই দেখতে হয়েছে ব্রাজিল দলকে। রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে ব্রাজিলের ডাগআউটে বসা কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা টুর্নামেন্টে দুইবার এই বিরতির পর গোল করে সুবিধা পেয়েছিল। গ্রুপ পর্বে মরক্কোর বিপক্ষে ড্র হওয়া ম্যাচে প্রথমবার বিরতির পর গোল পায় সেলেসাওরা। এরপর দ্বিতীয় পর্বে জাপানের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জেতার পেছনেও অবদান ছিল বিরতির ঠিক পর পাওয়া গোলের।
কিন্তু মুদ্রার ওপারটাও দেখতে হয়েছে তাদের। শেষ ষোলোয় নরওয়ের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচে এসে এই হাইড্রেশন ব্রেকই ব্রাজিলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সেই ম্যাচে বিরতির ঠিক পরপরই নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড ম্যাচের শেষ মুহূর্তে পরপর দুইবার বল জালে জড়িয়ে দেন। আর হলান্ডের সেই জোড়া গোলেই টুর্নামেন্ট থেকে চোখের জলে বিদায় নিতে হয় সেলেসাওদের।