
X
স্পেনকে আটকাতে আর্জেন্টিনার ডাগআউটের মাস্টারমাইন্ড স্কালোনি আর মাঠের জাদুকর মেসির ওপরই চোখ থাকবে।
কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে সেই অবিস্মরণীয় ট্রফি জয়ের ঠিক চার বছর পর, ফুটবল ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি আর্জেন্টিনার সামনে। দলে আছেন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, এবারের বিশ্বকাপে বারবার খাদের কিনারা থেকে দলের ত্রাতা হয়ে হাজির হয়েছেন।
আলবিসেলেস্তাদের চার তারকার পাওয়ার ফাইনালের মহারণে কিন্তু ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের ফেভারিট বলার সুযোগ খুব একটা নেই। বিশ্বর্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর দল হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন খেলতে আসা স্পেনকেই অনেকে এগিয়ে রাখছেন। ট্রফি জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদারও ছিল তারাই। আগামী রোববারের দুই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়ন দলের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে মূলত মাঝমাঠের তীব্র লড়াই। আর ঠিক এখানেই লিওনেল স্কালোনিদের চেয়ে এগিয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
স্প্যানিশ মাঝমাঠের সেই ‘ইঞ্জিন রুমের’ কাছে রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে বড় মূল্য চুকাতে হয়েছিল ফেবারিট ফ্রান্সকে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই দলটি হয়তো তাদের সোনালী যুগের সেই ‘তিকি-তাকা’র মতো পজেশন বা বল দখলে রাখার জন্য অতিরিক্ত বুঁদ হয়ে থাকে না, তবে তারা এখনও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ আর ছন্দ দিয়ে ম্যাচের সিংহভাগ সময় নিজেদের ইশারাতেই চালায়। নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা এই স্প্যানিশ মাঝমাঠকে কীভাবে সামাল দেয়, সেটাই হবে ফাইনালের আসল টার্নিং পয়েন্ট।
সেমিফাইনালে স্পেনের মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের দিকে তাকালে সাদাচোখেই দেখা যাবে কতটা ছড়ি ঘুরিয়েছে ‘লা রোহা’দের মাঝমাঠের ইঞ্জিন। মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি বা পিভট হিসেবে আছেন চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী পিএসজির ফ্যাবিয়ান রুইজ। আর আসল ‘মায়েস্ত্রো’ হিসেবে আছেন ম্যানচেস্টার সিটির ২০২৪ ব্যালন ডি’অর জয়ী রদ্রি। মিডফিল্ডের সঙ্গে আক্রমণভাগের সংযোগ সৃষ্টিতে দানি ওলমো তো প্রতিনিয়ত প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছেন।
আয়ারল্যান্ডের কিংবদন্তি রয় হটন আরটিই-এর ‘সকার পডকাস্ট’-এ স্পেনের মিডফিল্ড বিশ্লেষণ করেছেন। দে লা ফুয়েন্তের দলের মাঝমাঠের সেই চেনা ছন্দ কীভাবে বোতলবন্দি করার চেষ্টা করতে পারে আলবিসেলেস্তেরা। হটন বলেন, ‘আমার মনে হয় আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডের ট্যাকটিক্সটা এমন হবে যে—লিয়েন্দ্রো পারেদেস সরাসরি মার্ক করবেন দানি অলমোকে। আর বাকি দুজন, অর্থাৎ অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজ একদম চেপে ধরবেন রদ্রি ও ফ্যাবিয়ান রুইজকে। মাঝমাঠের এই লড়াইটাই হবে ফাইনালের আসল যুদ্ধ।’
রয় হটন আরও যোগ করেন, ‘আমি একটা কথা পরিষ্কার বলে দিতে পারি-স্পেন তাদের আগের ম্যাচগুলোতে বল পায়ে যতটা সাবলীলভাবে সময় কাটিয়েছে, এবার কিন্তু তা পাবে না। কারণ আর্জেন্টিনার এই ছেলেরা প্রতিটা সুযোগেই তাদের ওপর একদম চড়াও হয়ে থাকবে। তারা স্পেনকে বিরক্ত করবে, ছোটখাটো ফাউল করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করবে; কারণ রেফারিরা এখন এসব ছোট ফাউলে তেমন কার্ড বা শাস্তি দিচ্ছেন না। এখন দেখার বিষয়, স্প্যানিশরা এই উস্কানিতে মাথা গরম করে কি না।’
হটন মনে করেন স্পেনের সামনে এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, ‘স্পেনকে স্রেফ নিজেদের চেনা খেলাটা খেলে যেতে হবে। ফাইনালের আবহে গা ভাসানো যাবে না, আর্জেন্টিনার এই ছোটখাটো ফাউলের ফাঁদে পা দিয়ে মেজাজ হারানো চলবে না। তারা যদি মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে, তবে আমার বিশ্বাস এই মহারথী মঞ্চে যেকোনো একজন তারকাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেবে। সে হয় মেসি হবে, না হয় ইয়ামাল। এই দুজনের যেকোনো একজন ফাইনালে এমন কিছু জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দেবে, যা তাদের দলকে চ্যাম্পিয়ন করবে।’
স্পেনের শক্তির জায়গাগুলো তো সবারই জানা কিন্তু স্পেনের দুর্বলতা ঠিক কোথায়? এই স্প্যানিশ দলে দুর্বলতা খুঁজে পাওয়া ভার। আর ঠিক এই কারণেই সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত তাদের ম্যাড়মেড়ে পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে এতটা অবাক করেছিল।
টুর্নামেন্টে আসার আগে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এক ‘ঐক্যবদ্ধ’ স্পেনের ডাক দিয়ে তাঁর শিষ্যদের—পাশাপাশি পুরো দেশকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এবারের স্প্যানিশ স্কোয়াডে রিয়াল মাদ্রিদের কোনো খেলোয়াড়কে রাখা হয়নি, যা ইউরোপসেরাদের বর্তমান দলটির যোগ্যতা নিয়ে শুরুতে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। তবে ২৬ সদস্যের এই স্কোয়াডের আটজন খেলোয়াড়ই খেলেন বার্সেলোনায়, যারা গত মৌসুমে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে ঘরোয়া লিগ শিরোপা ধরে রেখেছিল।
স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার কাছে এই মুহূর্তের সেরা দল—একদম সেরা—হলো এই স্পেন জাতীয় দল। খেলোয়াড়রা কোন ক্লাব থেকে এসেছে বা তাদের অতীত কী, তা আমি দেখি না। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা স্প্যানিশ খেলোয়াড় এবং তারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে ও এক সুতোয় গাঁথা এক জাতি হিসেবে মাঠে নামতে গর্ববোধ করে।’