
X
সোহাগী জাহান তনু
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তের স্বার্থে আরও দুইজন সন্দেহভাজন অভিযুক্তের ডিএনএ প্রোফাইল প্রস্তুত ও যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এদের একজন সাবেক সেনা সদস্য এবং অপর জন বেসামরিক ব্যক্তি।
মঙ্গলবার বিকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই ঢাকার পরিদর্শক মোঃ তারিকুল ইসলাম।
পিবিআই ও আদালতের আদেশ সূত্রে জানা যায়, ভিকটিম তনুর পরিধেয় জব্দকৃত জামা-কাপড়ের ডিএনএ রিপোর্ট পর্যালোচনায় একাধিক পুরুষের সম্পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। উক্ত প্রোফাইলের সাথে মিলিয়ে দেখার জন্য মামলায় সন্দেহভাজন দুই অভিযুক্ত ব্যক্তির রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষা করা আবেদন জানায় পিবিআই।
আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হক এ আদেশ দিলেও পিবিআই ও আদালত থেকে মঙ্গলবার বিষয়টি গণমাধমে নিশ্চিত করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি পাওয়া দুই সন্দেহভাজন হলেন, কুমিল্লা সেনানিবাসের সাবেক সৈনিক মোঃ জাহিদুল ইসলাম (৪১)। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলার মেঘাই গ্রামের মো: সোলায়মান হোসেনের পুত্র।
অপর ব্যক্তি ফয়সাল আহমেদ ওরফে রাব্বী (৩২)। তিনি কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার লহ্মীনগর (রাজাপাড়া) গ্রামের এম এ মান্নানের ছেলে। তবে তনু হত্যার সাথে রাব্বীর সংশ্লিষ্টরা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা তথ্য জানাতে অপারগতা প্রক্শা করেছেন।
আদালতের পরিদর্শক সাদেকুর রহমান বলেন, তনুর পোশাকের আলামত থেকে প্রাপ্ত ডিএনএর সাথে অভিযুক্তদের ডিএনএ প্রোফাইল পর্যালোচনা করলে এ ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। তাই আদালত নতুন করে আরও দুই ব্যক্তির ডিএনএ করার অনুমতি দিয়েছেন।
পিবিআই জানায়, এর আগে আদালতের নির্দেশ পেয়ে গত ২২ এপ্রিল সকালে কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। ওই দিন ঢাকায় সিআইডির ডিএনএ ল্যাবে হাফিজুরের ডিএনএ নমুনা নেয়া হয়। পরে তাকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ৭ দিনের রিমাণ্ড আবেদন করলে আদালত তিনদিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করেন। এরপর তাকে ঢাকায় পিবিআইয়ের বিশেষ ইউনিটে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন।
পরে একই আদালতের বিচারক গত ৮ জুন তনু হত্যার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সন্দেহভাজন সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ এবং সৈনিক শাহীন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের গ্রেফতারে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি করার আদেশ দেন। তনু হত্যাকাণ্ডের সময় সার্জেন্ট জাহিদ কুমিল্লা সেনানিবাসে ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের গড়ঘাটা এলাকায়। সৈনিক শাহীন আলমের বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। ঘটনার সময় তিনি সেনানিবাসের ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে সৈনিক পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে উভয় পলাতক আছেন বলে পিবিআই দাবি করেছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিপিআই ঢাকার পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম মঙ্গলবার বিকালে বলেন, ‘মামলাটি অধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে একজন সেনা সদস্য ও একজন বেসামরিক লোকের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ প্রোফাইল প্রস্তুতসহ তুলনামূলক পরীক্ষার জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ওই দুই ব্যক্তির অবস্থান কোথায় এ সম্পর্কে আমরা এখনো নিশ্চিত নই।’
এর আগে ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। পরদিন সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন। শুরুতে থানা পুলিশ, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি তদন্ত করেও কোনো রহস্য বের করতে পারেনি। তবে ২০১৭ সালের মে মাসে তৎকালীন তদন্ত সংস্থা সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা জানিয়েছিল।
সেসময় ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি হলেও সন্দেহভাজনদের সঙ্গে নমুনা ম্যাচিং (মেলানো) করা হয়নি। সর্বশেষ পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর তনু হত্যা মামলার নথি পিবিআইয়ের ঢাকা সদর দপ্তরে হস্তান্তর করে সিআইডি। প্রায় চার বছর মামলাটি তদন্ত করেছেন পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামলাটির ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে ‘সন্দেহভাজন সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান গ্রেপ্তার, অপর দুই সন্দেভাজনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারী ও সর্বশেষ আরও দুই জনের ডিএনএ সংগ্রহ করার আদালতের আদেশের মধ্য দিয়ে মামলার তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।’