
X
জাকির হোসেন নান্নুর স্মরণসভা
কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসভাপতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা এবং যুবদলের বিগত কমিটির ঢাকা বিভাগীয় টিম লিডার জাকির হোসেন নান্নুর স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের দাবিতে ক্ষোভ, বেদনা ও আবেগের এক মিলনমেলায়। রাজধানীর নয়াপল্টনের আনন্দ ভবনে মঙ্গলবার আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের অবমূল্যায়ন, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ হতাশা এবং আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতির দাবি।
গত ১৯ জুলাই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান জাকির হোসেন নান্নু। তাঁর মৃত্যুতে যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। নেতাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এই নেতার জানাজা বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত না হওয়ায় অনেকের মধ্যে নীরব ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, যে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি তার ত্যাগী নেতাকর্মীদের ওপর নির্ভর করে। যারা দীর্ঘদিন নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে আন্দোলন-সংগ্রামে দলের পাশে থেকেছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। তিনি মরহুম নান্নুকে ত্যাগ, আদর্শ ও সাংগঠনিক নিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন।
রিজভী একই অনুষ্ঠানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত মেজর (অব.) মোজাফ্ফর হোসেনকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন রাখেন, চার দশকেরও বেশি সময় তিনি কোথায় ছিলেন, কারা তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে এবং কীভাবে তিনি এতদিন আইনের আওতার বাইরে ছিলেন—এসব বিষয়ে জাতির সামনে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আসা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নও বক্তব্যে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নতুন কমিটি ঘোষণার পর এটিই ছিল প্রথম কর্মসূচি, অথচ কমিটির এক-তৃতীয়াংশ নেতাও উপস্থিত হননি। বিষয়টি তাকে ব্যথিত করেছে এবং তিনি এ নিয়ে সভাপতির সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান। তাঁর এই বক্তব্য উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
স্মরণসভায় সাবেক যুবদল নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবু সেলিম চৌধুরী, মির্জা ইউসুফ বিন জলিল কালু, আলী আকবর চুন্নু, মাহবুবুল হাসান পিংকু ভূঁইয়াসহ অনেকে।
প্রধান অতিথির বক্তব্য চলাকালে কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মির্জা ইউসুফ বিন জলিল কালু আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “যারা দীর্ঘ ১৭ বছর স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সামনে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে দলকে টিকিয়ে রেখেছে, তারা আজ কেন পদ-পদবিহীন অবস্থায় অবহেলিত ও অসম্মানিত হয়ে হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে?”
তিনি বলেন, “জাকির হোসেন নান্নু দলের কাছ থেকে যথাযথ মূল্যায়ন না পেয়েই বুকভরা কষ্ট নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আজ দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও চারদিকে সুবিধাবাদীদের জয়জয়কার। অথচ আন্দোলনের কঠিন সময়ে যাদের কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল না, তারাই এখন মূল্যায়িত হচ্ছেন।”
কালু প্রধানমন্ত্রী এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের হয় যথাযথ মূল্যায়ন করুন, না হয় দল থেকে বিদায় করে দিন। কিন্তু এভাবে বছরের পর বছর ত্যাগী নেতাদের অবহেলার মধ্যে রাখবেন না। কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক নেতাদের দ্রুত সম্মানজনক মূল্যায়ন ও পদায়নের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের মানসিক কষ্ট দূর করুন।”
কালুর বক্তব্যের সময় উপস্থিত অনেক নেতাকর্মী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এ সময় রুহুল কবির রিজভীকে উপস্থিত নেতাকর্মীদের সান্ত্বনা দিতে দেখা যায়।
এদিকে স্মরণসভা শেষে জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির মাঠে যুবদলের পদবঞ্চিত সাবেক নেতারা মরহুম নান্নুর রুহের মাগফিরাত কামনায় পৃথক দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করেন। সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর থেকে পদবঞ্চিত নেতারা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন বলে সেখানে উপস্থিত নেতারা জানান। মোনাজাতে প্রায় অর্ধশতাধিক সাবেক যুবদল ও ছাত্রদল নেতা অংশ নেন।
মোনাজাতে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক, হুমায়ুন কবির, সাজ্জাদ হোসেন উজ্জ্বল, জাকির হোসেন খান, দুলাল হোসেন, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান, যুবদলের সাবেক গ্রাম সরকারবিষয়ক সম্পাদক তৌহিদ হোসেন রিয়ন তালুকদার, সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক দেওয়ান অলিউদ্দিন সুমন দেওয়ান, মিজানুর রহমান সোহাগ, মাহফুজুর রহমান মাহফুজ, ইসমাইল খান শাহিন, শরীফ হাফিজুর রহমান হাফিজ, গোলাম ফারুক, খালেদ মাহমুদ মাসুদ, আসাদুল আলম টিটু, আমান উল্লাহ বিপুল, বাছেদুর রহমান সোহেল, আব্দুর রহিম, শাহিন আকন্দ, শাহিনুজ্জামান মিন্টু, গোলাম আযম সৈকত, আজিজুল হক পাটোয়ারী, মিজানুর রহমান মোল্লা, অ্যাডভোকেট শফিউল বশর সজল, মাসুদ আহমেদ, সেলিম হোসেন মুন্না আকন্দ, মিজানুর রহমান খান, শরীফ আল ফরহাদ দিপু, কাজী মিজবাউল আলম, মুজাহিদুল ইসলাম, আনোয়ার জাহিদ, মোহাম্মদ আরিফ, সুমন চৌধুরী, মাসুদ সরকার, সবুর খান সাগর, রাকিবুল ইসলাম রোকন, ফজলুল হক নীরব, জাহাঙ্গীর আলম, ইয়াকুব রাজু, শফিউল আযম, স্বপন কুমার মণ্ডল, রবিউল হাসান আরিফ, নজরুল ইসলাম নাহিদ, বিশ্বজিৎ ভদ্র, ফরিদ খান, মহিবুল্লাহ জয়, সেলিম রেজা, আজিম উদ্দিন মিরাজ, এম কামরুল ইসলাম, খসরু আহমেদ হিরন, কবির আহমেদ, খন্দকার আমিনুল হক আকন, মাজেদুল ইসলাম মাসুম, জসিম উদ্দিন সিদ্দিকী শোভন, অ্যাডভোকেট এমদাদুল হক ইমরান, মাইন উদ্দিন বেগ সুজন, নজরুল ইসলাম, এবাদুল হক পারভেজ, জাহিদুল ইসলাম হিরন, আমির হোসেন বাদশা, মাহমুদ খান, দুলাল মাতব্বর, মাসুদ রানা, মানিক হোসেনসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠান শেষে মরহুম জাকির হোসেন নান্নুর রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে পুরো আয়োজনজুড়ে বারবার উচ্চারিত হয়েছে একটি প্রশ্ন—দলের দুঃসময়ে আত্মত্যাগ করা নেতাদের মূল্যায়ন কবে হবে? অনেকের মতে, নান্নুর স্মরণসভা শুধু একজন নেতাকে স্মরণ করার অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে অবমূল্যায়নের শিকার ত্যাগী নেতাদের নীরব আর্তনাদেরও প্রতিধ্বনি।