
X
সংগৃহীত ছবি
যেকোনো ফুটবলারের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ। সবুজ ঘাসের এই জাদুকরী গালিচাতেই লেখা হয় শ্রেষ্ঠত্বের রূপকথা, জন্ম নেয় অমর সব স্মৃতি। কিন্তু প্রতিটি সুন্দর গল্পের মতো এখানেও লুকিয়ে থাকে এক নির্মম সত্য-সব মঞ্চেরই একদিন আলো নেভে।
বিশ্বকাপ তো শুধু ট্রফি জয়ের হাসিতেই উজ্জ্বল হয় না, সাক্ষী থাকে বহু বিদায়ের কান্না ও গভীর নীরবতারও। ২০২৬ বিশ্বকাপেও বিষাদের সুর বাজিয়ে, অনেক রথী-মহারথী তাদের রঙিন জার্সিতে শেষ অধ্যায় দেখে ফেলেছেন। ম্যানুয়েল নয়ার-নেইমারদের মতো ফুটবলের অনেক ‘শিল্পীর’ পথচলায় চূড়ান্ত এক ছেদচিহ্ন একে দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপ।
ম্যানুয়েল নয়ার (জার্মানি, বয়স: ৪০)
২০১০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে পা রেখেছিলেন, আর ঠিক চার বছর পরই উঁচিয়ে ধরেছিলেন সেই সোনালী ট্রফিটি। তবে এরপর থেকে জার্মানির বিশ্বকাপ সাফল্য বলতে গেলে নেই বললেই চলে। এবার প্যারাগুয়ের কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার মধ্য দিয়েই শেষ হলো নয়ারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
ইউরো ২০২৪-এর পরই নীতিগতভাবে অবসর নিয়েছিলেন নয়্যার। কিন্তু এই টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে সিদ্ধান্ত বদলে আবার দলে ফেরেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের ২৩তম ও শেষ ম্যাচটি খেলার পর নয়ার বলেন, ‘এমন তেঁতো বিদায় সত্ত্বেও, ফিরতি আসার এই সিদ্ধান্তে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।’
নেইমার (ব্রাজিল, বয়স: ৩৪)
২০১৪ সালে অভিষেকেই জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন নেইমার। তবে এই বিশ্বকাপে চোটের থাবায় অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত নরওয়ের কাছে হেরে ব্রাজিলের বিদায় নেওয়ার ম্যাচে সান্তোসের এই ‘রাজপুত্র’ মাঠে কাটাতে ছিলেন মাত্র ৫৫ মিনিট। ম্যাচ শেষের পরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। ২০১০ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে নিজের অভিষেকের কথা স্মরণ করে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই আমার পথচলা শুরু হয়েছিল, আর এখানেই তা শেষ হলো। গল্পটা এখানেই শেষ।’
নিকোলাস ওতামেন্দি (আর্জেন্টিনা, বয়স: ৩৮)
২০১০ সালে বিশ্বকাপে প্রথম পা রাখা এই আপসহীন ডিফেন্ডার ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে আর্জেন্টিনার ট্রফি জয়ের প্রতিটি মিনিট মাঠে ছিলেন। তবে এবারের বিশ্বকাপ নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়াটা একটু কঠিনই হয়ে উঠেছিল তাঁর জন্য। মার্চেই অবসরের ঘোষণা দেওয়া ওতামেন্দি এবার একটি ম্যাচ বাদে বাকি সবকটিতেই মাঠে নামেন। বিদায় বেলায় তিনি বলেন, ‘এটিই আমার শেষ বিশ্বকাপ, এরপর থেকে আমি কেবলই একজন সমর্থক।’
মেসি রোনালদো
আর্জেন্টিনার মাটিতে নিজের শেষ ম্যাচটি তার জন্য এক অবিস্মরণীয় শ্রদ্ধার্ঘ্য হয়ে থাকবে; যেখানে লা বোম্বোনেরায় তাকে সম্মান জানাতে একটি পেনাল্টি শট নিতে দিয়েছিলেন খোদ লিওনেল মেসি।
সাদিও মানে (সেনেগাল, বয়স: ৩৪)
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে সেনেগালের বিদায়ের পর জাতীয় দলকে বিদায় বললেন সাদিও মানে। ২০২১ সালে সেনেগালকে প্রথমবারের মতো আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন) জেতানো এবং বৈশ্বিক মঞ্চে দলটিকে বড় সাফল্য এনে দেওয়ার কারিগর হিসেবে তার নাম সবার ওপরে থাকবেন ‘তেরেঙ্গা লায়ন’দের এই মহাতারকা।
অবসরের ঘোষণা দিয়ে সেনেগাল অধিনায়ক সাদিও মানে আবেগঘন বিবৃতিতে লিখেন, ‘এই পতাকার জন্য আমি আমার সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি। মাতৃভূমির জন্য আমি সবসময় আমার সেরাটা উজাড় করে দিয়েছি এবং লড়েছি জানপ্রাণ দিয়ে।’
রিয়াদ মাহরেজ (আলজেরিয়া, বয়স: ৩৫)
২০১৪ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে একটি মাত্র ম্যাচ খেলেছিলেন রিয়াদ মাহরেজ। এরপর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবার সুযোগ পেতে দীর্ঘ ১২টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। এবার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করলেও, শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নেয় আলজেরিয়া-যা ছিল মাহরেজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
বিদায় বেলায় আবেগপ্লুত মাহরেজ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আলজেরিয়াকে প্রতিনিধিত্ব করার একটা স্বপ্ন ছিল আমার। দেশের হয়ে খেলতে পারাটা ছিল এক অসীম সম্মান ও চরম গর্বের বিষয়।’ তার বিদায়ে আফ্রিকা ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ) এক বিবৃতিতে জানায়, ‘আপনি আমাদের এমন সব স্মৃতি উপহার দিয়েছেন যা সময় কখনো মুছে ফেলতে পারবে না। ধন্যবাদ, রিয়াদ মাহরেজ।’
গিলিয়ার্মো ওচোয়া (মেক্সিকো, বয়স: ৪১)
২০১৪ বিশ্বকাপে স্বাগতিক ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ক্লিনশিট রেখে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন ওচোয়া। এবার টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ খুব একটা পাননি ঠিকই, তবে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে শেষ ১২ মিনিটের জন্য মাঠে নেমেছিলেন। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে সতীর্থরা তাকে দুর্দান্তভাবে সংবর্ধিত করেন।
ম্যাচ শেষে কোচ হাভিয়ের আগিরে বলেন, ‘ও যখনই মাঠে পা রাখল, মুহূর্তেই বাকিসব কিছু ফিকে হয়ে গেল। ও একজন বিশ্বমানের কিংবদন্তি এবং ওকে নিয়ে আমি ভীষণ গর্বিত।” পরবর্তীতে সামাজিক মাধ্যমে ওচোয়া লেখেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে খেলাটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরম পাওয়া। আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য এবং সবসময় পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ। ভালোবাসি তোমায়, মেক্সিকো।’
এছাড়া বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন প্যাট্রিক শিক, ইনার ভ্যালেনসিয়া, মার্কো আর্নাউতোভিচ ও ক্রেগ গর্ডনের মতো তারকারাও। ৩০ বছর বয়সি চেক ফরোয়ার্ড প্যাট্রিক শিক ইউরো ইউরো ২০২০-এ তাঁর সেই অবিশ্বাস্য মাঝমাঠের গোল ও যৌথ শীর্ষ গোলদাতা হিসেবে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মাইলফলক।
ইকুয়েডরের ৩৬ বছর বয়সি ইতিহাসসেরা গোলদাতা ইনার ভ্যালেনসিয়া বিশ্বকাপে টানা ছয় গোল করার অনন্য রেকর্ডের স্বাক্ষর রেখে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন। অন্যদিকে ৩৭ বছর বয়সি অস্ট্রিয়ান তারকা মার্কো আর্নাউতোভিচ তাঁর দুর্দান্ত শারীরিক শক্তি ও স্কিলের মিশেলে দীর্ঘ দিন জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়ে বিদায় নিলেন। আর স্কটল্যান্ডের ফুটবলে ৪৩ বছর বয়সি বয়োজ্যেষ্ঠ গোলকিপার ক্রেগ গর্ডন দীর্ঘ দুই দশকের বিশ্বস্ত সার্ভিস শেষে শেষবার গ্লাভস জোড়া খুলে রাখার ঘোষণা দিলেন।
একই বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় নিশ্চিত করলেন আইভরি কোস্টের ৩৫ বছর বয়সি সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার জাঁ মাইকেল সেরিও। আইভরি কোস্টের মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গত ২০১৫ ও ২০২৪ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন) জয়ে তিনি ছিলেন দলের অনবদ্য কাণ্ডারি। পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে নিখুঁত পাসিং আর দুর্দান্ত গেম রিডিংয়ের মাধ্যমে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করা এই তারকা নিজ দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে তুলে দিলেন এক যুগের ব্যাটন।