ময়মনসিংহে পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি ড্রেন প্রকল্প, জলাবদ্ধতায় নগরবাসী

হোসাইন সুলভ, ময়মনসিংহ

সারাবাংলা

এক পশলা বৃষ্টিই যেন আতঙ্কের নাম। কয়েক ঘণ্টার মাঝারি বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় সড়ক, গলিপথ, বাজার আর বাসাবাড়ির আঙিনা।

2026-07-25T17:05:07+00:00
2026-07-25T17:05:07+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
ময়মনসিংহে পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি ড্রেন প্রকল্প, জলাবদ্ধতায় নগরবাসী
হোসাইন সুলভ, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৫:০৫ পিএম   (ভিজিট : ২৪)
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা
X

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা

এক পশলা বৃষ্টিই যেন আতঙ্কের নাম। কয়েক ঘণ্টার মাঝারি বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় সড়ক, গলিপথ, বাজার আর বাসাবাড়ির আঙিনা। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি। ড্রেন উপচে নোংরা পানি ঢুকে পড়ে ঘরে। অথচ এই জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় পাঁচ বছর আগে শুরু হয়েছিল ময়মনসিংহ নগরীর বৃহৎ ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্প। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। বরং অনেক জায়গায় অর্ধসমাপ্ত ড্রেন, খোলা নালা, অসমাপ্ত সড়ক এবং নির্মাণ ত্রুটিই নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, আকুয়া, টাউন হল, বাঁশবাড়ি, কেওয়াটখালী, চরপাড়া, শম্ভুগঞ্জসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজন থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের 'সড়ক উন্নয়ন ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্কসহ নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণ' প্রকল্পের আওতায় ২০২১ সালের জুনে ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩২২ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে সময়সীমা আবারও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের আকুয়া দক্ষিণপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক বছর ধরে রাস্তা ও ড্রেনের কাজ অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ড্রেনের মাঝখানে বিদ্যুতের খুঁটি থাকায় সেখানে ময়লা জমে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ও বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ছে।

এলাকার বাসিন্দা ও সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন  বলেন, এই এলাকার মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ রাস্তা ও ড্রেন। কাজ শুরু করেই ফেলে রাখা হয়েছে। বারবার জানানো হলেও কোনো সমাধান হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। শুধু আমাদের এলাকা নয়, পুরো নগরীর একই অবস্থা।

বাঁশবাড়ি কলোনির বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবারই বলা হয় কাজ শেষ হবে, জলাবদ্ধতা কমবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখি না। শত শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও সাধারণ মানুষের কষ্ট কমছে না।

জেলা খাদ্য অফিসের সামনের ড্রেনটিও দীর্ঘদিন ধরে অর্ধসমাপ্ত। ড্রেনে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও বসানো হয়নি ঢাকনা। এতে পথচারীদের চলাচলেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

টাউন হল এলাকার বাসিন্দা সোহরাব আলী বলেন, ড্রেনটি দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থায় পড়ে আছে। পরিষ্কারও করা হয় না, ঢাকনাও দেওয়া হয়নি। বৃষ্টি হলে দুর্গন্ধ ছড়ায়, চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে।

নগরীর চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা রুবেল মিয়া বলেন, বৃষ্টি হলেই মোটরসাইকেল বের করা যায় না। ছোট শিশুদের স্কুলে নিতে সমস্যা হয়। অনেক সময় বাসার ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ে।

কেওয়াটখালীর গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, বৃষ্টি হলে সবার আগে ঘরের আসবাবপত্র উঁচু করে রাখতে হয়। পানি ঢুকে রান্নাঘর পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ।

রিকশাচালক আব্দুল মালেক বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে অনেক রাস্তায় রিকশা নিয়ে যেতে পারি না। যাত্রীও কমে যায়। আয়-রোজগারে প্রভাব পড়ে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ও আশপাশের ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। হাসপাতালের সামনে একটি ফার্মেসির কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বৃষ্টি হলেই দোকানের সামনে পানি জমে। রোগী ও স্বজনরা কষ্ট করে আসেন। অনেক সময় দোকানেও পানি ঢুকে যায়।

ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. নূরুজ্জামান বলেন, রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে সেই সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে। কোথাও ড্রেনের উচ্চতা সঠিক নয়, কোথাও পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু বর্ষাকালে নয়, সারা বছর নিয়মিত ড্রেন মনিটরিং ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল বলেন, পুরো প্রকল্পটিই পরিকল্পনার ঘাটতি নিয়ে বাস্তবায়ন হয়েছে। নগরীর প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় না এনে দায়সারাভাবে কাজ করায় আজ মানুষ জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রোকনুজ্জামান রোকন বলেন, ড্রেনের মাঝখান থেকে বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণের কাজ চলমান রয়েছে। আগামী বর্ষার আগেই পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যাওয়ায় প্রকল্পে স্থবিরতা আসে। পরে পুনরায় টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না, বিদ্যমান ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার, সঠিক পরিকল্পনায় সংযোগ স্থাপন এবং দ্রুত অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছরের মতো আগামী বর্ষাতেও একই দুর্ভোগের শিকার হতে হবে।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy