
X
প্রতীকী ছবি
দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য স্বাস্থ্যসামগ্রীর মধ্যে টুথব্রাশ অন্যতম। প্রতিদিন অন্তত দুইবার দাঁত ব্রাশ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন দন্ত চিকিৎসকরা। তবে বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ড, নকশা ও দামের টুথব্রাশের ভিড়ে অনেকেরই প্রশ্ন-বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো টুথব্রাশ কোনটি?
দন্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। কারণ একটি টুথব্রাশ সবার জন্য সমান উপযোগী নয়। একজন ব্যক্তির দাঁত, মাড়ির অবস্থা, বয়স এবং ব্রাশ করার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে কোন টুথব্রাশ সবচেয়ে কার্যকর হবে। তাই কোনো একটি ব্র্যান্ডকে "সবচেয়ে ভালো" বলার পরিবর্তে সঠিক বৈশিষ্ট্যের টুথব্রাশ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে দেশি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথব্রাশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ওরাল-বি (Oral-B), কোলগেট (Colgate), পেপসোডেন্ট (Pepsodent), সেনসোডাইন (Sensodyne), ক্লোজআপ (Closeup) এবং অ্যাকমি, স্কয়ারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টুথব্রাশ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ব্র্যান্ডের বিভিন্ন মডেলে সফট, মিডিয়াম ও হার্ড ব্রিসল, ছোট ও বড় হেড, ফ্লেক্সিবল নেক এবং আরামদায়ক গ্রিপের মতো নানা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
দন্ত চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ মানুষের জন্য নরম বা সফট ব্রিসল টুথব্রাশই সবচেয়ে নিরাপদ। এটি দাঁতের ওপর জমে থাকা প্লাক পরিষ্কার করতে সক্ষম হলেও মাড়ি ও দাঁতের এনামেলের ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলক কম। অন্যদিকে শক্ত বা হার্ড ব্রিসল দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে মাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, দাঁতের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি এবং এনামেল ক্ষয়ের আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, শুধু ব্র্যান্ডের নাম দেখে টুথব্রাশ কেনা উচিত নয়। ব্রিসলের মান, ব্রাশের মাথার আকার এবং হাতলের নকশাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ছোট মাথার টুথব্রাশ মুখের ভেতরের অংশে সহজে পৌঁছাতে পারে এবং পেছনের দাঁত পরিষ্কার করতে সুবিধা হয়।
বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে সচেতন মানুষের মধ্যে বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রিক টুথব্রাশের ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে যাদের হাতে শক্তি কম, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা অর্থোডন্টিক ব্রেস ব্যবহারকারীদের জন্য অনেক দন্ত চিকিৎসক ইলেকট্রিক টুথব্রাশের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সাধারণ ম্যানুয়াল টুথব্রাশ দিয়েও সমান কার্যকরভাবে দাঁত পরিষ্কার করা সম্ভব বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
শুধু টুথব্রাশের গুণগত মান নয়, সঠিকভাবে ব্রাশ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে খুব জোরে দাঁত ব্রাশ করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, অন্তত দুই মিনিট ধরে হালকা চাপে গোলাকার বা ছোট ছোট স্ট্রোকে দাঁত ব্রাশ করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সুপারশপ, ফার্মেসি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে বিভিন্ন দামের টুথব্রাশ পাওয়া যায়। সাধারণ টুথব্রাশের দাম প্রায় ৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে হলেও প্রিমিয়াম ও বিশেষায়িত মডেলের দাম আরও বেশি হতে পারে। তবে বেশি দাম মানেই যে সেটি সবার জন্য ভালো হবে, এমন ধারণা সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশুদের জন্য আলাদা টুথব্রাশ ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন দন্ত চিকিৎসকরা। শিশুদের দাঁত ও মাড়ি সংবেদনশীল হওয়ায় তাদের জন্য ছোট মাথা এবং অতিরিক্ত নরম ব্রিসলযুক্ত টুথব্রাশ নির্বাচন করা উচিত। একই সঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর অথবা ব্রিসল ছড়িয়ে গেলে টুথব্রাশ পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ সচেতনতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বাঁশের টুথব্রাশও কিছু মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যদিও এসব টুথব্রাশ এখনও বাংলাদেশের বাজারে সীমিত পরিসরে পাওয়া যায়, তবুও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে আগ্রহীদের মধ্যে এর চাহিদা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টুথব্রাশ কেনার সময় কয়েকটি বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। যেমন-ব্রিসল নরম কি না, ব্রাশের মাথা মুখের জন্য উপযোগী কি না, হাতল আরামদায়ক কি না এবং পণ্যটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের তৈরি কি না। পাশাপাশি একই টুথব্রাশ দীর্ঘদিন ব্যবহার না করে নির্ধারিত সময়ে পরিবর্তন করাও জরুরি।
দন্ত চিকিৎসকদের অভিমত, দাঁতের সুস্থতা নির্ভর করে শুধু টুথব্রাশের ওপর নয়; সঠিক টুথপেস্ট নির্বাচন, নিয়মিত ব্রাশ করা, ফ্লস ব্যবহার, অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা এবং বছরে অন্তত একবার দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "সবচেয়ে ভালো টুথব্রাশ" বলতে এমন একটি টুথব্রাশকে বোঝায়, যা ব্যবহারকারীর দাঁত ও মাড়ির জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক এবং কার্যকরভাবে প্লাক পরিষ্কার করতে সক্ষম। তাই ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তার চেয়ে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক টুথব্রাশ নির্বাচন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সচেতনতা, সঠিক ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি সাধারণ টুথব্রাশও দাঁতের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে নিজের জন্য উপযুক্ত টুথব্রাশ নির্বাচন করাই হতে পারে সুস্থ হাসির প্রথম পদক্ষেপ।