
X
সংগৃহীত ছবি
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট স্কোয়াডে সৌম্য সরকারের অন্তর্ভূক্তি চমক তৈরি করেছে। পাঁচ বছর পর টেস্ট দলে ফেরা এই বাঁহাতি ওপেনারের অন্তর্ভুক্তির অন্যতম কারণ অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন। নির্বাচকদের বিশ্বাস, সেখানে সৌম্য ইতিবাচক ও আগ্রাসী ব্যাটিং করতে পারবেন। সোমবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে সৌম্যকে দলে নেয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন।
২০২১ সালে সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিলেন সৌম্য। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ফিরলেন জাতীয় দলে। টেস্টে তার পরিসংখ্যান খুব সমৃদ্ধ না হলেও সর্বশেষ জাতীয় ক্রিকেট লিগে দারুণ ছন্দে ছিলেন তিনি। ৬৩৩ রান করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন সৌম্য। আর সেই পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে তার অভিজ্ঞতাও নির্বাচকদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সৌম্যকে দলে নেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন বলেন, ‘আমাদের ব্যাটিং কম্বিনেশনে অনেক বাঁহাতি ব্যাটসম্যান হয়ে যাচ্ছিল। তাই একজন ডানহাতি ওপেনারের প্রয়োজন ছিল। জয় আমাদের পরিকল্পনায় ছিল, কিন্তু তার সাম্প্রতিক ব্যাটিং নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। তাই তাকে এ-দলের সফরে পাঠানো হচ্ছে, যেন রান করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরে আসতে পারে। অন্যদিকে সৌম্য অভিজ্ঞ ক্রিকেটার এবং অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতাও তার আছে। এই কারণেই তাকে নেওয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশ সর্বশেষ টেস্ট খেলেছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল টাইগাররা। মূলত ব্যাটিং ব্যর্থতার খেসারতই দিতে হয়েছে পুরো দলকে। জিম্বাবুয়ের বোলিং আক্রমণের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। আগামী মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। সেই সিরিজে ব্যাটারদের ইতিবাচক ও আক্রমণাত্মক মানসিকতায় খেলার বিকল্প দেখছেন না হাবিবুল বাশার।
সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে ব্যাটিং করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আক্রমণাত্মক বলতে বেপরোয়া ক্রিকেট বোঝাচ্ছি না, বরং ইতিবাচক ক্রিকেট। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা সব সময় প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে চায় এবং কেউ তাদের পাল্টা আক্রমণ করবে, সেটি তারা খুব একটা আশা করে না। তাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে পারলে আমাদের ব্যাটারদের জন্য সেটি বেশি কার্যকর হতে পারে।’
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারের মূল কারণ হিসেবে ব্যাটিং ব্যর্থতাকেই সামনে এনেছেন বাশার। তিনি বলেন, ‘জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট হারের জন্য আমাদের বোলিংকে দায়ী করি না। আমার বিশ্বাস, প্রথম ইনিংসে আমরা ৩০০-এর বেশি রান করতে পারলে ম্যাচের চিত্রই ভিন্ন হতে পারত। তাইজুল সাত উইকেট নিয়েছে, আমাদের বোলিং আক্রমণেও পরীক্ষিত বোলাররাই ছিল; এবাদত হোসেন, খালেদ আহমেদ ও হাসান মাহমুদ সবাই টেস্ট দলের নিয়মিত সদস্য। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে, হারের মূল কারণ ছিল ব্যাটিং। শুধু ওই টেস্ট নয়, পুরো জিম্বাবুয়ে সফরেই আমাদের ব্যাটিং প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি।’
গতিময় পেসার হিসেবে সারা বিশ্বের আলোচনায় থাকা নাহিদ রানাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সফরে অনেক স্বপ্ন ছিলো বাংলাদেশের। কিন্তু তরুণ এই পেসার চোটে পড়ে অস্ট্রেলিয়া সফর থেকেই ছিটকে গেছেন। জিম্বাবুয়ে সফরে টি২০তে চোটে পড়ায় প্রশ্ন উঠে, কেন তাকে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলাতে হলো? প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন এই বিষয়ে দিয়েছেন ব্যাখ্যা। ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের কারিগরি দিক তুলে ধরে নাহিদকে ‘গ্রিন জোনে’ রাখতে খেলাতেই হতো বলে জানিয়ে এই চোটকে তিনি ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
দীর্ঘ দুই যুগ পর অস্ট্রেলিয়ার মাঠে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে যাবে বাংলাদেশ দল। অগাস্টের ১৩ তারিখ ডারউইনে শুরু হবে এই সিরিজ। তার আগে বাংলাদেশ দল চোটজর্জর। নাহিদ, লিটন দাসদের মতো নিয়মিত পারফর্মারদের পাচ্ছে না তারা।
নাহিদ রানাসহ পেসারদের ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে হাবিবুল বাশার বলেন, ‘নাহিদ রানার ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের বিষয়টি এখন আর শুধু মুখে বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে জিপিএস ট্র্যাকারের মাধ্যমে ক্রিকেটারদের প্রতিটি মুভমেন্ট ট্র্যাক করা হয় এবং সেই তথ্য অনুযায়ী নির্ধারিত হয় কে কোন সিরিজে কয়টি ম্যাচ খেলবে। নাহিদ রানা ছাড়াও তাসকিনসহ আমাদের যত ফাস্ট বোলার আছে, সবার ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।’
অস্ট্রেলিয়া সিরিজের হিসাব তুলে ধরে প্রধান নির্বাচক স্পষ্ট করেন, ‘নাহিদ রানার ক্ষেত্রে যদি দেখেন, আমরা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে (ঘরের মাঠে সিরিজে) তাকে সব ম্যাচ খেলাইনি। সে প্রথমে দুটি ওয়ানডে খেলার পর এক সপ্তাহের বিরতি পেয়েছে এবং এরপর দুটি টি-টোয়েন্টি খেলেছে। ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট অনুযায়ী সে টেস্ট খেলার জন্যও এভেইলেবল ছিল। এমনকি ফিজিওর রিপোর্ট অনুযায়ী সে এবং আমাদের বাকি নিয়মিত ফাস্ট বোলাররা টেস্ট খেলার জন্য সম্পূর্ণ ফিট ছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া যেহেতু আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ, তাই বাড়তি সতর্কতা হিসেবে আমরা তাকেসহ আমাদের মূল তিনজন ফাস্ট বোলারকে টেস্টে খেলাইনি।’
পেসারদের মাঠে না রেখে নির্দিষ্ট ছন্দে রাখার পেছনে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি বাধ্যবাধকতার কথা তুলে ধরেন হাবিবুল, ‘নাহিদ রানা ওডিআইতে ভালো (সুস্থ) ছিল এবং সেখানে তিনটি ম্যাচের মধ্যে দুটি খেলেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে টি-টোয়েন্টির দ্বিতীয় ম্যাচটি খেলতে গিয়ে সে ব্যথা পায়। অনেকে মনে করতে পারেন তাকে না খেলালেও চলত, কিন্তু ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের একটি কারিগরি দিক আছে।’
এই কারিগরি দিক ও জোন ব্যবস্থার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বোলারদের কন্ডিশনকে রেড, গ্রিন এবং ইয়োলো—এই তিনটি জোনে ভাগ করি। একজন ফাস্ট বোলার যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বোলিং করে তবে সে যেমন ইনজুরির ঝুঁকিতে (রেড জোন) থাকে, তেমনি যদি তাকে ম্যাচ না খেলিয়ে বসিয়ে রাখা হয়, তবে লোড কম হওয়ার কারণেও সে ইনজুরির ঝুঁকিতে পড়ে যায়। তাই টেস্ট ম্যাচের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হলে একজন বোলারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ বল করে ‘গ্রিন জোনে’ থাকতে হয়।’
‘সহজ কথায়, একজন ফাস্ট বোলারকে বসিয়ে রাখা তার জন্য ভালো নয়; তাকে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে বোলিংয়ের মধ্যে থাকতে হয়। নাহিদ রানার ক্ষেত্রেও এই চিন্তাভাবনা থেকেই তাকে ম্যাচ খেলানো হয়েছিল। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে সে ইনজুরড হয়েছে, তবে এই ইনজুরি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েও হতে পারত।’
সবশেষে ফাস্ট বোলারদের চোট নিয়ে নিজেদের সচেষ্ট থাকা এবং বাস্তবতার কথা জানিয়ে সুমন বলেন, ‘ফাস্ট বোলারদের ইনজুরিমুক্ত রাখা সবসময়ই কঠিন একটি কাজ। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা শতভাগ চেষ্টা করেও ইনজুরি পুরোপুরি এড়াতে পারি না, বড়জোর তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারি। আমরা নাহিদ রানার প্রতি প্রতিটি মুহূর্তে বাড়তি যত্ন নিচ্ছি এবং অনেক নিয়ম মেনে চলছি, তারপরও এমন ইনজুরি আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত দুঃখজনক।’