
X
সংগৃহীত ছবি
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মধ্য দিয়ে স্পেনের জাতীয় জীবনে নেমে এসেছিল যৌথ উদযাপনের এক অবিশ্বাস্য উপলক্ষ। তবে ঐতিহাসিক এই জয়ের আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বর্ণবাদী ও ইসলামফোবিক (ইসলামবিদ্বেষী) মন্তব্যের ঝড়।
বৈশ্বিক এই আসরটি বিশ্বমঞ্চে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ও ঘৃণা ছড়ানোর অন্যতম বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে বর্ণবাদী আক্রমণের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন স্পেনের ১৭ বছর বয়সী বিস্ময়কর ফুটবলার লামিনে ইয়ামাল
স্পেনের অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ‘স্প্যানিশ অবজারভেটরি অন রেসিজম অ্যান্ড জেনোফোবিয়া’-এর প্রকাশিত সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে অনলাইনে বৈষম্যমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রায় ৪০ হাজার ৮৬১টি কনটেন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনলাইনে ঘৃণা ছড়ানোর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ছিল খেলাধুলা, যা মোট চিহ্নিত কনটেন্টের ১৬ শতাংশ।
শীর্ষ কারণ ছিল ‘জননিরাপত্তা’ সম্পর্কিত বিতর্কিত ইস্যুগুলো (৬৯ শতাংশ)। বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন জাতীয় দল, তাদের সমর্থক ও খেলোয়াড়দের লক্ষ্য করে প্রচুর পরিমাণে বর্ণবাদী ও ইসলামোফোবিক বার্তা ছড়ানো হয়েছে।
বিশেষ করে স্প্যানিশ বিস্ময় ইয়ামালের পারিবারিক ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক পোস্ট করা হয়।
স্পেনে জন্ম নেওয়া ও স্প্যানিশ জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করা লামিনে ইয়ামালের বাবা মরক্কোর এবং মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির নাগরিক। তার জীবনের গল্প স্প্যানিশ সমাজের বৈচিত্র্যকে উপস্থাপন করলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই পরিচয়কেই বারবার আক্রমণের হাতিয়ার করা হয়েছে।
বিশ্বকাপ চলাকালীন সেমিফাইনালে স্পেন ও ফ্রান্সের ম্যাচের আগে স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয় তার এক কলামে ফ্রান্স দলকে ‘ফরাসিবিহীন দল’ হিসেবে আখ্যা দিলে পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে কোনো বিতর্কে না গিয়ে ইয়ামাল ফুটবলকে সামাজিক সংহতির বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “ফুটবলের যদি কোনো মূল উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তবে তা হলো সমাজকে একত্রিত করা।”
তবে এখানেই বিতর্ক থামেনি। ফাইনালের কিছুদিন আগে এক আর্জেন্টাইন সাংবাদিক ইয়ামালের মরক্কান বংশোদ্ভূত পরিচয় তুলে ধরে বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যাকে স্পেনে ইয়ামালকে ছোট করার হীন প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওবের্যাক্সের তথ্যমতে, বিশ্লেষণের আওতায় আসা ঘৃণা ছড়ানো বার্তার ৮৮ শতাংশই ছিল উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের কেন্দ্র করে।
বুলেটিনে অনলাইন বার্তার ধরণ নিয়ে আরও একটি আশঙ্কাজনক দিক উঠে এসেছে। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অমানবিক হিসেবে তুলে ধরা বা চরম অপমানজনক কনটেন্টের পরিমাণ এক মাসেই ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে। এছাড়া ৩২ শতাংশ বার্তায় অভিবাসীদের ‘হুমকি’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে এবং ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে তাদের দেশ থেকে বিতাড়নের দাবি তোলা হয়েছে। ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি সহিংসতার উসকানি দেওয়া হয়।
বিদ্বেষ ছড়াতে ছবি, ভিডিও, মিম এবং সংকেতিক ভাষার ব্যবহার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লক করা বা শনাক্ত করা সামাজিক মাধ্যমগুলোর নীতি-পুলিশের জন্য কঠিন করে তোলে। রিপোর্ট করা বিদ্বেষমূলক পোস্টের মাত্র ৬১ শতাংশ মুছে দিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো। এর মধ্যে টিকটক সর্বোচ্চ ৯৮ শতাংশ এবং এক্স (সাবেক টুইটার) ৯৩ শতাংশ কনটেন্ট সরিয়ে নিলেও ফেসবুক ৬২ শতাংশ, ইনস্টাগ্রাম ৩২ শতাংশ এবং ইউটিউব মাত্র ৮ শতাংশ পোস্ট সরাতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে ইয়ামাল এবং অন্যান্য তারকাদের নিয়ে প্রচুর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত কনটেন্ট ছড়ানো হয়। ইয়ামালের ধর্মীয় পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে একটি এআই-উৎপাদিত ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেখানে দাবি করা হয় স্প্যানিশ সংবাদ চ্যানেল ‘ক্যানাল ২৪ হরাস’ নাকি ইয়ামালের বিরুদ্ধে ‘উগ্রবাদ’-এর তদন্তের খবর সম্প্রচার করেছে!
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিশৃঙ্খলা ও অনলাইনের ঘৃণাত্মক বার্তা ক্রীড়াজগতের গণ্ডি ছাড়িয়ে সার্বিক সমাজে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, ওবের্যাক্সের তথ্য তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এক মাঠে বিশ্বের সেরা দল হয়ে ওঠার গৌরবের পাশাপাশি ডিজিটাল দুনিয়ার বিষাক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইয়ামাল ও তার মতো তরুণ উদীয়মান তারকাদের।