প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৪৪ পিএম (ভিজিট : ২)

X
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুধু একজন রাজনীতিকের নাম নয়; বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রতিকূলতা ও নেতৃত্বের এক অনন্য অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নাম। রাজনীতির নানা বাঁক পেরিয়ে তিনি আজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সবচেয়ে দুঃসময়ে ছিলেন দলের কাণ্ডারি, আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি কঠিন অধ্যায়ে ছিলেন সামনের সারিতে। স্বৈরশাসনের জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করেও রাজনীতির পথ থেকে সরে যাননি। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সেই ত্যাগ-সংগ্রামেরই যেন স্বীকৃতি মিলল এবার। দল ও সরকারের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি পা রাখতে চলেছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে—যেতে চলেছেন বঙ্গভবনে।
কথায় তার স্বতন্ত্র মাধুর্য, ব্যক্তিত্বে সহজাত সৌজন্য। বলনে, বয়ানে ও ভাষার সৌকর্যে তিনি আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছেন মানুষের মনে। পলিমাটির মতো কোমল হৃদয়ের এই মানুষটিই আবার সংকটের মুহূর্তে হয়ে উঠেছেন দৃঢ়চেতা কাণ্ডারি। নেতৃত্বের প্রতিটি ধাপে সংগ্রামের স্পষ্ট ছাপ, প্রতিকূলতার মুখে অটুট থাকার এক দীর্ঘ ইতিহাস তার রাজনৈতিক পথচলাকে করেছে অনন্য।
এই জায়গায় পৌঁছাতে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে ভাসানীর ন্যাপ, জিয়াউর রহমানের সচিবালয় থেকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের জেলা রাজনীতি, খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভা থেকে হাসিনা সরকারের আমলে কারাবরণ—রাজনীতির নানা বাঁক পেরিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। এরপর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার ও দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি থেকে উঠে আসা এই রাজনীতিকের দীর্ঘ পথচলায় যেমন রয়েছে সংগ্রামের গল্প, তেমনি রয়েছে সৌজন্য, মানবিকতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ছাপ। এবার সেই অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে বঙ্গভবনে—রাষ্ট্রের অভিভাবকের দায়িত্বে।
রাজনীতির পাঠ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন পরিবার থেকেই। তার এক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের ইয়ুথ পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। আরেক চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জিয়াউর রহমান সরকারের ভূমিমন্ত্রী, দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং পরে খালেদা জিয়ার আইনমন্ত্রী। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন মুসলিম লীগের রাজনীতিবিদ। ১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালে তিনি দুই দফায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ১৭ বছর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়রের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
তবে বাবার রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করেননি মির্জা ফখরুল। বরং তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ভিন্ন এক আদর্শিক পরিমণ্ডলে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র ফখরুল যুক্ত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে। সে সময় বামপন্থী রাজনীতির নানা মতাদর্শিক বিভাজনের মধ্যেও তিনি ছিলেন মুসলিম লীগবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় অংশ।
শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষকতা ও শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মানুষের কাছে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তি। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক পথচলায় নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পরে যোগ দেন বিএনপিতে। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পাড়ি দিয়েছেন অসংখ্য বন্ধুর পথ।
দল যখন ভাঙনের মুখে, সংকটে কিংবা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে, তখনও তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত যোদ্ধা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সাল থেকে খালেদা জিয়া কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করায় দলের মাঠের নেতৃত্বের বড় অংশই এসে পড়ে তার কাঁধে। পুলিশের সামনে, আদালতের বারান্দায় কিংবা সংবাদ সম্মেলনের মাইক্রোফোনে—বিএনপির মুখ হিসেবে বারবার সামনে এসেছেন মির্জা ফখরুল।
রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামেও সহযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন তিনি। নিজের হিসাব অনুযায়ী, রাজনৈতিক জীবনে ১১ বার কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে; সব মিলিয়ে সাড়ে তিন বছরের মতো সময় কেটেছে কারাগারে। কিন্তু প্রতিকূলতার সেই দীর্ঘ অধ্যায় পেছনে ফেলে আজ তিনি রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন মাইলফলকের সামনে।
বিএনপি সরকার গঠন করলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। আর এবার দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বের পথে তার যাত্রা—যেন বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের এক পূর্ণতার মুহূর্ত।