
X
বাংলাদেশ মিশনগুলো ২ বছর আগেও তাদের বাৎসরিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করলে সেখানে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কম ছিল। কিন্তু গত একবছরে শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতে আত্মহত্যা করে মৃত্যু হয়েছে ৮ জন প্রবাসীর। এর মধ্যে আবুধাবি বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ৪ জন ও দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে ৪ জনের এনওসি (অনাপত্তি পত্র) ইস্যু হয়। বাংলাদেশ মিশনগুলো জানায়, এরা অধিকাংশই পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করেছে।
তবে হঠাৎ করে দেশের বাইরে আত্মহত্যার এই প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া ভবিষ্যতের জন্য শঙ্কা বাড়াচ্ছে বলে জানান দেশটিতে থাকা বাংলাদেশী প্রবাসীরা।
এ বিষয়ে দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটের লেবার কাউন্সিলর ফাতেমা জাহান জানান, গত একবছরে তাদের দেওয়া চারজনের এনওসির মধ্যে প্রত্যেকে আমিরাতের বৈধ ভিসাধারী এবং প্রত্যেকেই বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। এদের একজন ময়মনসিংহ, একজন মুন্সীগঞ্জ এবং বাকি দুইজনের বাড়ি গাজীপুর ও কুমিল্লায়। এরা পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করেন বলে জানা গেছে।
এদিকে আবুধাবি দূতাবাসের কাউন্সিলর (স্থানীয়) লুৎফুন নাহার নাজিম জানান, দূতাবাস থেকে ১ বছরে তারাও চারজন প্রবাসীর এনওসি ইস্যু করেন, যাদের মৃত্যু হয় আত্মহত্যাজনিত কারণে।
প্রবাসে আত্মহত্যার বিষয়ে বাংলাদেশি বিভিন্ন শ্রেণি পেশার প্রবাসীরা জানান, আত্মহত্যা প্রবণতা নানান সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণে হতে পারে। প্রবাসীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা মূলত মনস্তাত্ত্বিক। যা আর্থিক সংকট ও পারিবারিক কলহের কারণে হয়। ঘরে ফিরতে না পারার কষ্ট থেকেও মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তবে মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা আত্মহত্যার প্রধান কারণ। হতাশা, জীবনের আনন্দ হারিয়ে ফেলা, বিষণ্ণতা এবং উদ্বিগ্নতাও উল্লেখযোগ্য হারে প্রবাসীদের মধ্যে দেখা যায়। বিশেষ করে করোনা পরিস্থিতির কারণে পৃথিবীব্যাপী যে কাজের সংকট, তাতে প্রবাসীদের আর্থিক ও মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক অসহযোগিতার কারণেও এই প্রবণতা বাড়ছে।
এ বিষয়ে দুবাই কমিউনিটির নেতা মোহাম্মদ আলী বলেন, 'করোনাকালীন সময় ইচ্ছে করলেও স্বল্প আয়ের প্রবাসীরা দেশে যেতে পারছেন না। প্রবাসে থেকে অর্জিত সম্পদ কিংবা পরিবার পরিজনকে দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। বিশেষ করে বিমান টিকিটের চড়া মূল্য তাদের হতাশ করছে। এসব বিষয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। যেকারণে হয়ত আত্মহত্যার পথে যাচ্ছেন তারা।'
দেশটিতে থাকা বাংলাদেশী প্রবাসীরা জানান, খুব বেশি মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে পড়া প্রবাসীদের সমস্যা মোকাবিলা ও সহযোগিতার উদ্দেশ্যে দূতাবাসে কন্সাল্টেন্সি ও হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা দরকার। তাতে করে আত্মহত্যার প্রবণতা কিছুটা হলেও কমবে। সংকটকালীন সময়ে পারিবারিক সহযোগিতা প্রবাসীদের মনোবল বাড়াতে পারে। প্রান্তিক প্রবাসীদের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থানে থাকা প্রবাসীদের সাথে মতবিনিময় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি করা গেলেও সচেতনতা বাড়বে।
প্রবাসীরা করোনা মহামারীর শুরু দিকের পরিস্থিতিতে একটু কোণঠাসা হয়ে থাকলেও এখন ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে। তবে আর্থিক ও মানসিক চাপ প্রবাসীদের মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় জানা গেছে।