প্রকাশ: বুধবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, ৪:১৯ পিএম (ভিজিট : ২৫৪৪)

X
মানুষের কাছে পৃথিবীর তাবৎ সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও চাহিদার শীর্ষে রয়েছে হীরা। প্রাচীনকাল থেকেই হীরাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। হীরার মূল্য কেমন হবে তা নির্ভর করে এর রং, কিভাবে কাটা হয়েছে, কতটা স্বচ্ছ প্রকৃতির এবং কত ক্যারেট ওজনের—এসব বিষয়ের ওপর। স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতার একক ক্যারেট হলেও হীরার ক্ষেত্রে ক্যারেট ভরের একক। বর্তমানে এর কদর শুধু উচ্চমূল্যের জন্য হলেও প্রাচীনকালে এর সঙ্গে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ও জড়িত ছিল। যেমন—প্রাচীন রোমান ও গ্রিসে হীরাকে দেবতাদের অশ্রু বা পতনশীল কোনো তারা মনে করা হতো। এটি অত্যন্ত মূল্যবান একটি ধাতু।
পৃথিবী নামক ভূখণ্ডে সর্বপ্রথম দক্ষিণ আফ্রিকার কিম্বার্লিতে এই হীরার খনি আবিষ্কৃত হয়। এ শহরটি নর্দান ক্যাপ রাজ্যের রাজধানী। শহরের সব কিছুতেই যেন ডায়মন্ড বা হীরা মিশে আছে। ডায়মন্ড ট্যাক্সি, ডায়মন্ড লজ, ডায়মন্ড প্যাভিলিয়ন মল, এমনকি এখানকার ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নামও ডায়মন্ড ওভাল। যে শহরের মাটির নিচে হীরার ছড়াছড়ি, সে শহরের সবকিছুর সঙ্গে ডায়মন্ড থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণ আফ্রিকায় যতো পর্যটকের সমাগম হয় তার একটা বড় অংশ আসে এই বিগ হোল বা দ্য কিম্বার্লি মাইনকে কেন্দ্র করে। প্রায় দশটির মতো হীরার খনি রয়েছে আফ্রিকার এই দেশে। কিন্তু আর সব হীরা খনির চেয়ে কিম্বার্লির কদর যেন একটু বেশি-ই। দেশটিতে রেকর্ড পরিমাণ হীরা উত্তোলন করা হয় বলে পরিত্যক্ত হবার পর জায়গাটির নাম দেয়া হয়েছে 'দ্য বিগ হোল কিম্বার্লি'। যেন রূপকথার গল্পের মতোই রহস্যে ঘেরা পৃথিবীর প্রথম এবং সবচেয়ে বড় এই হীরার খনি।
গোটা বিশ্বেই হীরার উপহার হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়। এর তৈরির প্রক্রিয়া বেশ জটিল, কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। মাটির অভ্যন্তরে থাকা কয়লা থেকে হীরার সৃষ্টি। আসলে হীরা গঠনে খুব সামান্যই অবদান রাখে কয়লা। হীরা তৈরি হয় ৯০০ থেকে ১৩০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আর ভূগর্ভের ১৪০ থেকে ১৯০ কিলোমিটার গভীরে। মাটির গভীরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের মাঝে থাকা হীরার মূল আকরিকগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে ওপরের দিকে উঠে আসে আগ্নেয়গিরির লাভার সঙ্গে। বাইরে আসার পর এরা শীতল হয়ে জমাট বাঁধে এবং কিম্বারলাইট (এক প্রকার শিলা) তৈরি করে। আফ্রিকায় হীরার প্রচুর খনিও রয়েছে।
হীরা ব্যবসার পুরোধা প্রতিষ্ঠান ডি বিয়ারস এই কিম্বার্লি খনির মালিক ছিল। ১৮৬৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ডি বিয়ারসের মালিকানাধীন একটি ফার্মেই ইরেসমাস জ্যাকব নামের এক ছেলে দক্ষিণ আফ্রিকার হোপ টাউনের অরেঞ্জ নদীর পাশে প্রথম হীরা খুঁজে পায়। পরবর্তীতে এই হীরার টুকরাকে 'ইউরেকা ডায়মন্ড' নামে অভিহিত করা হয়। তখনকার ক্যাপ কলোনির গভর্নর স্যার ফিলিপ উড হাউসের কাছে তৎকালীন ১ হাজার ৫০০ ডলারে তা বিক্রি হয়। কিম্বার্লিত খনিতে হীরা উত্তোলন শুরু হয় ১৮৭১ সালে, যা পরবর্তীতে ১৯১৪ সালর আগস্ট পর্যন্ত চলমান থাকে। ১৮৭০ থেকে ৮০ দশকের সময় পৃথিবীতে মোট হীরার ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ হীরা উত্তোলিত হতো এই খনি থেকে।
মানুষের তৈরি সবচেয়ে বিশাল গর্ত এটি। হীরা তুলতে গিয়ে ৪৩ বছরে ৫০ হাজার খনি শ্রমিক মিলে যে গর্তটা খুঁড়েছেন, সেটি এখন পৃথিবীর বৃহত্তম মনুষ্যসৃষ্ট গর্তগুলোর অন্যতম। বিগ হোলের এই শান্ত নীল জলরাশির নিচে এখনো সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে সীমাহীন। ৪২ একর জায়গাজুড়ে প্রায় ২১৫ মিটার (৭০৫ ফুট) গভীর এই খনি থেকে মোট হীরা উত্তোলন করা হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪ হাজার ৫৬৬ ক্যারেট বা ২ হাজার ৭২২ কিলোগ্রাম। তবে এসব হীরার দীপ্তি চোখকে শুধু ধাঁধিয়েই দেয় না, এর পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক বেদনারও গল্প। খনিতে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অগণিত শ্রমিক, স্বজনহারাদের অশ্রুতে ভেসেছে কিম্বার্লি।
'বিগ হোল'খ্যাত এই হীরক খনির গল্প ১০৪ বছরের পুরোনো। কিম্বার্লির এই বিশাল গর্ত আর হীরার কাহিনি আজও মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয় অসাধ্য সাধনের। মাটি থেকে শূন্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছোট ব্রিজের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিচের বিশাল গর্তের দিকে তাকালে একটা কথাই মনে হবে—মানুষের অসাধ্য আসলে কিছুই নেই।