যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশ

কামাল উদ্দিন মজুমদার

মতামত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আধিপত্যের অবস্থানে উঠে আসে। পরবর্তীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তার একচেটিয়া প্রাধান্যকে

2023-01-11T19:01:33+00:00
2023-01-11T19:01:33+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশ
কামাল উদ্দিন মজুমদার
প্রকাশ: বুধবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৩, ৭:০১ পিএম   (ভিজিট : ৫৮৬)
X

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আধিপত্যের অবস্থানে উঠে আসে। পরবর্তীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তার একচেটিয়া প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করে যা কূটনীতি বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নায়ুযুদ্ধ হিসেবে পরিচিতি পায়। নব্বই দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই দ্বৈরথ কার্যত শেষ হলেও ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিশ্বরাজনীতিতে ধীরে ধীরে স্নায়ুযুদ্ধ পরিস্থিতির লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করলে পশ্চিমাদের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার শীতল যুদ্ধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ মূলত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এবং চীনসহ কয়েকটি দেশ রাশিয়াকে প্রক্সি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারের জন্য দুটি শক্তি ব্লকের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হচ্ছে। তার একটি অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে বাংলাদেশে রুশ ও মার্কিন দূতাবাসের টুইটার দ্বন্দ্ব। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও মানবাধিকার ইস্যুগুলোর মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে দুইদেশ পাল্টাপাল্টি মন্তব্য করে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

ঘটনার শুরু ২০১২ সালের নিখোঁজ হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বাসায় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের মিটিং এবং সেখানে সৃষ্ট অপ্রীতিকর পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পূর্ব নির্ধারিত এই সভায় ‘মায়ের কান্না’ নামে একটি সংগঠনের সদস্যরা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক তদন্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা কামনা করে একটি স্মারকলিপি দেয়ার চেষ্টা করে। এমন পরিস্থিতিতে পিটার হাস নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সভা ছেড়ে চলে যান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি অবগত করেন। পরদিন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পিটার হাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ঘটনার সূত্রপাত এখান থেকে। 

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মার্কিন রাষ্ট্রদূতের শাহীনবগে নিখোঁজ বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকের পরিবারের সাথে দেখা করতে যাওয়াকে ভিয়েনা কনভেনশনে ও জাতিসংঘ সনদের ২(৭) অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন এবং বালাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ বলে বর্ণনা করেন। এরই মধ্যে ঢাকার রুশ দূতাবাস এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা আলাদাভাবে টুইট ও বিবৃতির মাধ্যমে বলে যে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই ধরনের পদক্ষেপগুলো সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে যা অগ্রহণযোগ্য। এর উত্তরে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই একটি টুইট করে জানতে চায় ইউক্রেন রাশিয়ার হস্তক্ষেপ না করার নীতির মধ্যে আছে কিনা! রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের শাহীনবাগ সফর এবং নির্বাচন ও মানবাধিকার বিষয়ে মন্তব্যের রুশ বিরোধিতা ও বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান প্রায় অভিন্ন। এটি স্বাভাবিকভাবেই এই ধারণা দিতে পারে যে, বাংলাদেশ পুরোপুরি রাশিয়াপন্থি হয়ে গেছে কিংবা ঢাকার অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে দেশটি রাশিয়ার সাথে জোট বেঁধেছে। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির এমন সরলীকরণ বেশ কিছু বাস্তবিক কারণে সমর্থনযোগ্য নয়। দৃশ্যত ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মার্কিন অনধিকার চর্চার বিরুদ্ধে রাশিয়া পূর্বে কখনোই এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি; এমনকি কোনো বিবৃতিও নয়। কিন্তু এই প্রথম আমরা ঢাকার বিষয়ে মস্কোর আকস্মিক কিন্তু স্বতঃফূর্ত  প্রতিক্রিয়া লক্ষ করলাম। মূলত এটি আগা-গোড়াই দুই বিশ্ব নেতৃত্বের চলমান দ্বন্দ্বের ফল। বাংলাদেশের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের অস্থিতিশীল দৃশ্যপটে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে।

বিশ্বরাজনীতিতে সাম্প্রতিক প্রবণতা থেকে এটি স্পষ্ট যে, ন্যূনতম বৈরী দেশগুলোকেও নিজের প্রভাব বলয়ে আনার জন্য গণতন্ত্র, নির্বাচন, সুশাসন বা মানবাধিকারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়াও বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। এ কারণেই রাশিয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে।  রাশিয়া বাংলাদেশের স্বার্থে এই ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিচ্ছে এই ধারণা যুক্তিসংগত নয়। যদি তাই হতো প্রথম থেকেই ঢাকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতো রাশিয়া। সবচেয়ে বড় কথা, সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে বাংলাদেশ রাশিয়াকে পাশে পেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হল রাশিয়া এই ইস্যুতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মিয়ানমারকে সহায়তা দিয়ে আসছে।  প্রকৃতপক্ষে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে এবং এসব ইস্যুতে নিজস্ব স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থান নেয়। যার মধ্যে কোনোটা রাশিয়ার, আবার কোনোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে-বিপক্ষে যেতে পারে। 

বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচিত পরাশক্তিধর দেশগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজেকে না জড়ানো। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো দুই পরাশক্তি যখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে পরস্পর বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে তা কোনোভাবেই দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। বাংলাদেশের মাটিতে রুশ-মার্কিন দ্বন্দ্ব ঢাকাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার গুটিতে পরিণত করতে পারে। তাই, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি শক্তির মাথা ঘামানোকে সতর্ক অবস্থান থেকে দেখা উচিত। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই লাভজনক। ওয়াশিংটন ও ঢাকার মধ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ব্যাপক সহযোগিতা রয়েছে। তাছাড়া বাণিজ্য, শিক্ষা, ভ্রমণ, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাপান। 

অন্যদিকে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই রাশিয়াও বাংলাদেশের অন্যতম বন্ধু রাষ্ট্র। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ বিরোধী অপতৎপরতাকে রোধ করেছিল। বর্তমানেও বিনিয়োগ ও বানিজ্যে এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। দেশের বৃহত্তম মেগাপ্রজেক্ট রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়ার অর্থেই নির্মিত হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়কেই প্রয়োজন বাংলাদেশের। আবার বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ারও উদ্বিগ্ন হবার কারণ নেই; কারণ বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নীতি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। তিক্ততা এড়াতে বাংলাদেশের উচিত বর্তমান ক্ষমতার লড়াইয়ে এমন কোনো অবস্থান না নেওয়া যাতে সম্পর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও অবিশ্বাস তৈরি হয়।  বাংলাদেশ অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছে অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে কোনো দেশের হস্তক্ষেপ চায় না।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

বাবু/জেএম






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy