
X
আব্বা আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন এক সপ্তাহ হয়ে গেল। প্রতিটি মানুষের মৃশংতর মধ্যদিয়ে জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ, চাওয়া-পাওয়া, মান-অভিমান তথা পার্থিব জগতের সবকিছুরই সমাপ্তি হয়। আমার আব্বাও শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের হাজারো কষ্ট, অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও মনোযাতনার পরিসমাপ্তি করে চিরসুখের আবাসে ফিরে গেছেন। সব মানুষ মরে যায়, কিন্তু সব মানুষ ঝরে যায় না। উত্তম মানুষের মৃত্যু নেই, তাঁদের বাহ্যিক উপস্থিতি শূন্য হয় মাত্র। তাঁরা স্বীয় কৃতকর্মের মধ্যদিয়ে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকেন মানুষের অন্তরে। মৃত্যুর পর নেক-আমল করার সমস্ত পথ বন্ধ হলেও জীবদ্দশায় ভালো কাজের হাদিয়াস্বরূপ মানুষের দোয়া পৌঁছাতে থাকে আত্মার উদ্দেশ্যে। আমি বিশ্বাস করি, আমার আব্বা এমনই একজন উত্তম মানুষ ছিলেন।
এই মুহূর্তে আব্বার অনেক স্মৃতিই মনে পড়ছে। এটা ঠিক যে, কোনো সন্তানই একজীবনে বাবার স্মৃতি স্মরণ করে শেষ করতে পারবে না। পৃথিবীর কোনো সন্তানই শোধ করতে পারবে না বাবা-মায়ের ঋণ। এই লেখাটি যখন লিখছি, আবেগে নিজেকে সংবরণ করতে পারিনি। চোখ ভিজে বুকপর্যন্ত নেমে গেছে অশ্রুর ফোঁটা। একটা স্মৃতি এসে আরেকটা স্মৃতিকে হারিয়ে দিচ্ছে। যতটা দিন যাচ্ছে, নিজের মধ্যে ততই অপরাধবোধ কাজ করছে; হয়তো সন্তান হিসেবে আব্বার জন্য কিছুই করতে পারিনি। নিজের চোখে দেখেছি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, উদ্যমী, সাহসী একজন মানুষ কীভাবে অবুঝ শিশুর মতো হয়ে গেছেন। নিজের চোখে দেখে সহ্য করতে হয়েছে যে, কীভাবে একটা মানুষকে রোগ-বিছানায় শুয়ে বার্ধক্যযন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে। সর্বোপরি সমস্ত চেষ্টা-তদবীর, ওষুধ-সেবা উপেক্ষা করে একটা জীবন্ত শরীর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছেন।
আমার আব্বা সাধারণ কোনো মানুষ ছিলেন না। মানুষের কাছে তিনি 'গরীবের ডাক্তার' নামে পরিচিত ছিলেন। আমার আব্বা ডা. আব্দুল কাইয়ুম ইবনে হোসাইন স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী পৌরসভার আরামনগর বাজার মহিলা কলেজ রোডে আব্বার প্রতিষ্ঠিত ‘আল-আমিন হোমিও হল’ নামে একটি হোমিওপ্যাথিক ফার্মেসি রয়েছে। নিজের এলাকার বাইরেও পার্শ্ববর্তী সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুরসহ কয়েকটি উপজেলা, সারিয়াকান্দিসহ বগুড়া জেলার কয়েকটি উপজেলা, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী, মধুপুর, ভূঞাপুর, গোপালপুর এবং ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুরের বিভিন্নস্থানের দূরদূরান্তের মানুষ আব্বার কাছে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিয়েছেন। এতদঞ্চলের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে প্রবীণ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক।
চিকিৎসাকে তিনি শুধুমাত্র পেশা হিসেবে নেননি, এটা ছিল তাঁর কাছে সেবা। গলায় মাছের কাটা ফোঁটা, আঘাত-ব্যথা, রক্তপাত, চোখে ময়লা প্রবেশ ইত্যাদি ছোটখাট অনেক রোগের ওষুধ দিয়ে আব্বা টাকা নিতেন না। মধ্যরাতে প্রায়ই আমাদের ঘুম ভেঙে যেতো এলাকার রোগীদের ডাকে। কারও পেটের ব্যথা, কারও স্ত্রীর প্রসববেদনা, কারও পাতলা পায়খানা হলেই আব্বার কাছে রাত-বিরাতে ছুটে আসতেন মানুষ। কখনো কেউ দশ-বিশ টাকা নিয়ে আসতেন, অধিকাংশ সময়ই মানুষ এসে বলতেন যে, টাকা আনতে পারেননি। তবুও আব্বাকে কখনো মন খারাপ করতে দেখিনি। বরং অনেকসময় ওষুধ দেওয়ার জন্য আমাকে কিংবা বোনদের যখন আব্বা ডাক দিতেন, কাঁচা ঘুম ভেঙে ফ্রি বা বাকিতে ওষুধ দিতে হতো বলে রাগ করতাম। আব্বা বলতেন, ‘গরীব লোকজনই তো আমার কাছে আসবে, রাগ করো না বাবা। এর প্রতিদান আল্লাহ্ দিবে’। আমি বিশ্বাস করি, অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা আব্বাকে এর প্রতিদান দেবেন।
সততা এবং ধৈর্যের মাধ্যমে জীবনযাপন করেও বর্তমান যুগে স্বল্পআয়ের মানুষ যে সংসারে ঘানি টানতে পারেন; আব্বা তার অনন্য দৃষ্টান্ত। শুধুমাত্র ধৈর্য এবং সৃষ্টিকর্তার ওপর অগাধ আস্থাই তাঁর সততার মূল শক্তি ছিল। আব্বার তিন ছেলে ও সাত মেয়ের বড় সংসার যে কীভাবে তিনি চালাতেন শুধু এই হোমিওপ্যাথিক পেশার আয়ে, তা অনেকের কাছে কল্পনারও বাইরে। সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিতও করেছেন। বর্তমানে যেখানে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ আয় এবং বৈধ-অবৈধ নানা উপায়েও পরিবারগুলো সংসার চালাতে হিমশিম খায়, সেখানে আমাদের পরিবার ছিল ব্যতিক্রম। আমরা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাইনি ঠিক, কিন্তু অভাবের তাড়নায় কারও কাছে হাত পাততে হবে কিংবা কোনো প্রয়োজন পূরণ করতে না পারার হতাশায় ভুগতে হবে; এমনটাও কখনও হতে দেননি আব্বা। কোন প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব কতটুকু এবং কোনটা আগে, কোনটা পরে নিলেও চলবে এসব শিক্ষা দিয়েছেন শৈশব থেকে। যা উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর জন্যও অত্যাবশ্যক।
আমার দাদা মরহুম হোসাইন মণ্ডল ছিলেন ধনাঢ্য কৃষক। তাঁর একরের পর একর জমি ছিল। সর্বনাশা যমুনার করাল গ্রাসে একসময় দাদার ভিটেমাটিসহ অধিকাংশ জমি হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে চর জাগলে কিছু জমি আমার বাপ-চাচারা ফিরে পান। তবে এখনও সেগুলো প্রতিবেশি ও আত্মীয়রা বর্গা চাষাবাদ করছেন। নদীতীরবর্তী আমার আব্বার জমিজমাও বর্গা দেয়া। পারিবারিক অস্বচ্ছতা সঙ্গী থাকা সত্ত্বেও বর্গা চাষিদের প্রতি আমার আব্বা দাবিদাওয়া করতেন না। তাঁরা যখন যতটুকু সুযোগ পেতেন, কিছু ফসল দিতেন। আব্বা বলতেন, ‘আল্লাহ্ তো আমাকে চালাচ্ছেন, ওরা চরের জমি আবাদ করে কতটুকুই বা পায়, আর কী-ই বা দিবে? যা দেয় দিক, কিছু বলার দরকার নাই।’ অবশ্য আব্বার এসব আচরণ আমাদের কাছে কখনো কখনো খামখেয়ালি মনে হতো। এখন বুঝতে পারছি যে, তিনিই সঠিক ছিলেন, তাঁর এমন মানসিকতার জন্যই মানুষের অন্তরে তিনি বেঁচে থাকবেন।
এই যুগে কথা দিয়ে কথা রক্ষা মানুষের বড় অভাব। আব্বা বলতেন, মুনাফিকের প্রধান আলামত কথার বরখেলাফ করা। আব্বাকে নিয়মিত একটা অটোরিকশা বাড়িতে আনা-নেওয়া করতো। কখনো সেই অটোরিকশার ড্রাইভার আসতে না পারলে, সময় অতিক্রম হওয়ার পরও তাঁর অপেক্ষা করতেন। অন্য কোনো ড্রাইভার এসে নিতে চাইলেও তিনি যেতেন না। বলতেন, ‘যদি সে আসে! তাহলে আমাকে না পেয়ে তো কষ্ট পাবে।’ এসব কাজের জন্য আব্বার অনেক রাত হয়ে যেতো, কখনো বৃষ্টিতে ভিজে বাড়িতে ফিরতেন। এসব নিয়ে আমরা আব্বার সাথে অনেকসময় রাগারাগি করতাম। কিন্তু তিনি এসবে কোনো ভ্রুক্ষেপ করতেন না। আব্বা কারও কাছে কখনো ঋণী থাকতেন না, কেউ দু-চার টাকা পাওনা থাকলে পরিশোধ করার জন্য অস্থির হয়ে যেতেন। অথচ তাঁর মৃত্যুর পরও হাজার হাজার টাকা রোগীদের কাছে পাওনা রয়ে গেছে, সেসব নিয়ে তাঁকে কখনো আক্ষেপ করতে দেখিনি।
শয্যাশায়ী হওয়ার আগ পর্যন্ত আব্বাকে দেখেছি কঠোর পরিশ্রম করতে। খুব সকাল থেকে রাতপর্যন্ত তিনি কখনো খেয়ে কখনো না খেয়ে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। এরবাইরেও ইবাদত-বন্দেগি এবং সংসারের অন্যান্য কাজগুলোও তিনি নিজহাতে করতেন। ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ রাত সাড়ে ৮টায় আব্বা যখন মারা যান, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি বাজার করতেন নিজহাতে। আমি মাঝেমধ্যে রাগ করে বলতাম যে, ‘ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে, এই বয়সে আপনি হাট-বাজারে যান। আমি তো লজ্জা পাই যে, ছেলে হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি না।’ কথাগুলো শুনে তিনি হাসতেন। কখনো আমি বাজার করতে চাইলে বলতেন, ‘বাজার করতে শিখছো? তুমি পোলাপান মানুষ পারবা না।’ আসলে বাবা-মায়ের কাছে প্রতিটি সন্তান চিরদিনই ছোট।
বাবারা আজীবন কৃপণ হন। নিজের যত্ন, নিজের খাওয়া, নিজের স্বার্থ বাবারা সন্তান-সংসারের জন্য জলাঞ্জলি দেন। আমি ভাবতাম যে, আমার আব্বাই শুধু কৃপণ। আমি বোঝার বয়সে পৌঁছার পর থেকে আব্বার মৃত্যু পর্যন্ত কখনো দেখিনি তাঁকে নতুন কাপড় কিনতে। এমনকি ঈদ বা কোনো অনুষ্ঠানের জন্যও কিনতেন না। আমরা জোর করে যা কিনে দিতাম, তাও নিতে চাইতেন না। শৈশবে যখন দেখতাম আব্বা টাকা গুনার সময় এক টাকা, দুই টাকা বা পাঁচ টাকার নোটগুলোও হিসাব করছেন; তখন ভাবতাম এসব কী দরকার! ছোট নোটগুলো বাতিল করে দিলেই হয়! দিনেদিনে যত বড় হয়েছি, সংসারের দায়িত্ব যতটা নিতে শিখেছি; ততটাই আব্বার প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে, ততটাই বুঝতে পেরেছি যে, আব্বার এসব কাজের বিনিময়েই আমি আজ এতদূর আসতে পেরেছি।
আব্বাকে ঘর্মাক্ত হতে দেখেছি, কিন্তু চোখে অশ্রু দেখিনি। দেখেছি গভীর চিন্তায় মগ্ন হতে, কিন্তু কখনো হতাশ হননি। আব্বাকে হারানোর পর ঘরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আগে আব্বাকে দেখলে মনে শক্তি-সাহস পেতাম, এখন আব্বার ছবি দেখলে নিস্তেজ হয়ে যাই। আসলে বাবা মানেই বটবৃক্ষ, মাথার উপর ছায়া। হতাশায় সাহস, বিপদের সহায়। যার বাবা বেঁচে আছে, পুরো পৃথিবীর তার সাথে। বাবা না থাকলে সন্তান শুধু এতিম হয় না, পুরো পৃথিবীই তার বিপরীতে। সন্তানের সমস্ত সাফল্য যদি বাবা-মা নিজচোখে দেখতে পেতেন, তাহলে কতই না ভালো হতো। কিন্তু এটাই নিয়তি যে, সবাইকে একদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হবে। হয়তো জীবনে অনেককিছু হবো, ভালো কিছু অর্জন করবো; কিন্তু আব্বাকে দেখাতে পারবো না। শুধু একটাই প্রত্যাশা, জান্নাতে দেখা দিন আমাদের, ওপারে ভালো থাকুন আব্বা। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবা-মা। রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
বাবু/এসআর