সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার দাপ্তরিক কাজ বাসভবন থেকেই চালিয়ে যাচ্ছেন। এটা অনেক সময় স্বাভাবিক হলেও বর্তমানে সংশ্লিষ্ট উপাচার্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কারণ, নিয়োগ প্রার্থীর সঙ্গে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের আলাপনের ফাঁস হওয়া অডিও গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় এই অবস্থা তৈরি হচ্ছে। অনেক উপাচার্য অসুস্থ বা অন্যান্য ব্যক্তিগত কারণে বাংলোয় বসে অফিস করতে পারেন। অডিও ফাঁস হওয়ায় উপাচার্যসহ আমারা এখন বিব্রত। উপাচার্যদের কর্মকাণ্ডে আজ জাতি হতাশ। উপাচার্যদের নিকট জাতির বা সমাজের অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু এই প্রত্যাশা অনেক ক্ষেত্রে ‘গুঁড়ে বালি’।
অতীতে অনেক উপাচার্যকে দেখেছি আন্দোলনের মুখে বাসায় বসে অফিস করছেন। এমনকি শেষ কর্মদিবসে অফিসে না এসে তাঁকে উপাচার্যের পদ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। যা কোনভাবেই কাম্য নয়। উপাচার্য যদি যোগদান এবং বিদায়ের সময় সমানভাবে পুষ্পমাল্য গ্রহণ করেন, তাহলে উপাচার্যকে সফল বলা যেতে পারে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অডিও ক্লিপ মাইকে বাজিয়ে বিক্ষোভ করেছেন স্থায়ী চাকরিপ্রত্যাশী কিছু লোক। উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে ব্যানার ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। এ সময় আন্দোলনকারীরা উপাচার্যকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকেন। তালাবদ্ধ রয়েছে তার কার্যালয়। কেন উপাচার্যের অফিস তালাবদ্ধ থাকবে ? বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এড়াতে ক্যাম্পাসে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। ক্যাম্পাসে পুলিশ, ভিসির অফিসে তালা এসব সংস্কৃতি কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। উন্নত দেশ চীন, জাপান, যুক্তরাজ্যে এবং অস্ট্রেলিয়াতে এসব অপকর্ম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাবাও যায় না। রাজনীতির কারণে একদিনও ঐসব দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ থাকে না। আর আমাদের দেশে ছাত্র রাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম, ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নেহাত কম নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুর ভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে।
সম্প্রতি তিনটি ফেসবুক আইডি থেকে নিয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে উপাচার্যের বিভিন্ন আলাপনের অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়। যাতে চাকরির প্রশ্ন ফাঁস এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে উপাচার্যকে কথা বলতে শোনা যায়। কেন উপাচার্য এসব কথাবার্তা বলবেন বা কর্মকাণ্ড করবেন। যা দিনদিন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করে যাচ্ছেন কিছু কিছু উপাচার্যরা। কিছু উপাচার্যের কারণে অন্যান্য উপাচার্যের মান-সম্মান কমে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে কোথায় যাচ্ছে আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারের উচিত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া। যদি তদন্তে ঘটনা সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে উপাচার্যকে অপসারণ করা জরুরী। উপাচার্য নিয়োগ পাওয়ার পর তাঁর কার্যক্রম সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক মনিটরিং করা উচিত। অন্যথায়,উপাচার্যরা যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছেন। উপাচার্যরা মনমত একটি বলায় তৈরি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয় চলবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী। যখন এই আইন কার্যকরে ব্যতায় হয়, তখনই শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। পরে এটা বিশাল রূপ ধারণ করে।
উপাচার্য হবেন সবার এবং সকলের যৌক্তিক মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করবেন। এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সরকারের বহুমুখী উন্নয়ন আছে, কিন্তু কিছু উপাচার্যের কর্মকাণ্ডে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। যা থেকে সরকারকে উপাচার্য নিয়োগে আরও সতর্ক হতে হবে।
উপাচার্যরা যেন বিশ্ববিদ্যালয়কে সুশাসনের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলক। এটা আমাদের কামনা। যার সার্বিক প্রভাব পড়বে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে। যার সুফল পাবে সাধারণ জনগণ। উপাচার্যের পদটি অনেক সম্মানের,আমাদের শিক্ষক সমাজকে এই সম্মান ধরে রাখতে হবে। উপাচার্যদের অনেক সময় কিছু করার থাকে না, কারণ নানাবিধ প্রেশার গ্রুপ ভিন্ন ধরনের ভিন্ন তদবির নিয়ে আসেন। তদবির সামলাতে উপাচার্যরা অনেক সময় বেসামাল হয়ে পড়ে। কিন্তু কেন এত তদবির আসে, সেখানে কাজ করতে হবে। যাতে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারেন। উপাচার্যের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এই জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে উপাচার্যের কাজের বার্ষিক মূল্যায়ন করতে হবে। সাধারণত উপাচার্যের নিয়োগ হয় চার বছরের জন্য। কিন্তু তাঁর চার বছর যদি বার্ষিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে চলমান হত, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন আরও বেশি গতিশীল করা সম্ভব। যারা আজ উপাচার্যের পদটিকে কলঙ্কিত করে যাচ্ছেন, তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা একান্ত প্রয়োজন।
অনেক জায়গায় উপাচার্যরা ক্যাম্পাসে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উপাচার্যের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ কোন প্রতিবাদ করলে তাঁকে নানাভাবে হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়। এজন্য ভয়তে কেউ কোন প্রতিবাদ করে না। শিক্ষকরা একটু বৈধ ও অবৈধ সুবিধা ভোগের জন্য উপাচার্যের অন্যায় কাজকে অন্ধভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন বলে সমাজে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা বিরাজ করে। উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে সরকারের আরও সতর্ক হতে হবে। নিয়োগ পরবর্তী কোন দুর্নীতি বা অন্যায় করলে তাঁকে উপাচার্যের পদ থেকে অপসারণ করার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে যদি উপাচার্যরা সচেতন বা সতর্ক হয়। অনেকেই মনে করে উপাচার্য নিয়োগেই গলদ। শুনেছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনেক গুণী শিক্ষককে ডেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বানাতেন। তখন এই ধরণের কোন অপকর্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ছিল না। কিন্তু এখন দেখা যায় অনেকেই লবিংয়ের কারণে উপাচার্য হয়ে যান বলে সমাজে অভিযোগ রয়েছে। উপাচার্য নিয়োগে তদবির বন্ধ করতে হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
-বাবু/এ.এস