ব্রিটিশের শাসন ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

ইলিয়াজ হোসেন রানা

মতামত

১৭৬৫ সালে আগস্ট মাসে লর্ড ক্লাইভ এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধির দ্বারা বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে শান্তি স্থাপন করেন।

2023-03-20T14:14:15+00:00
2023-03-21T15:15:30+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
ব্রিটিশের শাসন ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর
ইলিয়াজ হোসেন রানা
প্রকাশ: সোমবার, ২০ মার্চ, ২০২৩, ২:১৪ পিএম  আপডেট: ২১.০৩.২০২৩ ৩:১৫ পিএম  (ভিজিট : ৪৩০)
X


১৭৬৫ সালে আগস্ট মাসে লর্ড ক্লাইভ এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধির দ্বারা বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে শান্তি স্থাপন করেন। এই সন্ধির দ্বারা বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের মর্যাদা ও ক্ষমতা কোম্পানি স্বীকার করেন, কোরা ও এলাহাবাদ প্রদেশ বাদশাহকে কোম্পানি ছেড়ে দেয়, বাদশাহ বিনিময়ে কোম্পানিকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্বের স্বত্ব স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেন, এজন্য কোম্পানি বাদশাহকে বছরে ২৬ লক্ষ টাকা দিতে অঙ্গীকার করে এবং বাংলার নবাবকে নিজামতের খরচার দরুন বছরে ৫৩ লক্ষ টাকা টাকা দিতে স্বীকৃতি দেয়। কোম্পানি বাংলার রাজস্ব বা দেওয়ানি পেলেও প্রত্যক্ষভাবে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব গ্রহণ করা কোম্পানির পক্ষে আপাতত সম্ভব না। কারণ কোম্পানির এই কাজের জন্য উপযুক্ত কর্মচারী, লোকবল এবং রাজস্ব আদায়ের জন্যে প্রয়োজনীয় রের্কড বা কাগজপত্র ছিল না।

সুতরাং ক্লাইভ বাংলার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব নায়েব রেজা খানকে এবং বিহারে সিতাব রায়কে দান করেন। রেজা খান যাতে ক্ষমতালোভী সৈরাচারী হতে না পারে এজন্য বাংলার দূর্লভ রায় ও জগৎ শেঠকে এবং তার সহকারি হিসাবে নিয়োগ করেন। এভাবে সকল বন্দোবস্ত করে ক্লাইভ বাংলার দেওয়ানি ও দ্বৈতশাসন চালু করেন। কোম্পানির দিক থেকে বাংলার দিওয়ানি লাভ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ঐতিহাসিক পাসিভ্যাল স্পিয়ারের মতে, বাংলার কোম্পানির আধিপত্য রক্ষার জন্য এবং দিল্লির বাদশাহের আক্রমণের ভয়ে কোম্পানিকে স্থির, ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতে হয়নি। বাংলায় ঘন ঘন নবাব পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে যায়। পি জে মার্শাল বলেন, পিছন থেকে দেখলে ১৭৬৫ সালে কোম্পানির দেওয়ানি লাভকে বাংলায় মুঘলযুগ ও ব্রিটিশ যুগের বিভাজিকা চিহ্ন বলে মনে হবে। দেওয়ানি লাভের ফলে প্রত্যক্ষভাবে নবাবের শাসন বজায় থাকলেও, কার্যত পরোক্ষভাবে প্রকৃত ক্ষমতা রইলো ইংরেজদের হাতে। ক্লাইভ ইচ্ছা করলে নবাবকে সরিয়ে সরাসরি ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন কিন্তু সম্ভবত তিনি মনে করেন যে, এইরূপ করলে স্বল্প সংখ্যক বিদেশি বণিকের আধিপত্যে দেশের লোকেরা অসন্তষ্ট হয়ে নানান বিরোধ ও গোলাগোল সৃষ্টি করবে এবং বিদেশি অন্যান্য ইউরোপিয় বণিক সম্প্রদায়ও তাদের বিরুদ্ধে বাংলার অভিবাসীদের পক্ষে সমর্থন করবে।

দেওয়ানি লাভের ফলে কোম্পানি ও তার কর্মচারিরা বাংলায় শুল্কহীন অবাধ বাণিজ্যকরার সুযোগ পায়। কোম্পানি বাংলায় রাজস্বের দাবি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাংলাকে কামধেনু মনে করে কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা নির্মমভাবে দোহন করতে থাকে। কোম্পানির অর্থের লালসা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। ১৭৬৫ সালের আগে নবাবেরা এই লালসাকে অনেক পরিমাণে সংযত রাখতেন। এখন নবাব ঠুঁঠো জগন্নাথে পরিণত হওয়ায় কোম্পানিকে নিরস্ত্র করার কোনো উপায় ছিল না। কোম্পানির সকল কর্মচারিরা অসদুপায়ে রাজস্ব আদায় এবং রাজস্ব আত্মসাৎ করলেও কোম্পানির কর্তা ব্যক্তিরা চোখ বুঝে থাকতেন। ডা. এন কে সিংহ বলেন, আলীবর্দীর আমলে পূর্ণিয়া থেকে রাজস্ব আদায় হতো ৪ লক্ষ টাকা, এখন ঐ জেলায় থেকে সুচেৎ রাম ২৫ লক্ষ টাকা আদায় করে দিলেও কোম্পানি সন্তুষ্ট হয়নি।

দিনাজপুর থেকে নবাব আলীবর্দীর আমলে আদায় হতো ১২ লক্ষ টাকা, এখন দেওয়ানির পর ১৭ লক্ষ আদায় করা হয় তবুও কোম্পানির কর্তারা যথেষ্ট আদায় হচ্ছে না বলে মনে করেন। মুহাম্মদ রেজা খান এরূপ অবস্থায় কোম্পানিকে সর্তক করে বলেন, হংসীকে খেতে না দিয়ে তাকে স্বর্ণ ডিম প্রসব করতে বাধ্য করলে, হংসীর প্রাণবায়ু নির্গত হবে। দেওয়ানি লাভের পরে বাংলা থেকে ব্যাপকভাবে সম্পদের নির্গমন হতে থাকে।

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, বাংলা থেকে প্রেরিত এই সম্পদের সাহায্যে ইংল্যান্ডে শিল্পবিল্পবের মূলধনের সরবরাহ হয়। ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি ইংল্যান্ডে শিল্প বিল্পবের উড্ডয়ন কাল ১৭৬০-১৭৮০ খ্রি. ধার্য করেন। ১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি প্রকৃত অর্থে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্র রচনা করে। জর্জ কর্ণওয়াল ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের সম্মুখে সাক্ষাৎকার দানের সময় বলেন, আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে একথা জানাতে চাই যে, ১৭৬৫-১৭৮৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অপেক্ষা বেশি দুর্নীতিপূর্ণ, বেশি ভণ্ড, বেশি অত্যাচারী ও লুণ্ঠন প্রবৃত্তির তথাকথিত সভ্য সরকার পৃথিবীর বুকে আর দেখা যায়নি।

১৭৬৭ সালে লর্ড ক্লাইভ ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ক্লাইভের পরে প্রথমে ভেরেলস্ট ও পরে কার্টিয়ার ১৭৬৯ সালে বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির গর্ভনর হলেন। এই সময়ে ইংরেজ কর্মচারিরা নানা অসৎ উপায়ে অবাধ লুণ্ঠন ও শুল্কহীনঅবাধ বাণিজ্য গ্রাম বাংলাকে দরিদ্রের পাঁকে ডুবিয়ে দেয়। কোম্পানি ও তার কর্মচারিরা জবরদস্তি করে তাঁতী, শিল্প, কারিগর ও কৃষকদের তাদের উৎপন্ন দ্রব্য ন্যায্য মূল্য অপেক্ষা কমদামে বিক্রি করতে বাধ্য করে। কোম্পানির গোমস্তা ও পেয়াদাদের নির্যাতনের ফলে ঢাকা, সোনারগাঁ, মুর্শিদাবাদ ২৪ পরগনায় তাঁতীরা কোম্পানির কর্মচারিদের কাছে কমদামে কাপড় বিক্রি করতে বাধ্য করে। ১৭৫৭ খ্রি. এক সের আফিম উৎপাদনে জন্যে পারিশ্রমিক ছিল ২ টাকা, ১৭৭০ খ্রি. তা দাঁড়ায় ১ টাকা ৯ আনায়। চাউলের দাম বাড়তে থাকায় কারিগর, শিল্পী শ্রেণি যারা তাদের মাল বিক্রি করে চাউল খরিদ করতো, তাদের জীবনধারণ দুস্কর হয়। ১৭৬৯-৭০ সালে মোটা চাউল ছিল টাকায় ছিল ১৬ সের, গম টাকায় ৩২সের, তেল টাকায় ৬সের ১পোয়া। সেই তুলনায় মজুরির হার কম ছিল। এজন্য খেটে খাওয়া মানুষের ভোগান্তির সীমা ছিল না। এই পরিস্থিতিতে অনাবৃষ্টিজনিত অজন্মার ধাক্কা বাঙালিকে দুর্ভিক্ষের গহ্বরে ফেলে দেয়। বাজারে চাউলের সরবরাহ টান পড়ায় কোম্পানির কর্মচারিরা সস্তা দরে চাউল কিনে মজুত করে উচু খুচরা দামে বিক্রি করে মুনাফা লুঠতে থাকে। পরের বছর আবার অনাবৃষ্টির দরুণ দুর্ভিক্ষের আবাস পাওয়া যায়। কোম্পানি তার সেনাদের খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য বাজারে যা চাউল পাওয়া যায় তা সবাই কিনে নিয়ে মজুত করে। বাংলায় অনাবৃষ্টি, খাদ্য সংকট প্রবল আকার ধারণ করে তখন কোম্পানি মাত্র ৫ টাকা এবং পরের বছর শতকরা ১০ টাকা ছাড় দিয়ে বাকী রাজস্ব বলপূর্বক আদায় করে।

হান্টারের বিররণ থেকে জানা যায় পরপর দু’বছর অনাবৃষ্টির পর, কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের জুলুমে সর্বস্বান্ত হয়ে কৃষক তার গরু, লাঙল, বীজধান খেয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত পুত্র-কন্যাকে বিক্রি করতে আরম্ভ করে। গাছের পাতা, ঘাস প্রভৃতিও তারা খেতে আরম্ভ করে। একই সঙ্গে আরম্ভ হয় গুটি বসন্তের মহামারি। সিয়ার-উল-মুতাকখিরিনের মতে, তিনমাস ব্যাপী বসন্তের প্রকোপ, খাদ্যভাবে শীর্ণ লোকেরা দলে দলে মারা যায়। অন্নহীন কঙ্কালসার মৃত্যুদেহগুলো রাস্তাঘাটে পড়ে থাকে। মাংসভোজী পশু, পাখিদেরও মানুষ্য মাংসে অরুচি দেখা দেয়। দলে দলে লোক  খাদ্যের আশায় কলিকাতা, ঢাকা, মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে আসে। গ্রাম-বাংলায় যখন এই মৃত্যুর মিছিল চলছিলো, তখন কলিকাতায় শেতাঙ্গ সমাজে আমোদ-প্রমোদ, বিলাসিতা, নাচ, সুরাপানে আনন্দ-উচ্ছল জীবনযাপনে রত ছিল।

সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলা আকস্মাৎ একটি মহাশ্মশানে পরিণত হয়। জেমস মিল ও ওয়ারেন হেস্টিংসের মতে বাংলা-বিহারের ৩ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি মানুষ মারা যায়। হান্টারের মতে, বাংলা-বিহারে প্রতি ১৬ জনে ১ জন মারা যায়। স্যার জন শোর ছিলেন এই দুর্ভিক্ষের প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর মতে, ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলার সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো ছিল নদীয়া, রাজশাহি, বীরভূম, বর্ধমান, যশোহর, মালদাহ ও ২৪ পরগণা এবং বিহারের পূর্ণিয়া। তিনি বলেন, ৩ কোটি মানুষের জন্য মাত্র ৯০ হাজার টাকা খরচ করা হয়। বহু সম্ভ্রান্ত পরিবার ও সাধারণ গৃহস্থ সর্বস্বান্ত হয়েছিল। প্রায় বিশ-ত্রিশ বৎসর বাংলাদেশে এই দুর্ভিক্ষের চিহ্ন লোপ পায়নি। 

লেখক : শিক্ষক, সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা

-বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy