
X
সড়কপথে যখন চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়, তখন যানবাহনগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না এমন অবস্থাকে বলা হয় যানজট।
আমাদের দেশে যানজট একটি নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা। বিশেষ করে ঢাকা শহরের যানজট সমস্যা বর্তমানে একটা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। দিন যতই যাচ্ছে, ততই যেন যানজট বেড়ে চলেছে। ফলে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত কিংবা কর্মক্ষেত্র যেকোনো জায়গাতে সঠিক বা স্বল্প সময়ে পৌঁছানো সত্যিই অবিশ্বাস্য ও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, প্রচণ্ড গরমে অস্বস্তিকর অবস্থা তো আছেই! ঢাকা শহরে এমন কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে যানজট নেই। সব রাস্তার একই চিত্র। এই যানজট যে কত কষ্টের, কত ভোগান্তির, তা একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না। যারা প্রতিদিন গণপরিবহনে যাতায়াত করেন, অফিসের কাজে কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে বের হন, তারা সহজেই বুঝতে পারেন যানজটের দুর্ভোগ কত অসহনীয়! একটি ছোট উদাহরণ দিই। প্রতিদিন বাসে করে আমাকে সাভার থেকে মিরপুর ডিওএইচএস আসতে হয়। শুধুমাত্র গাবতলী থেকে মাজার রোড কিংবা টেকনিক্যাল যেতে যেখানে এক থেকে দু’মিনিট সময় লাগে, সেখানে বেশিরভাগ দিনই সময় লাগে ২০ থেকে ২৫ মিনিট এবং মাঝে মাঝে আরও বেশি।
অন্যদিকে, ফেরার পথে টেকনিক্যাল সিগন্যালে গাড়িতে বসে থাকতে হয় ২০ থেকে ২৫ মিনিট। অন্যদিকের যানজটের কথা না হয় বাদই দিলাম। যানজট এখন কঠিন এক সমস্যার বাস্তব রূপ। যেদিন ভিভিআইপি মুভমেন্ট থাকে, সেদিন তো কথাই নেই! দীর্ঘ সময়ের জন্য রাস্তায় চলাচল থাকে বন্ধ। ফলে এর জের চলতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যানজটের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। অনেকেই অতিষ্ঠ হয়ে গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা শুরু করেন সময় বাঁচানোর জন্য; তারপর অনেক দূর হেঁটে আবার অন্য কোনো গাড়িতে ওঠেন। এমন পরিস্থিতিতে নারী, শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থদের সীমাহীন ভোগান্তি সহজেই অনুমেয়।
গত ১১ এপ্রিল ২০২২ ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা)-এর আয়োজনে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপের বিষয়বস্তু ছিল ‘অসহনীয় যানজট : সমাধান কী’। অনুষ্ঠানে পরিবহন বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। সংলাপের সূত্রে জানা যায়, ঢাকা শহরে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার রাস্তা আছে, যার মধ্যে মাত্র আড়াই শতাংশ রাস্তা দিয়ে বাস চলাচল করে। যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ন, রাস্তার স্বল্পতা, ফুটপাত ও রাস্তা দখল, যত্রতত্র নিয়মবিহীন পার্কিং, ব্যক্তিগত গাড়ি বৃদ্ধি, গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা, ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে মেনে না চলা ইত্যাদি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এক হিসাবে জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে রাজধানী ঢাকাতে মোটর সাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় আট গুণ; সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ লাখ। একই সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৮০৯টি, যা ২০১০ সালে ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার। সবাই একমত হয়ে দাবি করেছেন, যানজট নিরসনে অবশ্যই যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্বব্যাংক ও বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) একটি তথ্যে জানা যায়, ২০০৭ সালে ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। কিন্তু এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। অর্থাৎ গত দেড় দশকে ঢাকায় যানবাহন চলাচলের গড় গতি কমে গেছে ঘণ্টায় প্রায় ১৬ কিলোমিটার। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, যানজটের কারণে ঢাকায় দৈনিক ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতির মূল্য বছরে প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে যানজটে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা ক্ষতি হয়েছিল। আর এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। হিসাবের তথ্যটি নিঃসন্দেহে ভেবে দেখার বিষয় বৈকি! আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এমন একটি কারণে এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির ব্যাপারটি অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে। রাষ্ট্রকে বলিষ্ঠ উদ্যোগ ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে যানজট নিরসনের ব্যাপারে, যাতে এ ক্ষতির হাত থেকে দেশকে সহজেই রক্ষা করা যায়।
সড়কের যানজট নিরসনে ট্রাফিক পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দায়িত্বহীনতার জন্যও যানজট দায়ী বলে মনে করেন অভিজ্ঞমহল। তাদের মতে, ঢাকায় যে পরিমাণ রাস্তা রয়েছে, তা দিয়ে যানজট সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে যেভাবেই হোক, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাস্তার পরিমাণ বাড়াতে হবে। যানজট নিরসনে বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ঠিক করার পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞমহল। গবেষণা প্রতিষ্ঠান নামবিও-র প্রকাশিত ‘বিশ্ব ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯’-এ প্রকাশিত এক সমীক্ষায় জানা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ যানজটের তালিকায় ঢাকার অবস্থান শীর্ষে। সর্বমোট ২০৭টি শহরের মধ্যে ঢাকার স্কোর ২৯৭ দশমিক ৭৬, যা ছিল সর্বোচ্চ স্কোর। তাদের জরিপে ঢাকা শুধু যানজটের জন্যই নয়, সময় অপচয় ও যান চলাচলের অযোগ্যতার জন্যও প্রথম ছিল ঢাকা।
যানজটের কারণে একদিকে যেমন যাত্রীদের চরম ভোগান্তি হচ্ছে, তেমনি তারা শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক সত্যি যে, অসুস্থ রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় এবং অনেক সময় রোগী মারাও যায়। যানজটের এ সমস্যা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। নগরীর লোকসংখ্যা বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যাও। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি সড়কের সংখ্যা ও পরিধি। জানা যায়, যেখানে একটি নগরীর মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ এলাকা সড়ক থাকা দরকার, সেখানে ঢাকায় রয়েছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ সড়ক।
যানজট নিরসনে অনেক কথা বলা হয়, বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও শোনা যায়। কিন্তু এ সমস্যার কোনো বাস্তব সমাধান হচ্ছে না। সরকার রাজধানীর যানজট নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। নির্মিত হচ্ছে বড় বড় ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল। আশা করা যায়, এসব প্রকল্প ঢাকাকে পুরোপুরি যানজটমুক্ত করতে না পারলেও সমস্যার অনেকাংশে লাঘব হবে। রাজধানী ঢাকার যানজট আজ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ অবস্থার দ্রুত সমাধান দরকার। অভিজ্ঞমহল বারবারই বলছেন ভুল পরিকল্পনার সঙ্গে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতিই রাজধানী ঢাকার এমন যানজটের জন্য দায়ী। আর তাই যানজটমুক্ত ঢাকা পেতে কার্যকরী ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে এবং সর্বোপরি সড়কে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, রাজধানীর যানজট কমাতে হলে সড়ক আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু তা কার্যক্ষেত্রে তেমনভাবে সফল হতে পারছে না। রাষ্ট্রকে, সরকারকে এবং বিভিন্ন মহলকে অবশ্যই এ যানজট নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। সর্বোপরি জনগণের ভোগান্তি এবং আর্থিক ক্ষতির কথা ভেবে বলিষ্ঠ উদ্যোগ গ্রহণ করে সমাধানের সঠিক পথ বের করতে হবে।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট
-বাবু/এ.এস