
X
জার্মানভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলে বাংলাদেশের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) সম্পর্কে একটি তথ্যচিত্র প্রচার করেছে। ডয়চে ভেলে-নেত্র নিউজের সাথে যৌথ অনুসন্ধানে তথ্যচিত্রটি প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটিতে র্যাবের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে অভিযোগ তোলা হয়। উচ্চপদস্থ রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে এই এলিট বাহিনীকে ব্যবহার করছেন এমন অভিযোগও তোলা হয়। দুই প্রাক্তন র্যাব কমান্ডার (যাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে নিরাপত্তাজনিত কারণে) এ বাহিনী কীভাবে হত্যা, নির্যাতন ও গুমের ঘটনা ঘটিয়েছে তা বিস্তারিত জানিয়েছেন। ডয়চে ভেলে এবং নেত্র নিউজ তাদের সাথে দেখা করেছে এবং তাদের আসল পরিচয় যাচাই করেছে। এদের তথ্যের ভিত্তিতেই মূলত এ প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে।
ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক লিখিত উত্তরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে নিজস্ব অনুসন্ধানের এ প্রতিবেদনটি অসঙ্গত এবং অভিযোগগুলো অসত্য। অভিযোগগুলো ‘ভিত্তিহীন ও অসত্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বলেছে ডয়চে ভেলে-নেত্র নিউজ যৌথভাবে প্রকাশিত তথ্যচিত্রের তথ্য মিথ্যা। এ প্রতিবেদনটির বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক বলেন, ডয়চে ভেলে ও নেত্র নিউজের পুরো ভিডিও ডকুমেন্টারি ভুয়া। এমন খবর আমরা সচরাচর দেখি না। এখানকার বেশিরভাগ তথ্যই পুরানো এবং সেকেলে।
২০০৪ সালে এর সূচনা থেকে অভিজাত বাহিনীটি একটি আইন-শৃঙ্খলার বজায় রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সন্ত্রাস দমন, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানে এ বাহিনীটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল এবং বর্তমানেও আছে। গত ১৯ বছরে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালনকালে ২৭ জন র্যাব কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। অভিযানে আহতও হয়েছেন অগণিত। র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ আবুল কালামও আতিয়া মহলে কুখ্যাত কাউন্টার টেরোরিজম অপারেশনের সময় প্রাণ উৎসর্গ করেন।
যুক্তরাষ্ট গত ১০ ডিসেম্বর ২০২১ সালে বাহিনীটির উপর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছিল যে স্থূল মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের উপর চাপ পড়ে। তারপরে একবছরেরও বেশি সময় সংস্থাটি কাজ করছে। বার্ষিকী উপলক্ষে এবং নিষেধাজ্ঞার পটভূমিতে র্যাবের কর্মক্ষমতা পুনর্বিবেচনা করা এবং বিগত বছরে এর সাফল্যের উপর ফোকাস করা মূল্যবান।
দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ইস্যুতে শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিকের সাম্প্রতিক বক্তব্য বাংলাদেশের মনোবলকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার রক্ষায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর কাছ থেকে এই স্বীকৃতি এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সম্প্রতি বিবৃতিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হ্রাসে র্যাবের ‘অভূতপূর্ব অগ্রগতি’র স্বীকার করেছে।
সম্প্রতি মার্কিন বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে বাংলাদেশে ২০২২ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, মতপ্রকাশ ও মিডিয়া দমন, সমাবেশে বলপ্রয়োগ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানে বাধা প্রদান ইত্যাদি যথারীতি অব্যাহত রয়েছে। তবে, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হ্রাস পেয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বাংলাদেশ তার ত্রুটিগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু ডয়চে ভেলে তাদের প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ করেনি। কিছু কুশীলবের স্বার্থের ভিত্তিতে ডয়চে ভেলে রিপোর্টটি খুবই পক্ষপাতদুষ্ট। ডয়চে ভেলে তাদের রিপোর্টে সামগ্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রতিবেদনটি করতে পারেনি।
তাসনিম খলিল নেত্র নিউজের সম্পাদক এবং একজন সুইডিশ প্রবাসী। কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক দলের ইন্ধন ও বিপুল অর্থ অর্জনের উচ্চাকাক্সক্ষায় তিনি দেশবিরোধী কার্মকাণ্ড চালাচ্ছে এবং কুশীলবদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে। আসলে এক ভয়ানক দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীর নাম তাসনিম খলিল। বিদেশে বসে পিনাকী চক্রবর্তীও এরকম দেশবিরোধী কাজ করছে এবং কশীলবদের কাছ থেকে অর্থ পাচ্ছে। তাসনিম খলিল পেশা বিদেশি গুপ্তচরদের কাছে জাতীয় স্বার্থের নথি বিক্রি করা। তার মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নেত্র নিউজ সুইডেন থেকে পরিচালিত হলেও তিনি বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। এসব গণমাধ্যম ও এগুলোর মূলহোতাদের উদ্দেশ্য বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা। এরা সবসময় জনগণকে বিভ্রান্ত কওে এবং সরকারবিরোধী মনোভাব জাগিয়ে তোলাই তাদের প্রধান কাজ।
অন্যদিকে, ডয়চে ভেলের রিপোর্টিং নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। এ জর্মান গণমাধ্যম পক্ষপাতদুষ্ট কভারেজের জন্য একাধিকবার অভিযুক্ত হয়েছে। এটি জার্মান সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত মিডিয়া এবং এটি স্পষ্টতই জার্মান সরকারের স্বার্থকে রক্ষা কওে চলে। আমরা জানি বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন। এটা বলা অযৌক্তিক হবে না জার্মান মিডিয়া বাংলাদেশে পশ্চিমা স্বার্থ পরিবেশনের চেষ্টা করছে। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মারাম সেলিমকে বরখাস্ত করার বিষয়ে জার্মানির শ্রম আদালতে ডয়চে ভেলে আইনি লড়াইয়ে হেরে যায়। ডয়চে ভেলেতে উক্ত সাংবাদিকের চাকরিচ্যুতিকে অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করে রায় দিয়েছে শ্রম আদালত। ডয়চে ভেলের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক কভারেজ, রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। মিসর এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য ডয়চে ভেলেকে অভিযুক্ত করেছিল।
তবে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের উন্নয়নে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতি হিসেবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের একটি বৈশ্বিক নীতি বজায় রাখে এবং বাংলাদেশে মাদকপাচার ও সহিংস সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে র্যাব সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। মার্কিন সুপারিশে গঠিত এ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, হেলিকপ্টারসহ অনেক কিছু সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিষ্ঠার পর থেকে র্যাব সন্ত্রাস দমনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে র্যাব জঙ্গি শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ জেএমবির শীর্ষ নেতাদের দমনে সক্ষম হয়েছে। সন্ত্রাস ও মাদকপাচার ছাড়াও র্যাব ১০০০ ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে এবং ১২০০ মানবপাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। এ বাহিনী ১৭০০০ আগ্নেয়াস্ত্রও জব্দ করেছে এবং সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। র্যাব সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় একটি জঙ্গি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর বিরুদ্ধে অভিযানে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। নবগঠিত সন্ত্রাসী সংগঠন বেশ জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে এ বাহিনীটি।
আমরা এখনও সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ ও মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছি। এছাড়া মাদকের সহজলব্যতা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি। তাই এ এলিট বাহিনীটি সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূলে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। র্যাব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী সময়েও সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ-মাদক নির্মূলে অসাধারণ সাফল্যের স্বীকৃতি রাখছে। এমন সময়ে ডয়চে ভেলের এ রিপোর্ট খুবই পক্ষপাতদুষ্ট ও দেশবিরোধী। যারা এ রিপোর্টে অর্থায়ন করছে এবং মিথ্যা তথ্য দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
-বাবু/এ.এস