
X
পহেলা বৈশাখ বর্তমানে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব হলেও এটি শুরু হয়েছিল ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়। শিল্পায়নের পূর্বে রাষ্ট্রের আয়ের উৎস ছিল ভূমি রাজস্ব। ভূমি রাজস্ব আদায় হত উৎপন্ন ফসলের মাধ্যমে। তখন কৃষকের নিকট থেকে উৎপন্ন ফসলের অর্ধাংশ এবং কোনো কোনো শাসকের সময় দুই তৃতীয়াংশ খাজনা হিসেবে আদায় করা হত। পরবর্তীসময়ে নগদ অর্থেও খাজনা পরিশোধ করা যেত। তখন ভূমিতে কৃষকের কোনো মালিকানা ছিল না। জমির মালিক ছিল একমাত্র রাজা বা সুলতান বা সম্রাট। ব্রিটিশ আমলে প্রথম দিকে জমিদার, শেষদিকে কৃষক জমির মালিকানা পায়। যা হোকÑ মুঘল সম্রাটরা খাজনা আদায় করত হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সাথে তা মিলত না। অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা প্রদান করতে বাধ্য করা হত। এতে খাজনা আদায়কারী ও প্রদানকারী উভয়েরই সমস্যার সম্মুখীন হতে হত। তাই খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর সুবাবাংলায় বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেন।
সম্রাট আকবরের নির্দেশে বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ শিরাজী হিজরি ৯৬৩ সনের মহরম মাসকে ভিত্তি ধরে বাংলা বর্ষের ৯৬৩ অব্দের সূত্রপাত করেন। ৯৬৩ হিজরির মহরম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এজন্য চৈত্র মাসের পরিবর্তে বৈশাখ মাসকে বাংলা মাসের ভিত্তি বা প্রথম মাস করা হয়। সে সময় বাংলায় শক বর্ষপঞ্জির প্রচলন ছিল। চৈত্র ছিল তার প্রথম মাস। আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর রাজত্বের ১৯তম বছরে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রচলন করলেও তা গণনা করা হয় ১৯৫৬ সালের ৫ নভেম্বর তারিখ থেকে। কারণ এ দিন আকবর পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করেন। এ নতুন কালক্রমটি প্রথমে ‘তারিখ-ই-এলাহী’ নামে পরিচিত ছিল। ১৫৮৪ সালের মার্চ মাসের ১০ বা ১১ তারিখে এটি ‘বঙ্গাব্দ’ নামে প্রচলিত হয়। হিজরি সনকে ভিত্তি ধরে বাংলা সনের উৎপত্তি হলেও বাংলা বর্ষ খ্রিস্ট বর্ষের ন্যায় সূর্যনির্ভর, হিজরি বর্ষের ন্যায় চন্দ্রনির্ভর নয়। পৃথিবীর চারদিকে চন্দ্রের পরিভ্রমণের ভিত্তিতে হিজরি বছর গণনা করা হয় বলে একে চান্দ্র বছর বলা হয়। প্রাচীন সুমেরিয়রা চান্দ্র বছর চালু করে। চান্দ্র ও সৌর বছরের মধ্যে প্রতিবছরে ১১-১২ দিনের ব্যবধান হয়ে থাকে। অর্থাৎ সৌর বছর থেকে চান্দ্র বছর ১১-১২ দিন কম। বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রচলনের সময় খ্রিস্টান ও হিজরি সনের মধ্যে পার্থক্য ছিল (১৫৫৬-৯৬৩) = ৫৯৩ বছর। তাই বাংলা বা হিজরি সনের সাথে ৫৯৩ বছর যোগ করলে খ্রিস্টীয় সন পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে খ্রিস্টান, হিজরি ও বঙ্গাব্দ -এ তিনটি কালক্রম চালু থাকলেও এ দেশে এখনো বাংলা বছরের হিসেবে ভূমি রাজস্ব আদায় করা হয়। ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘোষণা করেন। সে সাথে তিনি ৪৮টি রেগুলেশন বা বিধিবিধান ঘোষণা করেন যা এ দেশে কর্নওয়ালিশ কোড নামে পরিচিতি পায়। এ ৪৮টি রেগুলেশনের মধ্যে একটি ছিল সূর্যাস্ত আইন। জমিদাররা চৈত্র মাসের শেষ দিনে সূর্য অস্ত যাবার পূর্বে ঐ বছরের জমির খাজনা দিতে বাধ্য থাকবে। ঐ দিনের মধ্যে কোন জমিদার সরকারকে খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে সরকার ঐ জমিদারির অংশবিশেষ নিলামে বিক্রি করে বকেয়া খাজনা আদায় করতে পারতেন। তখন জমিদাররা চৈত্র মাসের শেষ দিনে সরকারকে খাজনা পরিশোধ করতেন। তার পূর্বে তারা কৃষকদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করতেন। জমিদাররা চৈত্র মাসের শেষ দিনে খাজনা পরিশোধ করে পহেলা বৈশাখে তারা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত।
কালক্রমে উৎসবটি সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়। আগে পহেলা বৈশাখের প্রধান আকর্ষণ ছিল হালখাতা। হালখাতা হল পুরাতন খাতাকে বাদ দিয়ে একটি নতুন হিসাব খাতা খোলা। বাংলা সনের প্রথমদিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে সর্বত্র এ প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের দেশীয় ফল যেমর বাঙ্গি, তরমুজ ও মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। এখন পহেলা বৈশাখ হালখাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিসীমা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বরং হালখাতাই বলতে গেলে উঠে গেছে। পহেলা বৈশাখের দিনে মানুষ এখন ভোরে উঠে নতুন জামাকাপড় পরিধান করে তারা মেলায়, আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধবের বাড়ি বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়, সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা ধরনের কুটির শিল্প সামগ্রীর বিপণন, নানা পিঠাপুলির আয়োজন। অনেক স্থানে থাকে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা। থাকে দেশীয় গান বাজনার আয়োজন।
এ দিনে অনেক স্থানে অনুষ্ঠিত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। মঙ্গল শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন ও আবহমান বাংলার চিত্রকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও নানা প্রাণির প্রতিকৃতি। ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে আসছে। এখন দেশের বিভিন্ন শহরে পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এটি উৎসবের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ^ ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে জাতিসংঘের ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বের বিষয়। রাজধানী ঢাকার পহেলা বৈশাখের আরেক আকর্ষণ রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ। ছায়ানটের শত শত শিল্পী পহেলা বৈশাখের ভোরে সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ছায়ানট ১৯৬৭ সালে বর্ষবরণ শুরু করে যা অদ্যাবধি চলছে। পহেলা বৈশাখের আরেকটি পুরনো সংস্কৃতি হল গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে লাঠি খেলা, কুস্তি, নৌকা বাইচ, ঘোড় দৌড় ইত্যাদির এক সময় প্রচলন ছিল। কোনো কোনো স্থানে এখনো এর প্রচলন রয়েছে। আগে পহেলা বৈশাখের মেলাতে হরিলুটের আয়োজন হত। মেলাতে হরির নামে ‘বাতাসা’ (গুড়ের তৈরি এক ধরনের শুকনো মিষ্টান্ন) উপরদিকে ছিটিয়ে দেয়া হত। মানুষ হুমড়ি খেয়ে সে বাতাসা কুড়িয়ে নিত এবং খেত। মিষ্টির প্রতি তখন মানুষের চরম দুর্বলতা ছিল। ফলে হরিলুটের বাতাসা পাবার জন্য নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যেত।
বাংলার মুসলমানদের বড় উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, বাংলার হিন্দুদের বড় উৎসব হচ্ছে দুর্গা পূজা, স্বরসতী পূজা, খৃস্টানদের বড়দিন, বৌদ্ধদের বৌদ্ধ পূর্ণিমা। আর পহেলা বৈশাখ হচ্ছে বাংলার মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান, উপজাতি, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বাংলার সকল সম্প্রদায়ের উৎসব, অসাম্প্রদায়িক উৎসব, বাঙালির সর্বজনীন উৎসব, প্রাণের উৎসব। পহেলা বৈশাখ হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক, বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক, বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। সংস্কৃতি হল একটা জাতির আয়নাস্বরূপ। আয়নায় যেমন নিজের চেহারা ফুটে উঠে, তদ্রপ সংস্কৃতির মধ্যেও একটা জাতির চেহারা ফুটে উঠে। পহেলা বৈশাখের উৎসবের মধ্যে বাঙালির হাজার বছরের জাতি চরিত্রের পরিচয় ফুটে উঠে। এ দিন বাঙালি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হয়ে উঠে একাকার, আপন সত্তার। যে জাতির সংস্কৃতি যত মহান, সে জাতিও তত মহান। সংস্কৃতিই জাতিকে দিক নির্দেশনা দেয়। মহান জাতির সংস্কৃতিই মুখ্য, আইন নয়।
সমাজে সংস্কৃতিবান ও আলৈাকিত মানুষ চাই। সংস্কৃতিবান মানুষ মাত্রই আলোকিত মানুষ, মুক্ত মানুষ, মুক্ত চিন্তার মানুষ। তাইতো মোতাহার হোসেন চৌধুরী তাঁর ‘সংস্কৃতি কথা’ প্রবন্ধে শুরুতেই বলেছেন, ‘ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার হলো শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম।’ উগ্র পুঁজিবাদী ও ধর্মীয় অনুশাসনপ্রিয় সমাজে সংস্কৃতিবান মানুষ পাওয়া ও হওয়া ভার। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ডিগ্রি প্রদান করছে, সনদ প্রদান করছে। কিন্তু মানুষকে সংস্কৃতিবান হিসেবে গড়ে তুলছে না, মনুষ্যজ্ঞানে গুণান্বিত করছে না। ফলে কোনো বৈচিত্র সৃষ্টি হচ্ছে না, স্বকীয় চিন্তা, স্বকীয় বিচার বিবেচনা, স্বকীয় মূল্যবোধ গড়ে উঠছে না। যে শিক্ষা মানুষের মধ্যে স্বকীয় চিন্তা, স্বকীয় বিচার বিবেচনা, স্বকীয় মূল্যবোধ সৃষ্টি করে না বা সৃষ্টি করার ক্ষমতা দেয় না সে শিক্ষাকে কি যথার্থ শিক্ষা বলা যায়?
পহেলা বৈশাখের উৎসব পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয় বাঙালি জাতি, বাংলাদেশের জনগণ উদার, অসাম্প্রদায়িক ও সংস্কৃতিবান। তবে এটি ঐ দিনের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন । পহেলা বৈশাখের উপর দিয়ে ঝড়-তুফান কম বয়ে যায়নি। ইসলামবিরোধী উৎসব, বিধর্মী উৎসব, হিন্দুদের উৎসব হিসাবে অভিহিত করে এর বিরুদ্ধে কম ফতোয়া দেওয়া হয়নি। তারপরেও পহেলা বৈশাখ তার অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে টিকে আছে। কেননা যিনি পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উদযাপন প্রচলন করেন তিনি হলেন মহামতি সম্রাট আকবর। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার মানুষ, সুলহী কুল (ধর্মীয় সহনশীলতা) ছিল তাঁর নীতি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর
-বাবু/এ.এস