
X
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের উত্তেজনার যে কয়েকটি ইস্যু রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম এবং গুরুত্বপর্ণ ইস্যু হল তাইওয়ান। যদিও এটি একটি কৌশলগত প্রতিযোগিতা। আর বিভিন্ন দেশ যার যার পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী কোনো দেশের দিকে ঝুঁকে। তাইওয়ান হল সেই দেশ যার স্বীকৃতি নিয়ে এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে বৈরিতা বিদ্যমান। এটি এমন একটি ইস্যু যে এর সমাধানও যে রাতারাতি সম্ভব এমনটাও নয়। বিষয়টি পুরোপুরিভাবে আন্তর্জাতিক একটি ইস্যু এবং এখানে চাইলেই সমাধান হওয়া অনেকটা কষ্টসাধ্য। প্রায়ই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভ্রমণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। চীন কবে তাইওয়ানে সামরিক অভিযান চালাবে এটা নিশ্চিত না কিন্তু মাঝে মাঝেই এমন পরিস্থিতির তৈরি হয় যে এই প্রশ্নটি সামনে চলে আসে।
সম্প্রতি মি. ম্যাকার্থির তাইওয়ান সফরের পরিকল্পনা ছিল। তিনি সেই সফর স্থগিত করে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সাথে ক্যালিফোর্নিয়াতেই বৈঠক করেন। উদ্দেশ্য চীনের সাথে উত্তেজনা কমানো। তাইওয়ান প্রেসিডেন্ট দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চীন এই সামরিক মহড়া শুরু করে। মাঝে মধ্যে লাইভ ফায়ারিংও করছে বলে সংবাদে জানা গেছে। তাইওয়ান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে ৪২টি চীনা সামরিক বিমান এবং আটটি যুদ্ধ জাহাজ তাইওয়ান প্রণালীর মধ্যরেখা অতিক্রম করেছে। এই মধ্যরেখাই দুই দেশের মধ্যে সীমারেখা। ’অপারেশন শার্প সোর্ড’ নামের তিনদিনের এই সামরিক মহড়া শুরু হয়েছে। এই বিশাল সামরিক মহড়া কেন? এর আগেও অর্থাৎ ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর কেন্দ্র করে শুরু থেকেই ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয় উভয় দেশের মধ্যে। গত কয়েক বছরের মধ্যে দুই পরাশক্তির উত্তেজনা চরমে পৌছে যায়। এটা যে চীনের একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না তা জানান দিতেই এতকিছু। তাইওয়ান ইস্যুতে চীন বরাবরই এই অবস্থানে। এ বিষয়ে জানতে হলে তাইওয়ান দেশটি নিয়ে জানতে হবে।
২৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের চীনা একটি নথিতে প্রথমবারের মতো দ্বিপটির নাম দেখা যায়। সেই সময় একজন সম্রাট এই অঞ্চলটি আবিষ্কারের জন্য একটি অভিযাত্রী বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। আর এই নথিকে বেইজিং তার আঞ্চলিক দাবির সমর্থনে ব্যবহার করে। ১৬২৪ সাল থেকে ১৬৬১ সাল পর্যন্ত উপনিবেশ হিসেবে সংক্ষিপ্ত ডাচ শাসনের অধীনে ছিল তাইওয়ান। এরপর ১৬৮৩ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত চীনের কিং রাজবংশ শাসন করে ওই অঞ্চল।
জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার প্রশাসনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়তে থাকে। গত বছরের এপ্রিলে আমেরিকান পার্লামেন্টের ছয় সদস্য তাইওয়ান সফরে যান। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের যুক্তরাষ্ট্রে এ সফর ঘিরে উত্তেজনার কারণ হলো চীনের কাছে তাইওয়ান কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নয় বরং একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল বলেই দাবি তাদের। অপরদিকে, তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই দেখে দেশটির জনগণ। দেশটির রয়েছে নিজস্ব সংবিধান এবং নির্বাচিত সরকার। চীন মনে করে একদিন তাইওয়ান তাদের অর্ন্তভুক্ত হবে। তাদের আচরণও সেরকমই। আর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এর বিপরীত। এই তাইওয়ান ইস্যুতেও বিশ্বে বিভক্তি রয়েছে। চীনে এই পুনরায় একত্রীকরণ মনোভাবে তারা সে ধরনের কার্যক্রমও চালায়। গত কয়েক বছর ধরেই চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার একটি বড় ইস্যু হয়ে আছে তাইওয়ান। বিশ্ব এখন মূলত দুইভাগে বিভক্ত। এটি একটি পারস্পরিক ক্ষমতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বে চীন ও আমেরিকা পরস্পর প্রতিযোগী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী। তাইওয়ান সঙ্গত কারণেই অর্থাৎ নিজেকে নিরাপদ রাখার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক। এই জটিল সম্পর্কের ঘেরাটপে যখনই যুক্তরাষ্ট্র বা তাইওয়ান কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ কেউ অপর দেশে যান তখনই উত্তেজনার তৈরি হয় এবং বিশে^ তা ছড়িয়ে যায়। এবারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই তাইওয়ান ইস্যুতে একই অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। সুতরাং দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কতটা নমনীয় হবে তা ভাবার বিষয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর নানা কারণে বিশ্বের উত্তেজনা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি এমন এক সময় যখন উন্নত দেশ থেকে শুরু করে প্রায় সব দেশই অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্থ অবস্থা পার করছে।
এক ইউক্রেন সমস্যা সামাল দিতেই বিশ্বনেতৃত্ব হিমশিম খাচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত কার্যত কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না সেখানে আরেকটি নতুন উত্তেজনা বিশ্বকে সত্যিই দুঃশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ’এক চীন নীতি’ মেনে ওয়াশিংটন এতকাল তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখে এসেছে। কিন্তু এ সফর দুই দেশের উত্তেজনা আরেকটু বাড়িয়ে দিয়েছে বলা যায় যা ভবিষ্যৎ সমীকরণের জন্য বেশি কঠিনই হবে বলে মনে করা হচ্ছে। দুই দেশের বৈপরিত্য অবস্থান নতুন কিছু নয়। এখন চীন যে আগামীতেও তাইওয়ানের এই যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠতা ঠেকাতে এ ধরনের মহড়ার আয়োজন করবে সেটাও অনেকটা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এটা তাইওয়ানকে চাপে রাখার একটি কৌশল। বিপরীতে তাইওয়ানও এই চাপ সামলেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। চীনের সামরিক অভিযানের বিষয়টি সামনে চলে আসে রাশিয়ার ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালানোর পর থেকে। যদিও দুই দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন তবে ভবিষ্যতে তা হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, আধিপত্য বিস্তারের কৌশল, জোট পরিকল্পনা প্রভৃতি সবকিছুই সমানতালে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সম্পর্কের অবনতি শুরুহয়েছিল ২০১৮ সালে। শুরু হয়ে যায় দু’দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ। বাণিজ্য যুদ্ধ, সামরিক প্রতিযোগিতা প্রভৃতি মিলিয়ে তৈরি হয় উত্তেজনা। সেই উত্তেজনা আজও চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সেই উত্তেজনা আরও তীব্র হচ্ছে। এই চলমান দ্বন্দ্বকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে এবং সামরিকভা যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই পরাশক্তি। রাশিয়ার সাথে চীনের সুসম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার কঠিন সম্পর্ক পৃথিবীতে দুটি বলয়ে ভাগ করেছে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে সবসময় একটি উত্তেজিত অবস্থা বিরাজ করে। কারণ দুই দেশই পরাশক্তি এবং কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। ক্ষমতার প্রশ্নে বা প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে আপোস করা প্রায় সময়ই কঠিন হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেকার এই টানাপোড়েন স্নায়ুযুদ্ধের দিকে এগুচ্ছে বলেও অনেকে মত দিয়েছে। এ স্নায়ুযুদ্ধ সম্পর্কে পৃথিবী জ্ঞাত। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট এবং তার মিত্রদের সাথে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেকার স্নায়ুযুদ্ধের কথা আজও স্মরণে আছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন দুই দেশই ছিল সে সময় বিশ্বে দুই পরাশক্তি।
গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র মতবাদে বিভক্ত দুই পরাশক্তির এই স্নায়ুযুদ্ধের ব্যাপ্তিকাল ছিল ১৯৪০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে আশির দশক পর্যন্ত। আজ যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে যে বিভেদ সেখানেও দুই পরাশক্তির মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে বলা যায়। বাণিজ্য বিরোধ ছিল বিরোধের শুরু। এরপর মতভেদ বাড়তে থাকে। বিশ্বনেতৃত্বে কে থাকবে বা আগামী শতাব্দীর নেতৃত্ব কে দেবে তার জন্য যেন প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্ব! যদিও বিশ্ব এখন একক কর্তৃত্ব করার সুযোগ হারিয়েছে। এখন বিশ্ব জোটের অন্তর্গত থাকতে পছন্দ করে। সম মতবাদে বিশ্বাসী দেশগুলো জোট গড়ে তোলে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইউক্রেনকে অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে নিয়মিতভাবে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণমাত্র নেই। বিভিন্ন দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে। বেকারত্ব, খাদ্যসংকট বেড়েই চলেছে। এর মধ্যেই ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে জাহাজ ছাড়তে শুরু করেছে। পৃথিবীজুড়ে বহু বছর ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এটাই এতদিনের দৃশ্যত চিত্র। বলাই বাহুল্য, এক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তি, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি এবং দক্ষ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে প্রভাব বিস্তারের প্রধান নিয়ামক যে ক্ষমতাই তা আজ না বোঝালেও চলবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন এসব দেশ নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া। এমনকি তাইওয়ান ইস্যুতেই দু’দেশ একই অবস্থানে। এবারের উত্তেজনাও হয়তো শান্ত হবে কিন্তু এভাবে বারবার একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বিশ্বে উত্তেজনার পারদ বৃদ্ধি করে এবং তা মঙ্গলজনক নয়।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট
-বাবু/এ.এস