‘সত্য বল সুপথে চল’

রেজাউল করিম

মতামত

সত্য বল সুপথে চল/ওরে আমার মন/সত্য সুপথ না চিনিলে/পাবি নে মানুষের দরশন। এর ব্যাখ্যা লালন ফকিরের উক্ত সঙ্গীত

2023-05-12T16:34:40+00:00
2023-05-12T16:34:40+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
‘সত্য বল সুপথে চল’
রেজাউল করিম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ মে, ২০২৩, ৪:৩৪ পিএম   (ভিজিট : ১২৩৫)
X


সত্য বল সুপথে চল/ওরে আমার মন/সত্য সুপথ না চিনিলে/পাবি নে মানুষের দরশন। এর ব্যাখ্যা লালন ফকিরের উক্ত সঙ্গীত একটি উন্নত মানের প্রার্থনা সঙ্গীত। এমন সুন্দর, অর্থবহ, আদর্শমুখী, মানবিক প্রার্থনা সঙ্গীত বিশ্বে বিরল। সত্য বল সুপথে চল এ ছোট একটি কথার মধ্যে নিহিত আছে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দর্শন, মুক্তির পথ। সত্য বলা, সত্য খোঁজা, সৎ পথে চলা, সৎ জীবনযাপন করা আলোকিত মানুষের লক্ষণ। সহজ সরল মানুষই সভ্য মানুষ, সহজ সরল জীবনই উন্নত জীবন, সহজ সরল মানুষই মনের মানুষ, সহজ সরল প্রেমই আসল প্রেম, সহজ সরল কথাই সত্য কথা। সহজ সরল জীবনযাপনের মধ্যে রয়েছে সুখ-শান্তি। মিথ্যা ও কৃত্রিমতার মধ্যে কোন সুখ নেই, শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। বরং আছে অশান্তি, গ্লানি, অস্বস্তি। মানুষ সত্যচ্যুত হলে তার মধ্যে বাসা বাঁধে মিথ্যা, প্রতারণা, প্রতিহিংসা, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ মদ ও মাৎসর্য। ফলে মানুষ তার মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলে হয়ে যায় পাগলা কুকুর। সত্য থেকে মানুষ যতো দূরে সরে যাচ্ছে মানুষ ততোই পাগলা কুকুর হয়ে যাচ্ছে, মানবতা ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে, ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার, রাহাজানি বেড়েই চলেছে। মানবচিত্তে শান্তি নেই, প্রেম নেই, প্রীতি নেই। শান্তি পেতে হলে সত্যে ফিরে আসতে হবে। সত্য কাউকে বঞ্চিত করে না। যদিও সত্য বড়ো কঠিন। এজন্য লালনের মানসশিষ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা।’

আসলে সত্য কী? সহজ কথায় মিথ্যার বিপরীত হচ্ছে সত্য। আসলে সত্য একটা আদর্শ যা অনাদর্শকে দূর করে। সত্য একটা আলো যা অন্ধকার দূরীভুত করে। সত্য একটা ন্যায় যা অন্যায়কে তাড়িত করে। সকল ইতিবাচক গুণই সত্য। ইংরেজ কবি জন  কিটস  যেমন বলেছেন, সুন্দরই সত্য, সত্যই সুন্দর (Beauty is truth, truth beauty) তেমনি সত্যই গুণ,  গুণই সত্য। তবে সত্য কঠিন ও তিক্ত। তাহলেও সত্যই একমাত্র সঠিক পথ। এজন্য বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন বলেছেন, Honesty is the best policy. লালন আরো সুন্দর ভাষায় বলেছেন, সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন। সত্য সুপথ না চিনিলে পাবিনে মানুষের দর্শন এ মানুষ হচ্ছে গুরু। গুরুই শিষ্যকে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোতে আলোকিত করেন, মুক্তির পথ দেখান। তাই গুরু হচ্ছে বাউলদের কাছে সত্য মানুষ, পরম মানুষ, মুক্তিদাতা, সাক্ষাৎ দেবতা, নবি, রাসুল, অবতার। বাউল মৃত্যু মানুষের আরাধনা করেন না। বাউল আরাধনা করেন জীবিত মানুষকে। এই মানুষের মাধ্যমে সেই মানুষের সন্ধান মেলে। গুরুর মাধ্যমে মহাগুরুর সন্ধান। কিন্তু সত্য ও সুপথ ব্যতীত সেই পরম গুরুর সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব নয়। অসত্য, মিথ্যা, প্রবঞ্চনা দিয়ে মনের মানুষ তথা পরম মানুষের সন্ধান মেলে না। তাই সত্য ও সুপথে জীবন পরিচালনার মধ্যে রয়েছে আত্মিক ও বাহ্যিক মুক্তি, শান্তির সুবাতাস। মানুষ সত্যবাদী হলে তার পক্ষে অন্যায় করা অসম্ভব। সকল অপকর্মের সাথে মিথ্যা জড়িত।

আসলে লালনের সত্য বল সুপথে চল এ এক বাক্যের মধ্যে মানুষের যাবতীয় গুণ নিহিত রয়েছে। হরিদ্দার মহাজন যে জন/তার বাটখারাতে কম/তারে কসুর করবে যম/গদিয়ান মহাজন যে জন/বসে কেনে প্রেম-রতন। এর ব্যাখ্যা যে ব্যবসায়ী অসৎ, প্রতারক, বাটপার তিনি নানাভাবে খরিদ্দারকে ঠকান। তিনি মিথ্যার আশ্রয় নেন, ওজনে কম দেন। বাণিজ্যে সুনাম যে একটা সম্পদ তা তিনি হারিয়ে ফেলেন। এক পর্যায়ে খরিদ্দারের কাছে তার বাটপারী ধরা পড়ে। তার ব্যবসা লাটে উঠে। তিনি পথে বসেন। আর যিনি সৎ, তিনি মিথ্যা বলেন না, ওজনে কম দেন না। তিনি কম ব্যবসা করে খরিদ্দারের ভালোবাসা, সুনাম কেনেন। তাতে তার বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। তিনি সফল হন। এর গূঢ় ব্যাখ্যা হলো প্রেম বা মহানন্দ লাভ। তা কারা এবং কীভাবে করতে পারে সে কথা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী বা নর-নারীর মিলন হবে, আনন্দ লাভ করবে, কিন্তু সন্তান হবে না।

সন্তান হলে নির্বাণ লাভ হয় না। সন্তান উৎপাদিত হলে সাধকের সাধনার পথে বাঁধার সৃষ্টি হয়। সহজিয়া সাধক ও বাউলেরা দেহের তিনটি নাড়ীকে সাধনার সহায় রূপে গ্রহণ করেছেন। বাম নাসারন্ধ্র থেকে প্রবাহিত বামগা নাাড় প্রজ্ঞারূপিণী এবং দক্ষিণ নাসারন্ধ্র থেকে প্রবাহিত দক্ষিণগা নাড়ি উপায়রূপিণী। এ দুই নাড়ীর মাঝখান দিয়ে যে নাড়ী প্রবাহিত সেটা মধ্যগা নাড়ি বা নাড়ি অবধূতী বা অবধূতিকা। এ মধ্যগা নাড়িপথেই অদ্বয় বোধিচিত্তের সাধনা করতে হয়। বামগা ও দক্ষিণগা নাড়ির গতি নিম্নমুখী। এদের একটি ধারায় সংসারে সৃষ্টি এবং অপর ধারায় সংসারের সংহার (নির্বাণ) হয়। বামগা ও দক্ষিণগা নাড়ির স্বাভাবিক নিম্নগতি রুদ্ধ করে অবধূতিকা মার্গে ঊর্ধ্বগামী করলেই তাঁদের মতে মহাসুখ বা সহজানন্দ লাভ হয়। আর এ সহজানন্দ যিনি লাভ করেন তিনি গদিয়ান মহাজন। আর যিনি তা পারেন না তিনিই হরিদ্দার মহাজন। তার মুক্তি নেই। পরের দ্রব্য পরের নারী হরণ কর না/পারে যেতে পারবে না/যতবার করিবে হরণ/ততবার হবে জনম। এর ব্যাখ্যা সম্পদ ও নারীর প্রতি মানুষের রয়েছে দারুণ আকর্ষণ, লোভ। মানুষের পক্ষে এ লোভ সামলান ভারি কষ্টকর। নারী ও ধন-সম্পদ নিয়ে মানুষের কাড়াকারি, মারামারি। তাই লালন বলেন, পরের জিনিস, পরের নারী হরণ করো না মানে লুণ্ঠন করো না, কেড়ে নিয়ো না। কেননা এসব লুণ্ঠন করলে সমাজে ন্যায়-নীতি বলতে কিছু থাকে না। সমাজে অশান্তি অরাজকতা জায়গা করে নেয়।

তাছাড়া যে লুণ্ঠন করে তারও কি রেহাই আছে? তাকেও মামলা মুকাদ্দমা, থানা-পুলিশ, সালিশ দরবার, বিরূপ সমালোচনার ধকল সইতে হয়। এ আরেক অশান্তি। অশান্তিই মরণ। মরণে রয়েছে যন্ত্রণা, যন্ত্রণায় অশান্তি। ভোগবাদ বা ইন্দ্রিয়পরায়নতায় যে সব অশান্তি দূর হয়ে যায় তা নয়। আবার কেউ বলেন, শুক্রানু একটা আমানত। একে খেয়ানত করা যাবে না। এতে আত্মা খণ্ডিত হয়ে পড়ে। অখণ্ড আত্মা নিয়ে তারা ফিরতে পারবে না। আত্মা খণ্ডিত মানে নতুন জনমে পড়া। নতুন জন্ম মানে পাপের প্রায়শ্চিত্ত। তারা বিশ্বাস করেন, নারীসঙ্গ লাভে বিন্দু তথা শুক্রের পতন ঘটা মানে নতুন জন্ম। যতোবার পতন ঘটাবে ততোবার জন্ম হবে। তাতে পৃথিবী নামক কারাগারে ঘুরে বেড়াতে হবে, পারে যাওয়া হবে না, নির্বাণও মিলবে না। তাই বাউলেরা জন্মচক্রে না পড়ে, বিন্দুর পতন রোধ করে আনন্দ লাভ করতে বলেছেন। আর ঐ আনন্দ হলো সহজানন্দ। গুরুর দীক্ষায় সে আনন্দ লাভ সম্ভব। লালন ফকির আসলে মিথ্যে/ঘুরে বেড়ায় তীর্থে তীর্থে/সই হলো না একমন দিতে/আসলে তার প’লো কম। এর ব্যাখ্যা যারা কাজ না করে তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়ায় তারা কিছুই পায় না। তারা মিথ্যে মানে বৃথা ঘুরে বেড়ায়। সেখানে তারা আল্লাহ, হরি, ভগবান, ঈশ্বর, গড কারো দেখা পায় না। আল্লাহ বা ঈশ্বর তো মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, মক্কা, মদিনা, গয়া, কাশি, বৃন্দাবন, লুম্বিনি বা বেথেলহামে থকেন না। তিনি থাকেন মানবদেহে। মানবদেহ ব্যতীত অন্যত্র খুঁজলে তো তাকে পাওয়া যাবে না। লালন ফকির আসল জায়গায় তাকে না খুঁজে তীর্থে তীর্থে বেড়িয়ে বিফল হয়েছেন সে কথাই এখানে তুলে ধরেছেন। শেষ বিচারে ওজন করতে গিয়ে একমন আর হচ্ছে না মানে হিসাবে মিলছে না, যেন ওজনে কম পড়ে যাচ্ছে, পূর্ণতা পাচ্ছে না। কেজির ওজনের পূর্বে ছিল সেরের ওজন। তখন ছিল ৪০ সেরে এক মন। যা-ই হোক, লালন এখানে তুলে ধরেছেন, আত্মিক সাধনায় আত্মিক উন্নতি হয়, তীর্থে গমণে নয়। জগত দুই ভাগে বিভক্ত। যথা সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, আলো-অন্ধকার, জ্ঞান-অজ্ঞান, যৌক্তিক-অযৌক্তিক, গোপন-প্রকাশ্য, শান্তি-অশান্তি, পরিশ্রম-অসলসতা, প্রগতিশীলতা-রক্ষণশীলতা ইত্যাদি। লালন এসবের ইতিবাচক দিকটি গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সত্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে সকল গুণ। গুণ তথা সত্য গ্রহণের মধ্যে রয়েছে শান্তি, অগ্রগতি।

লেখক : লালন গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর

-বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy