‘ঝড়-বৃষ্টি আঁধার রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে’

তোফায়েল আহমেদ

মতামত

প্রতিবছর ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস সমগ্র দেশব্যাপী যথাযথ মর্যাদায় সাড়ম্বরে পালিত হয়। বছর ঘুরে

2023-05-17T12:05:01+00:00
2023-05-18T16:47:41+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
‘ঝড়-বৃষ্টি আঁধার রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে’
তোফায়েল আহমেদ
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ মে, ২০২৩, ১২:০৫ পিএম  আপডেট: ১৮.০৫.২০২৩ ৪:৪৭ পিএম  (ভিজিট : ১৬৯)
X


প্রতিবছর ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস সমগ্র দেশব্যাপী যথাযথ মর্যাদায় সাড়ম্বরে পালিত হয়। বছর ঘুরে দিবসটি যখন আমাদের জীবনে ফিরে আসে, তখন স্মৃতির পাতায় অনেক কথাই ভেসে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আজ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের গৌরবময় সুনাম এবং অর্জনের এই বীজ রোপিত হয়েছিল সেদিন, যেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা ১৯৮১’র ১৭ মে ঝড়-বৃষ্টি আঁধার রাতে-স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। এ বছর শেখ হাসিনার ৪২তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বার্ষিকী।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তুলেছিল স্বৈরশাসকরা। সংবিধান স্থগিত করে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। রাজনীতিকদের বেচাকেনার সামগ্রীতে পরিণত করে রাষ্ট্রীয় মদতে দলভাঙার নীতি অবলম্বন করা হয়েছিল। জেনারেল জিয়া সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন, ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ এবং ‘আই উইল মেক পলিটিকস ডিফিকাল্ট ফর পলিটিশিয়ান্স।’ জেল, জুলুম, হুলিয়া, গুম-খুন ইত্যাদি ছিল নিত্যকার ঘটনা। প্রতিদিন সান্ধ্য আইন জারি ছিল। চারদিকে গড়ে তোলা হয়েছিল এক সর্বব্যাপী ভয়ের সংস্কৃতি। ’৭৬-এর ১ আগস্ট স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়া সীমিত পরিসরে ‘ঘরোয়া রাজনীতি’ করার অনুমতি দেন। আমরা যাঁরা জেলে ছিলাম এবং যাঁরা জেলের বাইরে ছিলেন, তাঁরা দলকে সংগঠিত করেন। শ্রদ্ধেয় নেতা মহিউদ্দীন আহমদকে সভাপতি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করে আওয়ামী লীগ পরিচালিত হয়। রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যে ’৭৭-এর ৩ ও ৪ এপ্রিল মতিঝিলের হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে কয়েক হাজার নেতাকর্মী সমবেত হন। মতবিরোধ নিরসন এবং দলীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার্থে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এক বছর পর ’৭৮-এর ৩ থেকে ৫ মার্চ ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। শ্রদ্ধাভাজন নেতা আবদুল মালেক উকিল সভাপতি, শ্রদ্ধেয় নেতা আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক ও কারান্তরালে থাকা অবস্থায়ই আমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয়। সেই দুর্দিনে দলকে সংগঠিত করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। দুঃসময়ের সেই দিনগুলোতে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের ভূমিকা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

’৮১-এর ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন। সম্মেলনে সবাই ধরে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা জীবন-পণ চেষ্টা করে সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে আওয়ামী লীগের ঐক্য ধরে রেখে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর দলের নেতৃত্বভার অর্পণ করেছিলাম। কাউন্সিলে অনেক আলাপ-আলোচনার পর জাতীয় ও দলীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আমরা সাব্যস্ত করি মহান জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগের পতাকা তাঁরই হাতে তুলে দেব। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। দলের শীর্ষ পদে তাঁকে নির্বাচিত করে আমরা ভারতের রাজধানী দিল্লি গিয়েছিলাম এবং তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে আগমন দিনটি নির্ধারণ করেছিলাম। যেদিন তিনি ফিরে এলেন, সেদিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করেছিলেন শেখ হাসিনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকেই তাঁরা ফিরে পেয়েছেন। সম্মেলনের সমাপ্তি দিবসে সবার সিদ্ধান্ত অনুসারে আমরা দলীয় প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যার নাম প্রস্তাব করলে তা সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। সেদিনের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের দৃশ্য চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে ওঠে। আজ যা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারব না। সেদিন মনে হয়েছে, আমরা আবার বঙ্গবন্ধুর রক্তের কাছে, যে রক্তের কাছে আমরা ঋণী, যে ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব নাÑ সেই রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনার হাতে দলীয় পতাকা তুলে দিয়ে ঋণের বোঝা কিছুটা হয়তো হালকা করতে পেরেছি। সভানেত্রী হিসেবে তার নাম শুনে নেতাকর্মীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন এবং বিপুল করতালির মাধ্যমে দলের সিদ্ধান্তকে অভিনন্দিত করেন। শেখ হাসিনা সভানেত্রী, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আবদুর রাজ্জাক এবং আমি পুনর্র্নিবাচিত হই। কাউন্সিল অধিবেশনের সার্বিক সাফল্য কামনা করে তিনি একটি বার্তা প্রেরণ করে বলেছিলেন, ‘আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এগিয়ে যান।’ বার্তাটি সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক সম্মেলনে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। দলের শীর্ষ পদ গ্রহণে তাঁর সম্মতিসূচক মনোভাব সম্পর্কে কাউন্সিলরদের উদ্দেশে আমি বলেছিলাম, ‘আমরা সকলেই একটি সুসংবাদের অপেক্ষায় আছি।’ শেখ হাসিনা তাঁর বার্তায় সর্বপ্রকার দ্বন্দ্ব-বিভেদ ভুলে ‘আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির’ মাধ্যমে কাউন্সিলর ও নেতাদের বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচি সোনার বাংলা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে গণবিরোধী স্বৈরশাসকের ভিত কেঁপে উঠেছিল। ’৮১-এর ১৭ মে দেশে ফিরে আসার আগে জেনারেল জিয়ার নির্দেশে ‘শেখ হাসিনা আগমন প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে এ ব্যাপারে সতর্ক ও সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়েছিলাম আমরা।

১৭ মে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বৃষ্টিমুখর দিনে শেখ হাসিনা স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন। যেদিন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন, সেদিন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, ছিল সর্বব্যাপী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ। সামরিক স্বৈরশাসনের অন্ধকারে নিমজ্জিত স্বদেশে তিনি হয়ে ওঠেন আলোকবর্তিকা, তথা অন্ধকারের অমানিশা দূর করে আলোর পথযাত্রী। ওইদিন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ৭৩৭ বোয়িং বিমানে ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে সে সময়ের ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে বিকাল সাড়ে ৪টায় এসে পৌঁছেন। সারাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ তাঁকে সংর্বধনা জানাতে সেদিন বিমানবন্দরে সমবেত হন। ওই সময় লাখো জনতা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন ‘শেখ হাসিনার আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম’; ‘শেখ হাসিনা তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেবো’; ‘ঝড়-বৃষ্টি আঁধার রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে’; ‘বঙ্গবন্ধুর রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’; ‘আদর্শের মৃত্যু নাই, হত্যাকারীর রেহাই নাই’। বিমানবন্দরে অবতরণের পর লাখ লাখ লোক তাঁকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সেদিন শুধু মনে হয়েছে, বঙ্গবন্ধুই যেন শেখ হাসিনার বেশে আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। আমরা যখন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে যাই রাস্তার দু’পাশে লাখ লাখ লোক। এমন দৃশ্য যা বর্ণনাতীত। মঞ্চে উঠে তিনি শুধু ক্রন্দন করলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হৃদয়ের আবেগ ঢেলে সেদিন বলেছিলেন, ‘আজকের জনসভায় লাখো চেনামুখ আমি দেখছি। শুধু নেই প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু, মা আর ভাই, আরও অনেক প্রিয়জন। ভাই রাসেল আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। আপা বলে ডাকবে না। সব হারিয়ে আজ আপনারাই আমার আপনজন। স্বামী, সংসার, ছেলে রেখে আপনাদের কাছে এসেছি। বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য আমি এসেছি। আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই। আবার বাংলার মানুষ শোষণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হচ্ছে। আমি চাই বাংলার মানুষের মুক্তি। শোষণের মুক্তি। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছিলেন। আজ যদি বাংলার মানুষের মুক্তি না আসে তবে আমার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়। আমি আপনাদের পাশে থেকে সংগ্রাম করে মরতে চাই। স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালি জাতি রক্ত দিয়েছে। কিন্তু আজ স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে চলেছে। ওদের রুখে দাঁড়াতে হবে। নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সংগ্রাম করি। আপনাদের ভালোবাসার আশা নিয়ে আমি আগামী দিনের সংগ্রাম শুরু করতে চাই। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা না পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের ভার সরকারের কাছে নয়, আমি আপনাদের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’

শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একটানা ১৪ বছর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (তখন ১ জন সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন) হিসেবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দলের জন্য ১৮ বছর কাছে থেকে কাজ করেছি। এ ছাড়া মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি। আমার বারবার মনে হয়েছে যখন তার কাছে বসেছি, ক্যাবিনেট মিটিং বা সভা-সফর করেছি, তখন স্মৃতির পাতায় বঙ্গবন্ধুর কথা বারবার ভেসে উঠেছে। প্রিয় নেত্রী আওয়ামী লীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দলকে সংগঠিত করেছেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর ’৯৬-এ তিনি রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেন। আমি তখন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলাম। কাছে থেকে দেখেছি দৃঢ়তা ও সক্ষমতা নিয়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। ‘ইনডেমনিটি বিল’ বাতিল করে সংবিধানকে কলঙ্কমুক্ত করে জাতির জনকের হত্যার বিচারকার্য শুরু করেছিলেন। ২০০১-এ বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেই বিচার বন্ধ করে দেয়। আবার ২০০৮-এর নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে তিনি শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কাজই সম্পন্ন করেননি, মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ক্ষেত্র গড়ে দিয়েছেন এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালতের রায়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ২০০৯ থেকে আজ পর্যন্ত ১৪ বছরের বেশি আমরা রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত। ২০১৩তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারে গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং শিল্প মন্ত্রণালয়, আর ২০১৪তে সরকার গঠনের পর বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হয়ে বিশ্বে মর্যাদার আসনে আসীন হয়েছে। জাতির জনককে আমরা ১৫ আগস্ট হারিয়েছি। নিষ্পাপ শিশু রাসেলকে সেদিন হত্যা করা হয়েছে। জাতির জনকের দুই কন্যা, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা যদি সেদিন দেশে থাকতেন, খুনিচক্র তাদেরও হত্যা করত। সেদিন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে শহীদের রক্তে গড়া আওয়ামী লীগের পতাকা তুলে দিয়ে আমরা সঠিক কাজটিই করেছিলাম। ইতিহাস সৃষ্টি করে তিনি তা প্রমাণ করেছেন। রক্তেভেজা সেই পতাকা হাতে তুলে নিয়ে দল ও দেশকে তিনি প্রগতির পথে এগিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোলমডেল। সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নতি, জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার হার ও খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, সফলভাবে করোনা অতিমারি মোকাবিলা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের যাবতীয় কৃতিত্বের জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ পর্যন্ত অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত করেছে। দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এত উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং হচ্ছে– যা এই ক্ষুদ্র লেখায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

২০০৮-এর নির্বাচনে ‘রূপকল্প’ তথা ‘ভিশন-২০২১’ ঘোষণা করেছিলেন তিনি। রূপকল্পে ঘোষিত হয়েছিল বাংলাদেশ হবে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং ‘মধ্যম আয়ের দেশ’। ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ স্বপ্ন নয়, বাস্তব। ইতোমধ্যে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। লকডাউনের কারণে আমাদের খাদ্যোৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য তিনি বারবার নির্দেশনা দিয়ে বলছেন, ‘এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে।’ সুখের বিষয়, বিগত বছরগুলোতে সারাদেশে ধানের ভালো ফলন হয়েছে। যার সুফল দেশের মানুষ পেয়েছে। বর্তমান সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিভিন্ন রকম বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যে কারণে দেশের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়েছে। তবে আমি মনে করি এটি সাময়িক। ধৈর্য্য সহকারে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলে এই সংকট উত্তরণ সম্ভব। বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয় ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’।

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতে কী আছে এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে সুধী সমাজে আলোচনা হচ্ছে। গত ১২ ডিসেম্বর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস-২০২২’-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’।” “আমরা আগামী ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলব এবং বাংলাদেশ হবে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’।” সেই সঙ্গে তিনি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর রূপরেখা ঘোষণা করে এর চারটি স্তম্ভের কথা বলেছেন। যেমন (১) স্মার্ট সিটিজেন, (২) স্মার্ট গভর্নমেন্ট, (৩) স্মার্ট ইকোনমি এবং (৪) স্মার্ট সোসাইটি। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর সফল বাস্তবায়নের পথ ধরেই এবারের লক্ষ্য ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে আরও বলেছেন, ‘২০৪১ সালের মধ্যে সারাদেশের সর্বস্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি সাশ্রয়ী, টেকসই, বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবনী বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।’ এসব কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে ‘স্মার্ট সিটি ও স্মার্ট ভিলেজ বাস্তবায়নের জন্য স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা, স্মার্ট ট্রান্সপোর্টেশন, স্মার্ট ইউটিলিটিজ, নগর প্রশাসন, জননিরাপত্তা, কৃষি, ইন্টারনেট কানেকটিভিটি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।’ এ জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবটিক্স, মাইক্রোচিপ ডিজাইনিং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং ও সাইবার সিকিউরিটি এ চারটি প্রযুক্তিতে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে উপরোক্ত চারটি ভিত্তির কথা পুনরুল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের জনশক্তিকে স্মার্ট হতে হবে, প্রতিটি কাজ অনলাইনে করতে শিখতে হবে, ইকোনমি হবে ই-ইকোনমি, যাতে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল ডিভাইসে করতে হবে।” তিনি আরও বলেছেন, “আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মযোগ্যতা’ সবকিছুই ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে হবে। ই-এডুকেশন, ই-হেলথ, ই-কৃষিসহ সবকিছুতেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হবে। আগামী ২০৪১ সাল নাগাদ আমরা তা করতে সক্ষম হবো।”

আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্দীপনামূলক যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব নিয়ে উদয়াস্ত কাজ করছেন, তার নির্দেশিত নির্দেশমালা যদি আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করি, তবে ডিজিটাল বাংলাদেশের মতো ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর কর্মসূচিও আমরা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারব। আসলে তিনি তার পিতার মতোই অন্তর থেকে যা বিশ্বাস করেন, তাই বলেন এবং বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধু দুটি লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করেছেন। একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আরেকটি অর্থনৈতিক মুক্তি। তিনি আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। সেই কাজটি দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করে চলেছেন। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন স্বাধীন বাংলাদেশ হবে মর্যাদাশালী ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। আমরা সেই পথেই বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছি। ইনশাআল্লাহ বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন পূরণ হবে। এটাই শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য ও সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি 

-বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy