
X
সম্প্রতি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জামিনে মুক্ত হওয়ার পরদিনই জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে দেশটির সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ সালে নৃশংসতা চালিয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের এই সংকটময় সময়ে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত। পূর্ব পাকিস্তানেও একই ঘটনা ঘটেছিল; মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত ছিল। শুধু পার্থক্য হলো, আজ আমাদেও সোশ্যাল মিডিয়া আছে। কিন্তু এমনকি তাও বন্ধ করা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যে নৃশংসতার শিকার হয়েছিল, তা আজ আমাদের বুঝতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের মানুষ নৃশংসতার শিকার হয়েছিল বলে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ইমরান খান স্বীকার করে নেওয়ার পাশাপাশি এর মর্মার্থ বোঝার জন্য তাঁর দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
২০২২ সালে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোটে হেরে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল ইমরান খান। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের নেতা ইমরানের পতনের পেছনের কারণ কী ছিলো? ২০১৮ সালে ইমরান পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সে সময় প্রায় সবকিছুই তাঁর পক্ষে ছিল বলে মনে হয়েছিল। ইমরান অঙ্গীকার করেছিলেন, তিনি তাঁর দেশে পরিবর্তন আনবেন। একটি নতুন পাকিস্তান গড়বেন। দেশের জনগণের জন্য নানা প্রতিশ্রুরতির ডালি খুলে বসেছিলেন তিনি। তবে নিজেই এখন তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুরতি নিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ নিয়ে ছুটতে হয়েছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, একসময়ে ক্রিকেট তারকা ইমরান খানকে। ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের জন্য এক কোটি চাকরি সৃষ্টি এবং বিশ্বে পাকিস্তানের জীর্ণশীর্ণ ভাবমূর্তি কাটানো এসব নিয়েই এখন জটিল পরিস্থিতির মুখে ইমরান। পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসেছিল ইমরানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। ভোটের আগে অঙ্গীকার করেছিলেন অর্থ লোলুপ অভিজাত শ্রেণির দুর্নীতির মূল উৎপাটন করবেন এবং মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেবেন।
তবে তিনি এমন এক সমাজের উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতায় এসেছেন, যেখানে ঘরে-বাইরে পর্বতসমান সমস্যা। রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কে ফাটল রয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র আফগানিস্তান এবং পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গেও লড়াই করতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। নির্বাচনের পর দেশটি লাগামছাড়া প্রত্যাশার বন্যায় ভাসছিল। বিশেষ করে ইমরানের খানের তরুণ সমর্থকেরা বিশ্বাস করেছিল, ২০ কোটি ৮০ লাখ জনগোষ্ঠীর দেশটিকে ইমরান খান দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধশালী ‘নতুন পাকিস্তান’ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন। ইমরান খানের বড় চ্যালেঞ্জ হবে তাঁর সমর্থক ও ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণ করা। কারণ, তিনি তাদের হাতে প্রায় চাঁদ এনে দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইমরান খানের সমর্থকদের মধ্যে একটি সাদামাটা ধারণা রয়েছে যে শীর্ষ ব্যক্তি পরিচ্ছন্ন (দুর্নীতিমুক্ত) হলে পুরো ব্যবস্থাপনাই পরিচ্ছন্ন থাকবে। পৃথিবীর আর কোথাও এমনভাবে কখনো ভাবা হয় না। যেসব কারণের আলোকে ইমরানের অবস্থান সুরক্ষিত মনে হয়েছিল, সেই একই কারণ তাঁর পতন ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় ইমরান ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে কথিত আছে। তবে উভয়পক্ষই এ কথা অস্বীকার করে। এখন সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরানের সেই সম্পর্ক চুকে গেছে বলে প্রতীয়মান হয়। নিঃসন্দেহে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ইমরানের উল্লেখযোগ্য ও বাস্তবিক জনসমর্থন ছিল।
কিন্তু পাকিস্তানে যাকে ‘স্টাবলিশমেন্ট’ বলা হয়, সেই সেনাবাহিনীর দিকে থেকেও নির্বাচনে তাঁর প্রতি গোপন সমর্থন ছিল। ইমরানের শাসনামলে দেশটির সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাই সমালোচকেরা ইমরানের সরকারকে একটি ‘হাইব্রিড শাসনামল’ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি ইঙ্গিত করে ইমরানের দলত্যাগী এক সদস্য বিবৃতি দিয়েছিলÑ ‘তিনি (ইমরান) তাদের (সেনাবাহিনী) দ্বারাই তৈরি। তারাই তাঁকে ক্ষমতায় এনেছিল।’ ইমরানের প্রধান প্রতিপক্ষ নওয়াজ শরিফ। তাঁকে প্রথমে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পরে দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অনেকের সন্দেহ, নওয়াজ অতীতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে নওয়াজের শাস্তির আসল কারণ ছিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর বিরোধ। ক্ষমতায় আসার পর ইমরান গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি ও সেনাবাহিনী একই মতাদর্শের অধিকারী। ইমরানের এমন ঘোষণা নাগরিক সমাজের কর্মীদের উদ্বিগ্ন করে। ইমরানের শাসনামলে তাঁর সরকার ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই উভয়ের সমালোচনাকারী সাংবাদিক-ভাষ্যকারেরা হামলা-অপহরণের শিকার হন। ইমরানের সরকার ও সেনাবাহিনী উভয়ে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে। কিন্তু কোনো অপরাধীকে কখনোই শনাক্ত করেনি ইমরান সরকার। ইমরানের আরও অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। তাঁর শাসনামলে পাকিস্তানে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম লাগামহীন হয়েছে। ডলারের বিপরীতে পতন ঘটেছে পাকিস্তানি রুপি। ইমরানের সমর্থকেরা এ পরিস্থিতির জন্য বৈশ্বিক অবস্থাকে দায়ী করেন। কিন্তু এ কথা সত্য, পাকিস্তানে ইমরানের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ বাড়ছিল।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একবার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন ‘আমরা পাকিস্তান আমলে আর্থিক ও জীবনযাত্রার দিক থেকে এখনকার চেয়ে ভালো ছিলাম। যেখানে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের চরম শিখরে, আর পাকিস্তান ধীরে ধীরে অভাবের একেবারে কিনারায় এসে পৌঁছেছে, সেখানে এই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা নিতান্তই বোকামি ও ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই না। এখন পাকিস্তানের চেয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তখন বিএনপি ও অন্যান্য দলের গায়ে জ্বালা ধরে। আর পাকিস্তানের এসব দৈন্যদশা দৈখে অনেকের কষ্ট হয়। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিক্ষা চাইতে বিদেশ সফরে গিয়ে হাসির পাত্র হয়। সেই দেশেই তো ফিরে যেতে চাওয়াটা আসলেই লজ্জাকর।
মির্জা ফখরুলের এমন কথাই প্রমাণ করে তিনি আজ অবধি পাকিস্তানের প্রেম থেকে বেরুতে পারেননি। বাংলাদেশের অগ্রগতি, সাফল্য, উন্নয়ন ও অর্জন যখন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত, তখন বিএনপি মহাসচিবের পাকিস্তান আমলের প্রশংসা করে বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। বিএনপি-জামায়াতিদের রাজনীতি হলো বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি, সংবিধানবিরোধী রাজনীতি। এদেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হোক, এটা বিএনপি চায় না। যে কারণে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির প্রতিও কোনো আনুগত্য নেই, শ্রদ্ধাবোধ নেই। এসবই ধারাবাহিকতাভাবে নানা বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং দেশের মানুষের শান্তি নষ্ট করাই যেন তার প্রধান উদ্দেশ্য। মির্জা ফখরুলের দেশপ্রেমের দীনতার পরিচয় এবং অলীক ভাবনা ২০০১ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের দিকে লক্ষ্য করলেও দেখা যায়। যেমন অলীক ইশতেহার ইমরান খান দিয়েছিল শুধুমাত্র ক্ষমতা অর্জনের জন্য, দেশের গণতন্ত্র রক্ষার জন্য না। যে দেশপ্রেমের দীনতা নিয়ে গিয়েছিল পতনের দিকে।
২০০১ সালের নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে পরের পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। নির্বাচনের আগে বিএনপি যেই ইশতেহার দিয়েছিলো তার কতটা পরে তারা বাস্তবায়ন করেছিল? বাস্তবিক অর্থে সেগুলো শুধু নির্ধারণ পর্যন্তই ছিলো। তাছাড়া নির্বাচনী সমাবেশের নাম করে আগুন সন্ত্রাস, জ্বালাও -পোড়াও ও ভাঙচুর কওে দেশের মানুষের শান্তি নষ্ট এবং দেশের গণতন্ত্র বিসর্জন দেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যার শেষে অবশ্যই উপলব্ধি করতে পারবে এসব অতিরঞ্জিত ইশতেহার আর ফাঁকা বুলি আওড়িয়ে জনগণ তথা দেশের কোনো কল্যাণ সাধন হয় না। উপরন্তু রোষানলে পড়তে হয়।
ইমরান খানের পাকিস্তান কোভিড-১৯ মহামারির আগেই দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করেছিল। ইমরান খান ক্ষমতায় আসার আগেকার ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ শতাংশে নেমে আসে। তার নতুন ধরনের রাষ্ট্রগঠনের প্রচেষ্টা কোনো কাজেই আসেনি। রাজকোষ ঘাটতি ৭ শতাংশ অতিক্রম করেছে, ফেডারেল বাজেটের এক-তৃতীয়াংশই গেছে ঋণের সুদ পরিশোধে। এই ঘাটতি পূরণে সরাসরি করের ভিত্তিতে পরিবর্তন না এনে ইমরান খানের সরকার আমদানি করের ওপর গুরুত্ব দেয়। সরকারের রাজস্ব আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। কিন্তু এর ফলে বৈশ্বিক সাপ্লাইচেইন থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পাকিস্তান। আমদানি-রপ্তানি সহজ করা ও কম করারোপের ওপর নির্ভরশীল বৈশ্বিক সাপ্লাইচেইন। এ ধরনের অবস্থায় থাকা একটি দেশ সাধারণত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও অন্যান্য বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান থেকে সাহায্য চেয়ে থাকে। কিন্তু, ইমরান খান কীভাবে স্বীকার করবেন তার পশ্চিমা সাহায্য প্রয়োজন? আইএমএফ থেকে পাকিস্তান ৬ বিলয়ন ডলার ঋণ সহায়তা নিলেও, নিজের পশ্চিমা-বিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে যাওয়ায় সংস্থাটির চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় সংস্কার পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি তাকে। এই জঙ্গিবাদী, ইসলামিস্ট ও পশ্চিমাবিরোধী প্রচারণার জন্যই সামরিক বাহিনীর কাছে তার আবেদন তৈরি হয়, নির্বাচনে জয়ের আগেই তাকে সমর্থন দেয়। এখানেই পাকিস্তানের দুর্ভাগ্য। পাকিস্তানের অর্থনীতিকে আধুনিকীকরণ করতে চান এবং বিশ্বদরবারের কাছে উন্মুক্ত করতে চান এমন একজন বেসামরিক নেতা প্রয়োজনে বিচ্ছিন্নতাবাদী সামরিক বাহিনীকে প্রতিরোধ করবেন। সংস্কার ও অর্থনৈতিক উদারিকরণকে প্রাধান্য দিয়ে জেনারেলকে অমান্য করা নেতা আবার বেশিদিন ক্ষমতায় টিকবেন না। যতোক্ষণ পর্যন্ত বেসামরিক নেতারা সামরিক বাহিনীর জাল থেকে বের হতে পারছেন, পপুলিস্ট পশ্চিমা-বিরোধী জজবা থেকে মুক্ত না হচ্ছেন, নিয়মিতভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়বে পাকিস্তান। ইমরান খান অবশ্য এখন এসে বুঝতে পেরেছেন সৎ, সাহসী ও দেশপ্রেম না থাকলে একটি দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। দেশকে উন্নয়নের রোল মডেল বানানো যায় না, বাস্তবায়ন করা যায় না অর্থনৈতিক সফলতা। আর মির্জা ফখরুলের এই প্রায় দেউলিয়া হতে যাওয়া পাকিস্তানকে অনুসরণ করতে চাওয়ার ইচ্ছে দেশের গণতন্ত্র বিসর্জন তথা দেশপ্রেমের দীনতারই পরিচয় বটে।
লেখক : ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বাবু/এ.এস