দরকার পেশাভিত্তিক স্কুল কলেজ

রেজাউল করিম

মতামত

বর্তমানে বাংলাদেশে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষা কারিকুলাম বিদ্যমান তাতে ঘুণ ধরেছে। এ কারিকুল শিক্ষার্থীদের কোনো

2023-05-20T17:38:32+00:00
2023-05-20T17:38:32+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
দরকার পেশাভিত্তিক স্কুল কলেজ
রেজাউল করিম
প্রকাশ: শনিবার, ২০ মে, ২০২৩, ৫:৩৮ পিএম   (ভিজিট : ৪১৩)
X


বর্তমানে বাংলাদেশে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষা কারিকুলাম বিদ্যমান তাতে ঘুণ ধরেছে। এ কারিকুল শিক্ষার্থীদের কোনো কাজে আসে না, জীবিকানির্বাহের কোনো নিশ্চয়তা দেয় না, দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করে না। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে হতাশা, অনিশ্চয়তা বিরাজমান। এজন্য তারা ক্লাসে আসে না, ঘুরে ফিরে দু’চারজন ক্লাসে এলেও তাদের মুখে কোনো জিজ্ঞাসা নেই, প্রশ্ন নেই, জানার আগ্রহ নেই। সময় পার করার জন্য তরুণেরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। তাই সকলের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার দরকার নেই।

কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে মুষ্টিমেয় মেধাবী শিক্ষার্থী যারা জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষালাভ করবে, গবেষণা করবে। এজন্য প্রতি জেলায় একটি করে প্রতিষ্ঠান থাকবে যেখানে সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে যেখানে ৩০০ থেকে ৫০০ পর্যন্ত ছাত্রছাত্রী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে। বাকি ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হবে পেশাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রতিটি পেশার উপর শিক্ষার্থীদের ছয় মাস/এক বছর/দুই বছরের কোর্সভিত্তিক ডিপ্লোমা প্রদান করা হবে। কৃষক, জেলে, দর্জি, ড্রাইভার, কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, সেনিটারি মিস্ত্রী, ইলেকট্রিশিয়ান, ইলেকট্রিক পণ্য মেরামতকারী, ধোপা, নরসুন্দর, কামার, কুমার, তাঁতী, কসাই, বাবুর্চি, ফটোগ্রাফার, আর্টিস্ট প্রভৃতি বিষয়ের উপর কোর্সভিত্তিক পাঠদান ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে ডিপ্লোমা প্রদান করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে।

দেশের সকল ছেলেমেয়েকে একটা মিনিমাম স্তর পর্যন্ত বাধ্যতামূলক লেখাপড়া করতে হবে। হতে পারে সেটা অষ্টম বা এসএসসি পর্যন্ত। তারপরে হবে পেশাভিত্তিক হাতে-কলমে লেখাপড়া। স্বল্পসংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকবে। তাহলে দেশে কোনো বেকার থাকবে না। প্রতিটি মানুষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত হবে। তখন তারা দেশে ও দেশের বাইরে কাজের সুযোগ পাবে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানবসম্পদ তৈরি করে জার্মানি। জার্মানিতে রয়েছে দুই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পেশা স্কুল ও সাধারণ স্কুল। জার্মানিতে অষ্টম শ্রেণি (বাংলাদেশের নবম/দশম শ্রেণি) পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক। তপরপর শিক্ষার্থীরা চলে যায় পেশা স্কুলে। পেশা স্কুলগুলোতে সকল ধরনের পেশা শেখানো হয়। এক স্কুলে সব পেশা নয়। এক স্কুলে এই কয় ধরনের পেশা, আরেক স্কুলে আরেক ধরনের পেশা শেখানো হয়। যারা মেধাবী, যারা সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা করে তাদেরকেও পেশা স্কুলে সপ্তাহে এক দুইদিন পাঠ ও প্রশিক্ষণ নিতে হয়। জার্মানিতে চিকিৎসাবিদ্যা, প্রকৌশলবিদ্যা, আইনবিদ্যা পাস করেই কেউ চাকরি পাবে না। চিকিৎসাবিদ্যায় পাস করে তাকে একজন বড় চিকিৎসকের অধীনে নির্দিষ্ট সময় (৩ বছর) কাজ করতে হবে, হাতেকলমে শিখতে হবে। তারপরে হবে চাকরির পরীক্ষা। তেমনি প্রকৌশলী হতে হলে একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর অধীনে কাজ করতে হবে। আইনজীবী হতে চাইলেও অভিজ্ঞ আইনজীবীর অধীনে কাজ করতে হবে। শিক্ষক হতে গেলেও তাই। শিক্ষক হতে চাইলে কোনো একটা স্কুলে কোনো একজন শিক্ষকের অধীনে কাজ করতে হবে। ঐ শিক্ষক তাকে শেখাবে কীভাবে ক্লাস নিতে হবে, শিক্ষার্থীদের সাথে কীরূপ আচরণ করতে হবে, কীভাবে খাতা দেখতে হবে ইত্যাদি। এসবের পর হবে নিয়োগ পরীক্ষা। ভারি কঠিন পরীক্ষা। জার্মানিতে এমন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যার ফলে যাকে যে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনি সে কাজে যথেষ্ট পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন।

দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে কোনো পেশায় পারদর্শী লোক নেই। হোক সে দর্জি, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ড্রাইভার, ইলেকট্রিশিয়ান ইত্যাদি। কারণ তার প্রশিক্ষণ নেই। নিজে নিজে বা কাজ করতে করতে যা শিখে। ফলে সে কাজ ঠিকমতো করতে পারে না, ভুল হয়। যেমন বাথরুমে যেখান দিয়ে পানি নিস্কাশিত হবে টাইলস বসানোর সময় রাজমিস্ত্রি সে স্থান ঢালু না করে উঁচু বা সমতল করে টাইলস বসিয়ে দেন। মিস্ত্রির ভুলের জন্য বাথরুমে বাড়তি সমস্য সৃষ্টি হয়। মিস্ত্রি ভুল করবেই। কারণ এ বিষয়ে তার কোন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেই। দর্জির কাছে যাবেন, সেখানেও একই অবস্থা। সে ভুল করবে, কাপড় নষ্ট করবে, জামাকাপড় ঠিকমতো বানাতে পারবে না। কারণ এ বিষয়ে তার প্রশিক্ষণ নেই। আমাদের দেশে সব পেশার কাজ চলে প্রশিক্ষণবিহীন।

বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে কেরানি তৈরির ফ্যাক্টরি। বাল্যকালেও আমার মনে প্রশ্ন জাগ্রত হতো যে, স্কুল-কলেজে পড়ে সবাই যদি চাকরি করে আর মাদ্রাসায় পড়ে সবাই যদি হুজুর হয়ে যায়, তাহলে দেশের উৎপাদনমুখী কাজ করবে কারা? এ প্রশ্ন আমার এখনো। আমি মনে করি জার্মানির ন্যায় আমাদের দেশেও কর্মমুখী শিক্ষা দরকার। সেজন্য প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষা কারিকুলে পরিবর্তন আনতে হবে। বিদ্যমান স্কুল-কলেজগুলোকে পেশাভিত্তিক স্কুল-কলেজে রূপান্তরিত করতে হবে। একদিনে সব হবে এমন নয়। আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, এটা আমরা করব। তারপর ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদ্যমান ধাচের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর গড়া যাবে না এবং গড়ার অনুমোদনও দেওয়া যাবে না। প্রত্যেক জেলা উপজেলাতে একটি করে ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করা একান্ত দরকার। সেখানে শিক্ষার্থীরা গাড়ি চালানো, গাড়ি চালানোর নিয়ম, গাড়ি মেরামত, যাত্রীর সাথে আচরণ ইত্যাদি শিখবে। ড্রাইভিং স্কুলই নেই, কোথা থেকে ড্রাইভাররা ভালো গাড়ি চালানো শিখবে, মানুষের সাথে ভালো আচরণ শিখবে? যে ড্রাইভারের হাতে অনেক মানুষের প্রাণ, সে ড্রাইভের প্রশিক্ষণের জন্য ড্রাইভিং স্কুল নেই- এটা দৃঃখজনক। প্রত্যেক পেশার জন্য পেশাভিত্তিক স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবী।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর

-বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy