
X
জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে দুই সপ্তাহ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৫ মে বিকেল ৪টায় গণভবনে এক দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তাঁর সংবাদ সম্মেলনে সফরের নানা খুঁটিনাটি বিষয়ের পাশাপাশি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সাংবাদিকদের কাছে সমসাময়িক যেসব বিষয়ে জানার প্রবল আগ্রহ থাকে, সেসব প্রশ্নের বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসে। তিনি এই সময়ের অন্যতম সাহসী, সংবেদনশীল, রাজনৈতিক, প্রজ্ঞাবান নেতা হিসেবে নিজের অবস্থানকে বেশ সংহত রেখেছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত আশাবাদী হওয়ার জায়গা।
স্বাধীনতা, দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, উন্নয়ন এবং দেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সাহসী নেতৃত্ব হিসেবে শেখ হাসিনাকে গত কয়েক বছরে শেষ ভরসা হিসেবে রাজনীতিসচেতন যেকোনো মানুষ মনে করেন। তাঁর সব মত ও চিন্তার সঙ্গে হয়তো এই সচেতন মহলের অনেকেই সব সময় একমত হন না। কিন্তু তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে দেশ যতটা উচ্চতায় যেতে পেরেছে সেটিকে অস্বীকার এমনকি তাঁরাও করেন না। তাঁর রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অনেকের ভূমিকা, যোগ্যতা এবং কথাবার্তা নিয়ে দেশে বাস্তব সমালোচনা আছে, কিন্তু সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা শুধু দলকেই নয়, বাংলাদেশের সমসাময়িক সব রাজনীতিবিদকেই ছাড়িয়ে যেতে পেরেছেন।
এমন ছাড়িয়ে যাওয়া নেতৃত্ব দেশে অঢেল নয়, এমনকি দ্বিতীয়জনও খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ নিজেকে এবং অন্যদের অতিক্রম করার সক্ষমতা সর্বক্ষেত্রেই খুব বেশি মানুষের হয় না। রাজনীতিতেও তা নেই। ৫০-৬০ বছর আগে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সহযোগীরা তেমনটি পেরেছিলেন বলেই পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণ শুরু করে যেতে পেরেছিলেন।
শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে জাতিকে দেশে-বিদেশে সবার কাছে আলোচনায় রেখেছেন। সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসি ফলো করি। ব্রিটেনে কিভাবে ইলেকশন হয়, তারা কিভাবে করে, আমরা সেভাবেই করব। এর মধ্যে একটু দেখাতে পারি, পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ যদি ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে নির্বাচনকালীন তাঁরা সরকারে আসতে চান, আমরা নিতে রাজি আছি।’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য একেবারে নতুন নয়।
তিনি ২০১৩ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সেই সময় নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। ১৫ তারিখেও তিনি সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন খালেদা জিয়া সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সেসব আমাদের সবারই জানা কথা, তাই পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। তবে ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির সরকারের অধীনে শুধু ব্রিটেন নয়, পৃথিবীর অনেক দেশই পরিচালিত হচ্ছে, নির্বাচনকালে সেই সরকার নীতিনির্ধারণী বিষয় ছাড়া প্রাত্যহিক কাজ সম্পন্ন করে মাত্র। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ যারাই নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তারাই নির্বাচন কমিশনের আইন ও আচরণবিধি দ্বারা নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। তার পরও নির্বাচন পুরোপুরিভাবে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য মানে অনুষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যত পশ্চিমের অনেক দেশের অর্জন বেশ প্রশংসনীয়। কিন্তু কোনো কোনো দেশের নির্বাচন নিয়ে সংশয় এখনো কাটেনি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা গণতন্ত্রের ভাবাদর্শগত রাজনীতির চর্চায়ই রাষ্ট্র, সমাজ ও জনমানসকে তৈরি করার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনকে তুলতে পারিনি। সেটি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার অস্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক নানা উত্থান-পতনের অভিঘাতের ফলেই অনেকটা ঘটেছিল। এর নেপথ্যে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা কুশীলবের ভূমিকাও ছিল।
এখনো এসব খেলোয়াড়ের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ার ‘সুযোগ’ শেষ হয়ে যায়নি। ফলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রত্যাশা ও বাস্তবায়নের মধ্যে অনেক সময়ই বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটেছে, সহনীয় ত্রুটিপূর্ণ অবস্থানে যাওয়ার সুযোগ দু-একবার ঘটলেও পরবর্তী সময়ে তা বহাল থাকেনি। এর মূল কারণ হচ্ছে রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির সমাবেশ সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্যমূলকভাবে ঘটেনি। ফলে ক্ষমতায় যাওয়া বা থাকার ক্ষেত্রে জনকল্যাণ কিংবা গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে তথাকথিত রাজনীতির একটি বড় অংশের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায়নি।
আদর্শগতভাবে অগণতান্ত্রিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার একটি বড় শক্তিতে পরিণত হওয়ায় নির্বাচনী ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যান্য দেশের মতো প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের দেশে গড়ে উঠতে পারেনি। সেই পদ্ধতির অনুসরণকে বাদ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি অনির্বাচিত শক্তিকে নির্বাচনকালের জন্য আমদানি ঘটানো হয়েছিল। সেই ব্যবস্থাটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুর্বল এবং অকার্যকর, এমনকি রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক গহ্বরও তৈরি করেছিল। রাজনীতির এই কঠিন এবং জটিল বিষয়গুলো আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশই আগাম অনুধাবন করতে পারেনি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাই এই পদ্ধতিকে অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক বলে রায় দিয়েছিলেন। সেটি নবম জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বিএনপি এবং জামায়াত সেটি মেনে নেয়নি। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ২০-দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া সংলাপে অংশগ্রহণ করেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন সংসদে নির্বাচিত দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার একটি কাঠামো তৈরির মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার তৈরি করতে। সেই সময় এ বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা ও অন্য দলের নেতারা আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য একটি নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা পাকাপোক্তভাবে করতে পারতেন। তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরও প্রয়োজন পড়ত না, ক্ষমতাসীন সরকারেরও নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ থাকত না।
সে রকম একটি ব্যবস্থাই তো হওয়া প্রয়োজন ছিল। সেই সুযোগ বিনষ্ট হওয়ায় এখন বিএনপিসহ অনেক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরনো রেলগাড়িতে চড়েছে, যার আবেদন দেশি-বিদেশি কারো কাছে তেমন সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তাই সংসদে প্রতিনিধি রয়েছেন এমন দলের সদস্যদের নিয়েই সরকার গঠন করার সুযোগ থাকার কথা বলেছেন। সে ক্ষেত্রে বিএনপির কোনো সদস্য যেহেতু নেই তাই তাঁদের ওই সরকারে নেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এর পরও টেকনোক্র্যাট কোটায় কাউকে রাখা যাবে কি না তা নিয়ে আলোচনা হলেও তার ধরন কী হবে সেটি আরেক বিতর্ক ও জটিলতা সৃষ্টির বিষয়। সুতরাং আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রধানমন্ত্রী সেদিন পরিষ্কার করে দিয়েছেন। এখন বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ট্রেন কতটা চলবে বা লক্ষ্যে পৌঁছবে সেটি দেখার বিষয়।
লেখক : ইউজিসি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফেলো ও সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
-বাবু/এ.এস