
X
প্রযুক্তি ও মানবসভ্যতা শব্দ দুটি একটি আরেকটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটির উন্নতির সুফল অপরটি আস্বাদন করে যথাযথভাবে। একইভাবে একটির প্রভূত উন্নতির কুফল অপরটির ধ্বংসকারী হিসেবে বিশেষ প্রমাণিত হয়েছে। আদিম যুগে মানুষ গাছের ফল-মূল সংগ্রহ করে ক্ষুধা নিবারণ করতো। গাছের ছাল-বাকল পরিধান করতো। এই যুগের মানুষ চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল। তারা আগুনে পুড়িয়ে মাংস রান্না করতেও শিখেছিল। তারা পাথরের অস্ত্র দিয়ে পশুর চামড়া ছাড়াতে পারতো। সেই চামড়া দিয়ে পোশাক তৈরি করত। পাথরের অস্ত্র দিয়ে তারা হাড়ের মাথার ফুটো করে সুঁচ তৈরি করতে। এই সুঁচ দিয়ে পশুর রগের সাহায্যে তারা চামড়ার পোশাক সেলাই করতো। শিকারি মানুষেরা বর্শা, হার্পুন ও তীর ধনুক আবিষ্কার করেছিল। পাথরের কুড়াল দিয়ে তারা গাছ কাটতে পারতো, গাছের গুড়িতে খোড়ল করে ডোঙ্গী নৌকা তৈরি করত। আদিম যুগের শেষ পর্বে পশুশিকার কঠিন হয়ে উঠলে ইরাক, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা প্রভৃতি গরম দেশের মানুষেরা বুনো ঘাসের বিচি থেকে গাছ করতে শুরু করে। এ ঘাসই হল গম, যব প্রভৃতির পূর্বপুরুষ। এভাবেই মানুষ কৃষিকাজ শুরু করেছিল।
তারা কৃষি ও শিল্পে উন্নতি লাভ করার লক্ষ্যে আধুনিক কৃষিযন্ত্র ও শিল্পযন্ত্র আবিষ্কার করে কৃষি ও শিল্পে এনেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রাচীন প্রস্তর যুগ-নব্য প্রস্তর যুগ অতিক্রম করে তারা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তথ্য ও প্রযুক্তিতে রেখেছে অসামান্য অবদান। প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে মানুষের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি। প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ও অগ্রগতির ফলে আমরা ঘরে বসেই সমুদ্রের অপর পাড় থেকে এবং এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশের লোকের সাথে অবলীলায় কথা বলতে পারি। রেডিওর সাহায্যে আমরা বাংলাদেশে বসে লন্ডনের বৃহত্তম ঘণ্টার আওয়াজ শুনছি। শব্দহীন টাইপরাইটার চুপচাপ তার কাজ করছে। কোনোরূপ কষ্ট ও ব্যথা ছাড়াই দাঁত ফিলিং করা হচ্ছে। বিদ্যুতের সাহায্যে রান্না করা চলছে। এক্সরের সাহায্যে আমরা আমাদের শরীরের ভেতরের অংশ দেখতে পাচ্ছি। ছবি কথা বলছে, গান গাচ্ছে। আঙ্গুলের ছাপের সাহায্যে অপরাধী ও খুনি ঘাতকের সন্ধান বের করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক তরঙ্গের দ্বারা চুল কোঁকড়ানো হচ্ছে। সামুদ্রিক জাহাজ উত্তর মেরু পর্যন্ত এবং উড়োজাহাজ দক্ষিণ মেরু অবধি উড়ে যাচ্ছে। বিগত দেড় শতকে তথ্যপ্রযুক্তিতে সংঘটিত বড় বড় বিপ্লব এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে। টেলিফোন, ক্যামেরা, মুভি, ক্যামেরা, ফ্যাক্স, রেডিও, টেপ রেকর্ডার, টিভি, সিনেমা, স্যাটেলাইট, সিডি, ডিভিডি, ডিস, এন্টেনা, কেবল, ইন্টারনেট এবং মোবাইল ফোন, ফেসবুক, টুইটার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপিও মত আবিষ্কার সভ্যতার অগ্রগতিতে বিপুল সহসহায়তা করেছে। অন্যদিকে ক্ষেপনাস্ত্র, পারমাণবিক, রাসায়নিক, হাইড্রজেন বোমা, যুদ্ববিমান-ডুবোজাহাজ, যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন প্রভৃতি মানবসভ্যতাকে করেছে কলংকিত।
প্রযুক্তির এ দুর্দান্ত প্রতাপ কিন্তু সবসময়ই মানুষের জন্য মঙ্গল বয়ে আনেনি। এদের কোনোটি যেমন আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়েছে, আবার কোনোটি আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের প্রভাবে সভ্যতার যেমন উন্নতি হয়েছে, আবার কোন কোন প্রযুক্তি বস্তু হুমকিস্বরূপ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। উড়োজাহাজ দেখুন, বাতাসে ভর করে আসমানের বুকে উড়ে বেড়াচ্ছে। আপনি ধারণা করবেন, এর আবিষ্কারক তার জ্ঞান নৈপুণ্য ও শিল্প-কুশলতার দিক দিয়ে মানুষ নয়, মনুষ্য-ঊর্ধ্ব কোন সত্তা ছিল এবং যারা তাতে প্রথম আরোহন করে আকাশে উড়েছিল। তাতে কোন সন্দেহ নেই, তাদের উচ্চ মনোবল, অটুট সংকল্প, ইচ্ছাশক্তি ও দুঃসাহস অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কিন্তু এখন আপনি একটু সেই সব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পর্যালোচনা করুন যার আওতাধীন এই উড়োজাহাজ ব্যবহৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ হবে। যেসব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কি? আকাশ থেকে বোমাবর্ষণ, মানবদেহ গুলোকে খণ্ড-বিখণ্ডকরণ, জীবিতদের জীবন হরণ, মানবদেহগুলোকে ভস্মীভূতকরণ, বিমান থেকে বিষাক্ত গ্যাস নিক্ষেপ এবং প্রতিপক্ষ অসমর্থ দুর্বলদেরকে ধ্বংস করা। প্রকৃত ব্যাপার হলো, এইসব আবিষ্কার-উদ্ভাবন ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি স্বস্থানে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিরপেক্ষ। সে মানুষের ইচ্ছা-অভিলাষ তার, জ্ঞান-বুদ্ধি ও তার নীতি-নৈতিকতাবোধের অধীন। সে নিজে থেকে আবিষ্কৃত জিনিস স্বয়ং ভালো হলেও মানুষের ভুল, অন্যায়, অপব্যবহার এবং আপন প্রকৃতি ও প্রশিক্ষণের খারাপি দ্বারা সেগুলোকেও খারাপ বানিয়ে দেয়। এজন্য সবচেয়ে বেশি দেখা দরকার এসব আবিষ্কৃত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত উপকরণ ব্যবহারকারী লোকগুলো কেমন, কী রকম নৈতিক চরিত্র ও জীবনাচারের অধিকারী এবং কী ধরনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সে পোষণ করে। প্রযুক্তিনির্ভর পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসে প্রযুক্তির ভূমিকা এর বিধ্বংসী ক্ষমতাকে প্রমাণ করে। আবার প্রযুক্তির লাগামহীন ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃতির ব্যাপক শোষণ বয়ে আনছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, হুমকির মুখে পড়ছে আমাদের বাসযোগ্য একটি গ্রহন এ পৃথিবীর অস্তিত্ব।
প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের ইতিহাস থেকে জানা যায় বিগত সাড়ে পাঁচ হাজার বছরে পৃথিবীর বুকে মোট যুদ্ধ হয়েছে ১৪৫০০টি, প্রাণ হারিয়েছে ৪০০ কোটি মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯) নিহত হয়েছিল সামরিক- বেসামরিক স্তরের ৪,১৪,৩৫০০০ মানুষ। বিকলাঙ্গ হয়েছে আরো ২ কোটি মানুষ। সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছিল ৩২০ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) ৫ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। বিকলাঙ্গ হয় ৯ কোটি মানুষ। সম্পদ বিনষ্ট হয় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। হিটলার, মুসোলিনী, তৈমুর লং, চেঙ্গিস খান, হালাকু খান, আলেকজ্যান্ডার, পুরু, হানিবল প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রযুক্তির নানান উদ্ভাবনের ফলে আজ মানুষের আদিম প্রবৃত্তি তথা যুদ্ধবাজনীতি দারুণভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সংরক্ষিত রয়েছে সমগ্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বিস্ফোরকের ১০ হাজার গুণ এবং প্রতি ১ জনের পিছু ১৫ টনেরও বেশি বিস্ফোরক। আণবিক বোমার থেকে ৪ হাজার গুণ শক্তিশালী বোমার সংখ্যা এখন ৫০-৬০ হাজার। যা দিয়ে পৃথিবিকে কয়েকবার ধ্বংস করা যায়। আজ প্রচলিত নিউক্লিয়ার মিসাইল এর পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় ন্যানো মিসাইল তৈরি হচ্ছে যা কয়েক মিলি সেকেন্ডের মধ্যেই লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত হানতে পারবে।
১৯৪৫ সালের আগস্ট তারিখে সাড়ে পাঁচটার সময় মার্কিনীরা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানব সন্তানদের ওপর পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করলে হিরোশিমা শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। হিরোশিমার মিউনিসিপ্যালিটির সভাপতির ১৯৪৯ সালের ২০ আগষ্ট বলেন, ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট এ শুধু হিরোশিমার মারা গিয়েছিল ২ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ। পৃথিবীতে যারা প্রযুক্তিতে এগিয়ে রয়েছে, তারা আবিষ্কার ও উদ্ভাবন নিয়ে এক স্বার্থপর মানসিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে গোটা পৃথিবীর মানব সমাজকে এক অস্থিতিশীল ও অগ্রহণীয় অবস্থায় নিয়ে গেছে। আলজেরিয়া জিম্বাবুয়ে ঘানা, সোমালিয়া, চাঁদ, কঙ্গো, লিবিয়া, তিউনেশিয়া ও গায়ানাসহ আফ্রিকার একাধিক দেশে গৃহযুদ্ধ লেগেই আছে। রাশিয়া-ইউক্রেন, চিন-তাইওয়ান, আমেরিকা-সিরিয়া, আমেরিকা-ইরাক, আমেরিকা-আফগানিস্তান, আমেরিকা-পাকিস্তান, ইসরাইল-মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে ফিলিস্তিন ও ভারত-কাশ্মীর ইস্যুতে সাম্প্রতিক বিশ্বযুদ্ধের আশাঙ্কায় উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী। বেঁধে যেতে পারে যেকোনো দিন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বিশ্বে রক্তপাতহীন একটি দিনও যাচ্ছে না।
নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত International Physician for the Prevention of Nuclear War এবং Physician for Soical Responsibility প্রতিষ্ঠান দুটি বৈরী প্রতিবেশি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণবিক যুদ্ধ বাধলে বিশ্বের কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হবে ২০১৩ সালে এর ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ বাধলে বিশ্বে দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে। এতে অন্তত ২০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে পারে মানব সভ্যতা। যদি সীমিত পরিসরে পারমাণবিক যুদ্ধ বাধে তাহলে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ মারা যেতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় পরমাণু যুদ্ধের ফলে আবহাওয়া মণ্ডলে যে কার্বন অ্যারোসল কণা ছড়াবে তাতে সুদূর আমেরিকা ও একদশক শস্যকণা ও সয়াবিনের উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ ও পরের ৬ বছর আরও ১০ শতাংশ ধানের উৎপাদন কমে যাবে। মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে গমের উৎপাদনও। এর সাথে চীনের আরো ১৩০ কোটি মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে এই পারমাণবিক অস্ত্র যে শুধু ভারত-পাকিস্তানের আছে তা নয়। যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য ব্রিটেন ফ্রান্স রাশিয়া উত্তর কোরিয়া এবং ইসরাইলের রয়েছে হাজার হাজার পারমাণবিক আত্মঘাতী বোমা। পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে আইনস্টাইন নিজে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে আফসোস করে বলেন, ‘হায়! এরকম একজন বিজ্ঞানী হয়ে ধ্বংসের অস্ত্র তৈরির কারণ না হয়ে যদি একজন অশিক্ষিত মুচি-মেথর করে ঈশ্বর আমাকে সৃষ্টি করতেন।’
প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবহার বিভিন্নভাবে আমাদের জন্য বিপদ বয়ে আনে। কিন্তু এ বিপদের আশঙ্কা থাকলেও প্রযুক্তিহীন সমাজ কিংবা জীবনের কথা আমরা ভাবতে পারি না। তাই প্রযুক্তিকে কীভাবে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যায় এ নিয়ে জ্ঞানের রাজ্যের বিভিন্ন শাখায় পণ্ডিতগণ ভাবতে শুরু করেছেন। অনেকে দাবি করেন আজ আমরা প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে যেসব সমস্যায় সম্মুখীন হই তার জন্য দায়ী বস্তুগত সংস্কৃতির সাথে অবস্তুগত সংস্কৃতির ব্যবধান। যতদ্রুত মানুষ তার বস্তুগত সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে পারে তার অবস্তুগত সংস্কৃতির বিকাশ ততো দ্রুত ঘটতে পারে না। অবস্তুগত সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে মানুষের নৈতিকতা। সুতরাং সব মানুষের ভেতরের দর্শনবোধ জাগিয়ে তুলে আমরা যদি নিজেদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সম্বরণ না করি তবে পৃথিবীর মানব সভ্যতার ধ্বংস দেখতে খুব বেশিদিন হয়তো অপেক্ষা করতে হবে না।
লেখক : প্রভাষক, ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
-বাবু/এ.এস