
X
বর্তমান বিশ্বের মানচিত্রে সবুজ-শ্যামল ও শস্যে ভরা চিরসবুজ বাংলাদেশ নামক ছোট্ট রাষ্ট্রটি ১৯৭১ সালের পূর্বে কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ বছরের পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন নামক অত্যাচার ও শোষণের ভেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে বাঙালিদের দিতে হয়েছে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং হারাতে হয়েছে ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনানুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ উক্ত ঘোষণার পর বাঙালি জনগণ কাতারে কাতারে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশ নামে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে।
১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানব ইতিহাসের এক অনন্য সাধারণ ঘটনা। কেননা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম মূলত সে দেশের জনসাধারণের আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হলেও একটি বিশেষ বিশ্ব পরিস্থিতিতে সেটি আন্তর্জাতিক মাত্রা অর্জন করে। এর বড় প্রমাণ হচ্ছে এই যে, পাকিস্তানের পক্ষে তথা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও চীন প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণ করে, অন্যদিকে মুক্তিকামী বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সুস্পষ্ট সমর্থন জানায়। আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের গান গায় ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাদের নীতি ছিলো একেবারেই অগণতান্ত্রিক এবং প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্তপর্যায়ে (১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত) যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে অবতীর্ণ হয়। স্বৈরাচারী পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগণ যখন স্বাধীনতা সংগ্রামে নিয়োজিত তখন মার্কিন প্রশাসন কী নীতি গ্রহণ করেছিল এবং তা বাস্তবায়নে কী ভূমিকা পালন করেছিল তা জানা আবশ্যক। এটি সত্য যে, আমেরিকার কেন্দ্রীয় প্রশাসন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই পাকিস্তানের স্বপক্ষে এবং বাংলাদেশের বিপক্ষে তার নীতি ঘোষণা করে। তারা গণতন্ত্রকামী বাংলাদেশের জনগণের সমর্থনে এগিয়ে আসেনি। তারা দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের অখণ্ডতার নামে স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা অগণতান্ত্রিক শক্তির স্বপক্ষে।
তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড এম. নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জার ছিলেন নিক্সনের একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি, যিনি তখন আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক প্রেসিডেন্টের একান্ত সহকারী। এই নিক্সন-কিসিঞ্জার নিয়ন্ত্রিত মার্কিন নীতিই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকা পাকিস্তানের এমন একটি অত্যাচারী সরকারের স্বপক্ষে দাঁড়াল যে সরকার তার পূর্বাঞ্চলের নিরীহ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানের পক্ষে নিক্সন-কিসিঞ্জারের প্রকাশ্য সমর্থন কিংবা পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে পড়া নীতি অনুসরণ নিছক পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকা ছিল না। তখনকার মার্কিন প্রশাসনের নীতি এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়, যা ঐ ঝুঁকে পড়ার সীমা ছাড়িয়ে যায়। বলা যায়, প্রায় অনেকটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে তথা পাকিস্তানের স্বপক্ষে আমেরিকার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ কিংবা মদদদান। আমেরিকা ঐ অবস্থান গ্রহণ করার কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বানচাল করতে পাকিস্তানকে সামরিক ও নৈতিক সমর্থন জানায়।
১৯৭১-এ কোথায় ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠে আজ উচ্চারিত গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের গান দীর্ঘ ৯ মাস ধরে নীরিহ-নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর চালানো পাশবিক নির্যাতনের সময়। ১৯৭০-এ বিপুল ভোটে জয় পেয়েও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা না দেওয়ার সময়? ঐ সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে পাকিস্তানের সকল অমানবিক এবং অগণতান্ত্রিক কাজকে বৈধতা দিতে গিয়ে শুধু যে চুপ কওে থেকেছিল বিষয়টি এমন না বরং তারাই ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর আমেরিকার সপ্তম নৌ-বহর বঙ্গোপসাগওে মোতায়েনের নির্দেশ দেন, যার মূললক্ষ্য ছিল ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে সর্বোচ্চ ভীতিপ্রদান এবং পূর্ববাংলা থেকে সরে আসতে পাকিস্তান যেন কিছু সময় পায়। কিন্তু হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী সেই সুযোগ পায়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলার প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, ২ লক্ষ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছে এবং প্রায় ১ কোটি লোক ভারতের শরণার্থী হয়েছিল। এগুলো কী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে তখন মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের মধ্যে পড়েনি?
তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায়Ñ মানবাধিকার, গণতন্ত্র এগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী প্রভাব সৃষ্টির একমাত্র হাতিয়ার। পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র হওয়ায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মার্কিন প্রশাসন অভিনন্দন জানায়নি। কিসিঞ্জার বরং পাকিস্তানের উক্ত নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী দেখতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তৃণমূল রাজনীতি ও তাঁর পাশ্চাত্য ভাবধারাবিরোধী মনোভাব নিশ্চয়ই কিসিঞ্জারের পছন্দ হয়নি। এমনকি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনায় কোনো প্রকার দুঃখপ্রকাশ করেনি। বরং ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে যারা হত্যা করেছে, সেই খুনি রাশেদ (রাশেদ চৌধুরী) অ্যামেরিকায় আশ্রয় নিয়ে আছে। শত চেষ্টার পরও আজ পর্যন্তসাজাপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে তারা এখনো ফেরত দেয়নি। সুতরাং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভুমিকা ও নীতি ছিল পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিতর্কিত।
এছাড়াও ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ পর থেকে পরের সময়গুলোতে জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের সামরিক শাসনামলের সবধরনের অগণতান্ত্রিক এবং অমানবিক কার্যকলাপেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের মন্তব্য করেনি। ঐ সময় নীরব থেকে সামরিক শাসনামলের সকল কার্যকলাপকে বৈধতা দিয়ে গিয়েছে। এছাড়াও এক-এগারোর সময় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমকা ও নীতি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ ২০০৭ সালে ড. ফখরুদ্দীন আহমদেও নেতৃত্বে অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা দখল করে প্রথমেই আক্রমণ করে রাজনীতির ওপর। ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার শুরু হয় রাজনীতিবিদদের। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ প্রমাণের এক নোংরা খেলা শুরু হয়। প্রভাবশালী গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনন চলে। বিনা অভিযোগে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করে চালানো হয় বর্বর নির্যাতন। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কোনো ননেতাকেই ছাড়েনি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
ড. ফখরুদ্দীন-মইন ইউ আহমেদের শাসনামল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হয়রানির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু কওে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল সে সময়। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হল বেসরকারি খাত। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে সেই সময় শুরু হয়েছিল কুৎসিত খেলা। শুরুতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তাকে। তথাকথিত শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের তালিকা ছিল মানহানিকর আপত্তিকর এবং আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা। এই তালিকা দিয়েই শুরু হয় নির্বিচারে চাঁদাবাজি। দেশের আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হানা দেওয়া শুরু হয়। নানা অজুহাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া, মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করার আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। অনেকে মানসম্মানের ভয়ে সারাজীবনের অর্জিত টাকা তুলে দেন রাষ্ট্রীয় চাঁদাবাজদের হাতে। কেউ দেশের বাইরে চলে গিয়ে দূও থেকে সর্বনাশের নির্মমতায় ডুকওে কেঁদেছেন। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ কওে ভোরের অপেক্ষায় ছিলেন। এক-এগারোর সময় দেশে বেসরকারি খাত থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে।
এইযে এক-এগারোর সময়ে এই সকল অমানবিক এবং অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই কোনো ধরনের মন্তব্য করেনি। কিন্তু আজ বাংলাদেশ ও বাংলার মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্রের পথে, মানবাধিকারের পথে, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। মায়ানমারের সামরিক জান্তাদের নির্যাতনে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে যেখানে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বে মানবতার চূরান্ত দৃষ্টান্ত রাখছেন সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শে এবং প্রশিক্ষণে গঠিত র্যাবের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং বাংলাদেশের উপর নতুন মার্কিন ভিসা নীতি ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ। সর্বোপরি, ১৯৭১-১৯৭৫ পর্যন্ত মহান মুক্তিযুদ্ধে এবং পরবর্তী বাংলাদেশের সামরিক ও এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলের অগণতান্ত্রিক রাজনীতিতে, পাশাপাশি র্যাবের উপর নিষেধাজ্ঞা ও নতুন মার্কিন ভিসা নীতি ঘোষণা যেন বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও নীতির প্রশ্নবিদ্ধতাকেই প্রমাণ করছে।
লেখক : ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
-বাবু/এ.এস