কোন পথে সরকারবিরোধীদের রাজনীতি

ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

মতামত

অনেক দিন থেকেই বিএনপি কয়েকটি সাইনবোডসর্বস্ব দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকার পতনের আন্দোলনের কথা বারবার শুনিয়ে আসছিল। অনেক

2023-06-10T11:09:08+00:00
2023-06-10T11:10:50+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
কোন পথে সরকারবিরোধীদের রাজনীতি
ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জুন, ২০২৩, ১১:০৯ এএম  আপডেট: ১০.০৬.২০২৩ ১১:১০ এএম  (ভিজিট : ১৮৮)
X


অনেক দিন থেকেই বিএনপি কয়েকটি সাইনবোডসর্বস্ব দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকার পতনের আন্দোলনের কথা বারবার শুনিয়ে আসছিল। অনেক দল ও জোটের সঙ্গে আলাদাভাবে সিরিজ বৈঠকও করেছিল। ১০ দফা, ১৪ দফা, ২৭ দফা ইত্যাদিও ঘোষিত হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ঈদের পরই ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে দলগুলো রাস্তায় নামবে। কিন্তু সেসব অতি শোনা কথা অনেকটাই বাসি হয়ে গেছে। কোনো কোনো জোটের অভ্যন্তরেই দ্বিমত এবং জোট ছাড়ার ঘটনা ঘটেছে। এখন কে কী অবস্থায় আছে তা আমাদের জানা নেই। তবে বিএনপি সম্প্রতি একাই নানা কর্মসূচি নিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে সমাবেশ শুরু করেছে। ঢাকায়ও পদযাত্রা এ যাত্রায় আবার করা হয়েছে। আগেও সমাবেশ এবং পদযাত্রা কর্মসূচি বারবার পালিত হয়েছে। সেগুলোয় দলীয় নেতাকর্মীরাই মূলত অংশ নিয়েছেন, নিচ্ছেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে মানুষ কোন দল কোথায় কী করে বা বলে যেহেতু দেখতে পারে, তাই সভাসমাবেশে গিয়ে নেতাদের বক্তৃতা শোনার প্রয়োজন অনেকেরই হয় না।

রাজনীতিতে এ পরিবর্তনটা ডিজিটাল যুগের কারণে ঘটেছে। সমাবেশগুলো হয় কেবলই দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে। গণমানুষ বলে যাদের বলা হয়, তাদের অংশগ্রহণ এখন আর সভাসমাবেশে খুব একটা ঘটতে দেখা যায় না। ফলে বিএনপিও যেসব সভাসমাবেশ করে সেগুলো নেতাকর্মীদের সভায় পরিণত হয়ে গেছে। বিএনপি প্রায় এক বছর ধরে সভাসমাবেশ করে আসছে। কখনও দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি, কখনও বিদ্যুতের দাবি, হারিকেন, মোমবাতি মিছিল, আবার কখনও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে সমাবেশ করেছে। সেসব প্রথম দিকে কর্মীদের কিছুটা চাঙা করতে সাহায্য করেছিল। পরে আবার ভাটাও পড়ে। নেতাদের বক্তৃতার ভাষাও প্রায় একই। তবে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে, দেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাবে, পাকিস্তান হয়ে যাবেÑ এসব বক্তব্য শুরুতে কাউকে কাউকে কিছুটা আতঙ্কিত করলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ তেমন রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি দেখে মানুষ এসব বক্তৃতায় খুব একটা নতুনত্ব কিছু দেখছে না। বলা চলে দেশে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এতদিন ঢাকঢোল বেশি পিটিয়েছিল। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি।

সম্প্রতি কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি মনে হয় নতুনভাবে আশাবাদী হয়ে উঠেছে। এর একটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা কয়েকটি দেশ থেকে নানাভাবে বলা হয়েছে তারা আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক দেখতে চায়। এতেই বিএনপির মধ্যে এক ধরনের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে যে, আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চাইতে নির্বাচনটিকে বিদেশিদের কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে দেখানো গেলে পশ্চিমা দেশগুলো আওয়ামী লীগকে ইতিবাচক ইংগিত না নেতিবাচক অবস্থান নেওআর সম্ভাবনা বেশি। এ ছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোর বাংলাদেশস্থ দূতাবাসগুলোর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ এবং আদর-আপ্যায়নটা ‘ভালো’ দেখতে পেয়ে এক ধরনের উষ্ণতা অনুভব করার বিশ্বাসও তাদের মধ্যে জেগেছে। এ ছাড়া বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা না থাকায় সরকার ঢাকাস্থ ছয়টি দূতাবাসকে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী না দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে, তার ফলে দেশগুলো নির্ঘাত সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট হওয়ার সমূহ-সম্ভাবনা বিএনপি দেখছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভবিষ্যতে কোনো দেশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্যাংশন আরোপ করলে বাংলাদেশ সে দেশ থেকে আমদানি বন্ধ করার যে কথাটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সেটিও বিএনপি পশ্চিমাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের দূরত্ব সৃষ্টির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় বিএনপি লবিস্ট নিয়োগে বেশ তৎপর এমন অভিযোগ উঠেছে। দেশে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এখন যেসব অর্থনৈতিক, ব্যবসা-বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে; সেগুলোর অভিঘাতে আমদানি ও ডলার সংকট বেড়ে যাওয়ায় বাজারে একটা অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এটিকে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে জন-অসন্তুষ্টির সুযোগ গ্রহণ করার একটি উপযুক্ত সময় বলে মনে করছে। সেটি তাদের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য থেকে প্রায়ই আমরা শুনতে পাই।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি একাই দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভাসমাবেশ শুরু করেছে। সভাসমাবেশগুলোয় নেতাদের বক্তৃতায় এখন ‘সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশিরা একাট্টা হয়েছে, তারা এ সরকারকে দেখতে চায় না’ এমন বক্তব্যও কেউ কেউ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের বক্তৃতার ভাষা এখন আগের সভাসমাবেশগুলোর ভাষার চাইতে সরকার পতনে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হচ্ছে। দলের মহাসচিব তো এখন আর ১০ বা ২৭ দফা নয়, এক দফাই বিএনপির আন্দোলনের কর্মসূচি বলে দাবি করেছেন। এক দফা মানে শেখ হাসিনার পদত্যাগ কিংবা উৎখাত করার মতো আন্দোলন। রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ সম্প্রতি রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত তেমনি এক সভায় বলেছেন, ‘আর ২৭ দফা-১০ দফার মধ্যে আমরা নাই। এক দফা শেখ হাসিনাকে কবরস্থানে পাঠাতে হবে, শেখ হাসিনাকে কবরস্থানে পাঠাতে হবে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের জন্য যা যা করার দরকার, আমরা করব ইনশা আল্লাহ।’ মির্জা ফখরুল যে এক দফার কথা বলেছেন সেটি সবিস্তারে বলেছেন আবু সাঈদ চাঁদ। কিন্তু তার বক্তব্যকে কেউ কেউ রাজনৈতিক বলে এক ধরনের প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শেখ হাসিনাকে কবরস্থ করা হবে এটি ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ হতে পারে না। তাহলে রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষকে হত্যা করা এবং এর জন্য যা যা দরকার তা করা হবে যারা বলতে পারেন, তারা আদৌ রাজনৈতিক শক্তি কি না সে প্রশ্ন করারও প্রয়োজন পড়ে না।

আবু সাঈদ চাঁদ শেখ হাসিনাকে কবরস্থ করবেন কথাটি তিনি তিনবার উচ্চারণ করেছেন। তার এ উচ্চারণের মধ্যে শেখ হাসিনার প্রতি বিদ্বেষ এবং লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর মানবতাবিরোধী মনোভাবও প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। বিএনপি যতই নিজেকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করে থাকুক না কেন, এ দলের জন্ম এবং পরবর্তীকালের রাজনীতি ও সরকার পরিচালনায় যারা অংশ নিয়েছেন তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আওয়ামী লীগকে মোটেই সহ্য করতে পারেন না। বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেন না, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা স্বীকার করতে চান না এবং এ দল ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে যারা যুক্ত ছিল তাদের দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছে। তাদের সমর্থন বারবার নিয়েছেন, এমনকি তাদের বিচারের বিরুদ্ধেও দলগতভাবে বিএনপি অবস্থান নিয়েছিল। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে দেশে যেসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তাতে জঙ্গিদের ব্যবহার করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলÑ এমন অভিযোগ নতুন নয়। আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা নিহতও হয়েছেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দল থাকে। কিন্তু প্রতিপক্ষকে সমূলে উৎপাটনের মানসিকতা পোষণ করে এমন রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান শুধু গণতন্ত্রের জন্যই নয়, রাষ্ট্রের জন্যও বিপজ্জনক। ১৯৭৫, ২০০১-০৬, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে তেমন মানসিকতারই প্রকাশ ঘটেছিল রাজনীতিতে। এখন জনসভায় বিএনপি নেতৃবৃন্দের বক্তৃতায় যেসব বক্তব্যের উদগিরণ ঘটে, তাতে মনে হচ্ছে বিএনপি সরকার পতন কিংবা আগামী নির্বাচন বানচাল করে দেওয়ার চিন্তা বাস্তবে ঘটাতে যাচ্ছে। সে কারণেই তারা অতি আত্মবিশ্বাসীর মতো উগ্র হঠকারী অনেক কথাই সভাগুলোয় বলে যাচ্ছেন।

তাদের একজন কনিষ্ঠ নারীনেত্রী অন্তত দুটি জনসভায় দাবি করেছেন, ‘ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, তিন বছরের অত্যাচারের জন্য ২১ বছর তাদের রাস্তায় ঘুরতে হয়েছে। এবার ১০০ বছর ঘুরেও ক্ষমতা ফিরে পাবে না।’ কোনো দলের কেউ কি তার প্রতিপক্ষ ১০০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না এমন নিশ্চয়তা দিতে পারে! যিনি ওই দাবিটি করেছেন তিনি গণতন্ত্রের পাঠশালায় এখনও খুব বেশি বইপুস্তক নাড়াচাড়া করেননি বলেই মনে হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণই ক্ষমতায় কোনো দলকে আনতে পারে বা বরণ করে নিয়ে থাকে। পঁচাত্তরের পর আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার নীলনকশা কীভাবে ২১ বছর চলেছিল এর নজির বা রাজনীতির পাঠশালায় দলিল-দস্তাবেজ যথেষ্ট পাওয়া যাবে মনে হয়।

বিএনপি সম্ভবত আগামী নির্বাচনে পশ্চিমা বিশ্বের কল্পিত ‘আওয়ামীবিরোধী’ অবস্থা নিশ্চিত হয়েই বর্তমান সবকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণে বিরত রাখছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করেই বিদেশিদের ‘চাওয়া-পাওয়ার’ ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করতে চাচ্ছে। অবশ্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সংকট লুকিয়ে রাখার নয়। কিন্তু সেটি তো দেখানো কিংবা বলার বিষয় নয়। সর্বোচ্চ পন্থা হচ্ছে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে বিতর্কিত করা, যার নিকটবর্তী আয়োজন হচ্ছে নির্বাচনে অংশ না নেওয়া। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার এ পথ কতটা সঠিক তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

লেখক : ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক অধ্যাপক, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

-বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy