
X
সিরাজুল আলম খান ছিলেন ছাত্রলীগের দুইবারের সাধারণ সম্পাদক (১৯৬৩-১৯৬৫), ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস কমিটির পুরোধা এবং বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন। ষাটের দশকের আন্দোলন সংগ্রামে এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সিরাজুল আলম খানের অবদান কম নয়। আবার বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র তৈরিতে এবং জাসদ প্রতিষ্ঠা করে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্যস্বাধীন দেশকে ভঙ্গুর করতেও তার অবদান কম নয়।
ষাটের দশকের শেষে এবং সত্তরের দশকের শুরুতে ছাত্রলীগের মধ্যে বামপন্থিরা বেশ প্রবল হয়ে উঠে। ছাত্রলীগের সিরাজ গ্রুপ (সিরাজুল আলম খান গ্রুপ) ছিল এ ধারার অনুসারী। এ গ্রুপে সিরাজুল আলম খান ছিলেন মাস্টারমাইন্ড। অন্যরা বিশেষ করে কাজী আরেফ আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, মার্শাল মনিরুল ইসলাম, সালাউদ্দিন ইউসুফ, হাসানুল হক ইনু, নূরে আলম জিকু, মির্জা সুলতান রাজা, মো. শাহজাহান, এম এ আউয়াল, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আ ফ ম মাহবুবুল হক প্রমুখ ছিলেন ছাত্রলীগের (সিরাজ গ্রুপ) নেতা। এরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অসম্পূর্ণ বিপ্লব বলে মনে করত। দেশে কৃষক-শ্রমিকের রাজত্ব কায়েম করতে হবে, সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে, শুধু সমাজতন্ত্র নয় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে তাদের মাথায় এ ধারণা বদ্ধমূল হতে লাগল। তারা মনে করল এখনই এর মোক্ষম সময়। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর ছাত্রলীগের সিরাজ গ্রুপ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে।
জাসদ নেতৃবৃন্দ তাদের কর্মীদের নিয়ে রাজনৈতিক ক্লাস নিতেন। চে গুয়েভারের ‘Guerilla Warfare’ এবং রেজিস দেব্রের ‘Revolution in the Revolution’ বই দুটি ছিল তাদের কাছে বাইবেলস্বরূপ। এগুলো পাঠ করে তাদের মধ্যে একধরনের Emotion, Romanticism, Adventurism তৈরি হতো। তাদের কাছে মার্কস, লেনিন, মাওসেতুং, গান্ধী বা বঙ্গবন্ধু কেউ আদর্শ বা আইকন ছিলেন না। তাদের আদর্শ বা আইকন ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো, সিমন বলিভার, সানডিনো, সুভাস বসু, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, প্রীতিলতা।
জাসদ সংগঠিত হওয়ার পর এদের কাজ হলো বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎথাত করা। সে লক্ষ্যে তারা প্রচার প্রপাগান্ডা ছড়াতে থাকে। ১৯৭৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক প্রচারপত্রে জাসদ বলে, ‘ভারতের ৭৫টি বিড়লা-টাটাটদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী ও বর্তমান সোভিয়েত ব্রেজনেভ-কোসিগিন প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের প্রতিনিধি শেখ মুজিবের ফ্যাসিস্ট, জাতীয় বিশ্বাসঘাতক সরকারকে উৎখাত করার জন্য, ঘুণেধরা এ সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন সমাজের ভিত রচনা করার জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করব।’
জাসদ বঙ্গবন্ধু সরকারের তুমুল বিরোধিতায় নেমে পড়ে। যেকোনো পন্থায় বঙ্গবন্ধু সরকারকে উচ্ছেদ করতে তারা উঠে পড়ে লাগল। এ লক্ষ্যে তারা গণবাহিনী (People’s Army) গঠন করে। এ গণবাহিনী দিয়ে দেশে তারা হত্যা, লুট, ডাকাতি, অপহরণ, বোমাবাজি, সন্ত্রাস ইত্যাদি শুরু করে দিল। তারা শ্রেণিশত্রু খতমের নামে আওয়ামী লীগের ১১ জন সংসদ সদস্যকে হত্যা করেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঈদের জামাতে জাসদের গণবাহিনী ব্রাশ ফায়ার করে কুষ্টিয়ার খোকসা-কুমারখালী অঞ্চলের সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া এবং মোহাম্মদ আলী নামক এক ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে হত্যা করে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্যস্বাধীন দেশ বাংলাদেশ। দেশের সবকিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত। তাই দেশে অভাব-অনটন, বন্যা, খাদ্য ঘাটতি, দুর্ভিক্ষ, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি প্রভৃতি সামাল দিতে বঙ্গবন্ধুকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাঁকে শূন্য হাতে সবকিছু করতে হচ্ছে। এমনি সময়ে জাসদ ধুয়া তুলল বুর্জোয়াতন্ত্র, ধনতন্ত্র ভেঙে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে। এজন্য বিপ্লব করতে হবে। ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে সমাজতন্ত্রের একটা আবেগ কাজ করছিল। তাই তাদের মধ্যে জাসদে যোদানের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কেউ জাসদের মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়ে, কেউ আবেগে, কেউ মোহে, কেউ না বুঝে, কেউ নিজস্ব কোনো মতলবে, কেউ বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে, কেউ একটা নতুন প¬াটর্ফমে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়ে জাসদে যোগ দিল। এমনকি বাম, ডান, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলাম ও মুসলিম লীগাররা জাসদে ঢুকা শুরু করে দিল। কেননা তখন ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। জাসদও দ্রুত জনপ্রিয় ও আওয়ামী লীগের বিকল্প দল হওয়ার জন্য কোনো রকম বাছ-বিচার ছাড়াই সকলকে দলে স্বাগত জানাল। অল্প সময়ের মধ্যে (১৯৭৩ সালের মে মাসের মধ্যে) জাসদ ৬০টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৫০টিতে এবং ৪১৬টি থানার মধ্যে ৩৭০টিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে সক্ষম হয়। তখন মহকুমাকে সাংগঠনিক জেলা ধরা হয়েছিল।
জাসদের কর্মীরা নিজেদেরকে গণবাহিনীর সদস্য মনে করতো। গণবাহিনীর কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক ইউনিট ছিল। বাস্তবিক পক্ষে কারো উপর কারো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। একেক ইউনিট একেকভাবে অপারেশন পরিচালনা করতো যা ছিল একটা হঠকারি সিদ্ধান্ত বা হটকারি কার্যকলাপ। এদের হঠকারি সিদ্ধান্তে অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে পথে বসেছে, নিহত হয়েছে। নিখিলচন্দ্র সাহা, বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার বিটঘর গ্রামে, খুবই গরিব কিন্তু মেধাবী। সে বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে তরুণ প্রভাষক হিসেবে সদ্য যোগদান করেছে। সে আবার জাসদের কর্মী। ১৯৭৪ সালের ২৬ নভেম্বর জাসদের হরতাল। সে হরতাল উপলক্ষে বোমা বানানোর দায়িত্ব ছিল নিখিলচন্দ্রের উপর। ২৪ নভেম্বর বোমা বানাতে গিয়ে হঠাৎ বিস্ফোরণে নিখিল তার সহযোগী কাইয়ুমসহ নিহত হন।
বাংলাদেশের অনেক জায়গায় দিনের বেলায় সরকারি প্রশাসন থাকলেও রাতের বেলায় তা গণবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতো। কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ি, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, রংপুর প্রভৃতি জেলায় গণবাহিনীর কার্যক্রম ছিল দৃশ্যমান। এ সময় এরা কিছু এলাকায় ধনী কৃষকদের ধানের গোলা লুট করে তা গরিব-দুস্থদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছে। জোতদারদের নিকট থেকে জমি উদ্ধার করে তা ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছে। এরা অনেক ব্যাংক ডাকাতি করেছে, ট্রেজারি লুট করেছে, থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে।
সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি ছিল খুবই কাঁচা। দেশটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, শক্ত ভিতের উপর তখনো দাঁড়াতে পারেনি। পক্ষান্তরে সন্ত্রাসীরা ছিল শক্তিশালী এবং তাদের কাছে অস্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক বৈপ্লবিক মন্ত্র ছিল। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময় হাতে পাওয়া অস্ত্র জমা দেননি। পুলিশের পক্ষে থানা, পুলিশ ফাঁড়ি এবং জনগণের জানমাল রক্ষা করা ছিল খুবই কঠিন কাজ।
বঙ্গবন্ধুকে উচ্ছেদ করার জন্য জাসদের কতই না আয়োজন। মজার ব্যাপার হলো বঙ্গবন্ধু যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন জাসদের শক্তির অন্ত নেই। জাসদের হুংকার, রণহুংকার ও গর্জনে যেন আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর তাদের শক্তি, হুংকার, রণহুংকার ও গর্জন গেল কোথায়? জাসদ কোন পথে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিল? বিপ্লবের মাধ্যমে, না গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে? কোনো কিছু স্পষ্ট করেনি। যদি বলেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, তবে গণবাহিনী গঠন করা হলো কেন? আর যদি বলেন বিপ্লবের মাধ্যমে, তাহলে গণতন্ত্র বা নির্বাচনের কথা বলতেন কেন? এসব কি উদ্ভট বা স্ববিরোধী নয়?
ছাত্রলীগের সিরাজ গ্রুপের ধারণা হয়েছিল, তারা জাসদ করে এমন বিপ¬বের বন্যা দেশে বইয়ে দিবেন যাতে তারা নিজেরাই একেকজন হয়ে উঠবেন বঙ্গবন্ধু, কাস্ত্রো, চেগুয়েভারা, মাও, লেনিন, সুভাষ বসু। আর তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান হবেন কার্ল মার্কস, যাকে তার অনুসারীরা বলতো দাদা। এ উদ্ভট চিন্তায় তারা নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, বহু ছেলের জীবনে ধ্বংস ডেকে এনেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছেন, গণবাহিনী বানিয়ে দেশের বারোটা বাজিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংসের সুযোগ করে দিয়েছেন, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ঘৃণিত হয়েছেন, জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতায় বসার সুযোগ করে দিয়েছেন।
সিরাজুল আলম খানের চিন্তা ও কর্মে ফারাক ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন সমাজতন্ত্র, জীবনযাপন করতেন পুঁজিবাদীর ন্যায়, থাকতেন সোনারগাঁ হোটেলে। তার বিশ্বাস মতে, তার মৃতদেহটি মেডিকেলে দান করার কথা। অথচ তা কবরে শায়িত হল। কেননা এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলে যাননি। তার মস্তিষ্কপ্রসূত জাসদ বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ প্রশস্ত করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার সংবাদে আবার তিনি শিশুর ন্যায় কেঁদেছেন। তিনি শক্ত হাতে কোনো কিছু করেননি, জাসদ প্রতিষ্ঠার পর এর নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ছিল না। তিনি মাঝেমধ্যে কিছু কথা বলে জেগে উঠতেন এবং পরক্ষণেই হারিয়ে যেতেন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর
-বাবু/এ.এস