ই-বর্জ্যের কার্বন ঝুঁকিতে বিশ্ব

অলোক আচার্য

মতামত

গত কয়েক দশক ধরেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় পৃথিবী ই-বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। ক্রমেই এই পরিবেশগত হুমকি পৃথিবীকে

2023-06-13T14:02:45+00:00
2023-06-13T16:06:27+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
ই-বর্জ্যের কার্বন ঝুঁকিতে বিশ্ব
অলোক আচার্য
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জুন, ২০২৩, ২:০২ পিএম  আপডেট: ১৩.০৬.২০২৩ ৪:০৬ পিএম  (ভিজিট : ১৯২)
X


গত কয়েক দশক ধরেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় পৃথিবী ই-বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। ক্রমেই এই পরিবেশগত হুমকি পৃথিবীকে নতুন সমস্যার মুখোমুখি দাড় করিয়েছে। বর্জ্যেরে কার্বন ঝুঁকিতে বাংলাদেশ : কারণ ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার তথ্যে জানা যায়, প্রতিবছর দেশে সৃষ্টি হচ্ছে ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্যে। যার মধ্যে শুধু স্মার্ট ডিভাইসেই সৃষ্টি হচ্ছে সাড়ে ১০ লাখ টন ই-বর্জ্য। অন্তত ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩০২ ইউনিট নষ্ট টেলিভিশন থেকে সৃষ্টি হচ্ছে ১.৭ লাখ টনের মতো ই-বর্জ্যে। জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে আসছে ২৫ লাখ টনের বেশি। বছর ঘুরতেই এই বর্জ্য বাড়ছে ৩০ শতাংশ ঘরে। সভায় বক্তারা বলেন, ২০২৫ সাল নাগাদ কোটি টনের ই-বর্জ্যেরে ভাগাড়ে পরিণত হবে বাংলাদেশ। ২০৩০ নাগাদ বছরে বিলিয়ন ইউনিট স্মার্ট পণ্য উৎপাদন হবে।

উন্নত দেশগুলো তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজে লাগিয়ে বর্জ্য থেকে রিসাইকেলে মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো এ সমস্যা নিয়ে ভুগছে। শহরগুলোতে প্রতিদিন বর্জ্য বাড়ছে যা পরিবেশের ক্ষতি করছে। তবে আধুনিক বিশ্বে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো ই-বর্জ্য বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য। কেন ই-বর্জ্য ঝুঁকিপূর্ণ, দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলছে আমাদের কপালে? এর সহজ উত্তর হলো এই অতি আধুনিক সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রসার হচ্ছে ই-পণ্য। নিত্যনতুন সুবিধাসম্পন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্যগুলো প্রতিদিন আপডেট সুবিধা নিয়ে বাজারে আসছে। এক্ষেত্রে রয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় যে যত বেশি সুবিধা দিতে পারবে গ্রাহক সেই পণ্য তত কিনবে। এমন ধারণা থেকেই ক্রেতা টানতে প্রতিযোগিতায় নামছে কোম্পানিগুলো। ফলে ক্রেতাই আজ একটা তো কাল অন্য আরেকটা পণ্য কিনছে। কিন্তু তার পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক্স পণ্যটি বর্জ্য হয়ে থেকে যাচ্ছে। দিন দিন এই সমস্যা প্রকট হচ্ছে।

ই-বর্জ্য কেবল আমাদের দেশের সমস্যা নয়, বরং গত কয়েক বছর ধরেই সারাবিশ্বেই এটি সমস্যার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে কম-বেশি ই-বর্জ্যরে উপাদানগুলো মধ্যে রয়েছে স্বর্ণ, রুপা, সিসা, ক্যাডমিয়াম, প্লাটিনাম, নিকেল, টন, দস্তা, সালফার, ফসফরাসসহ আরও কিছু উপাদান যার কিছু মূল্যবান এবং কিছু রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ। এই মূল্যবান উপাদানগুলো আলাদা করে তা প্রক্রিয়াজাত করাই চ্যালেঞ্জিং। এই বর্জ্য পরিবেশের জন্য মারাত্বক হুমকি হয়ে উঠছে। ২০২০ সালে জাতিসংঘের প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা গেছে, তার আগের বছর বিশ^জুড়ে ৫২.৭ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছিল। সেসব ই বর্জ্যরে পাঁচ ভাগের এক ভাগ রিসাইকেল করা হয়। ২০১৯ সালে বিশে^ যত ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য তৈরি হয়েছিল সেগুলোর ওজন ইউরোপের সব পূর্ণবয়স্ক মানুষের চেয়েও বেশি ছিল। আবার বর্জ্যগুলো এক সারিতে রাখতে তা ৭৫ মাইলের চেয়েও দীর্ঘ হয়ে যেতো। আরও জানা যায়, ২০১৪ সালের পর ৫ বছরে বিশ্বের ই-বর্জ্যে বেড়েছে ২১ শতাংশ। জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে ২০৩০ সালে বিশ্বে ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য হবে ৭২.৮ মিলিয়ন টন। মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই ই-বর্জ্য। কারণ পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক্স পরিবেশে ক্ষতিকর উপাদান ছড়িয়ে দেয়। বিশ্বে মোট ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় এশিয়ায়। ফলে সঠিক এবং বাস্তব পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করতে হবে। বলা যায়, ই-বর্জ্য নিয়ে একরম বিপদেই আছে এশিয়ার দেশগুলো। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব এক্ষেত্রে অনেকটাই দায়ী। মানুষের আয় বৃদ্ধি, নতুন নতুন ই-পণ্যের ব্যবহারের প্রতি ঝোঁক তৈরি হওয়া, ওয়ান টাইম বা একবার ব্যবহার করেই তা ফেলে দেওয়ার প্রবণতা এসব কারণে ই-পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। যত ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে ততই ই-বর্জ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝুঁকিও সমানতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো কোনো দেশ আইন মেনে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়র কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিমশিম খাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। উন্মুক্ত স্থানে ক্ষতিকর পদার্থ ছড়িয়ে মানুষের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হচ্ছে।

তবে আশার কথা হলো আমরা যেভাবে ই-বর্জ্যে সমস্যা হিসেবে দেখছি, চাইলেই এই বর্জ্যই হতে পারে আমাদের বড় ধরনের আয়ের উৎস। একটি সমস্যাকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে হবে। কীভাবে হতে পারে সে ব্যাখ্যায় পরে আসছি। তার আগে বলিÑ আজ গ্রামে-গঞ্জে ভাঙাচোরা মোবাইল নিতে সুর শোনা যায়। এই ভাঙাচোরা মোবাইলের বিনিময়ে কোনো বাসনপত্র দেয়। এতে বোঝা যায় ইলেকট্রনিক্স পণ্যগুলো আর বাড়িতে পরে থাকছে না। এসব ই-পণ্যগুলো রিসাইকেলে চলে যাচ্ছে। এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাতিল একটি সাধারণ সিআরটি টিভিতে গড়ে ৪৫০ গ্রাম তামা, ২২৫ গ্রাম অ্যালুমিনিয়াম ও ৫ দশমিক ৬ গ্রাম স্বর্ণ থাকে। এক একটি মোবাইল ফোনে ৩৪ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত স্বর্ণ থাকে। বিশ্বে প্রতিবছর বাতিল মোবাইল ফোনসেট থেকে চার হাজার কোটি টাকার স্বর্ণ পাওয়া যায়। এখাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আনা সম্ভব। বুয়েট ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালিত যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ১ মেট্রিক টন প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড ও র‌্যাম থেকে পাওয়া যেতে পারে ২৮ হাজার ডলার বা ২৪ লাখ টাকা মূল্যের সোনা, রুপা, তামা ও টিন। এছাড়াও পাওয়া সম্ভব অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, নিকেলসহ মূল্যবান ধাতব উপাদান। ইতোমধ্যেই এখাতে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এর অর্থ হলো, ই-বর্জ্য আমাদের মূল্যবান পদার্থ যা থেকে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার সাথে সাথে বেকার সমস্যারও সমাধান হতে পারে।

গত দশ বছরে প্রযুক্তি পণ্য ব্যবহার বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ গুণ। সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা এনভাইরনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশনের (ইএসডিও) গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর দেশে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। ২০২৩ সালে ই-বর্জ্যরে পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১২ লাখ টন। এই বিপুল পরিমাণ ই-বর্জ্যরে খুব কম অংশই কিন্তু রিসাইকেল হচ্ছে। বাকিটা পরে থাকছে পরিবেশে এবং পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে।

এশিয়ার ই-বর্জ্য নিয়ে ইউনাইটেড ন্যাশনস ইউনিভার্সিটি গত বছর এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে এশিয়ায় ই-বর্জ্যরে পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। ১২টি দেশের ওপর তারা গবেষণা চালিয়ে দেখেছে, এই পাঁচ বছরে ই-বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ টন। এদের মধ্যে চীনের অবস্থা ভয়াবহ। এ সময় তাদের দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ই-বর্জ্যরে পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৬ লাখ ৮১ হাজার টন। যা পুরো এশিয়ার জন্য উদ্বেগের বলে বলা হচ্ছে। ই-বর্জ্য সমাধানে তাহলে সমাধান কোথায়? সমাধান হলো এর সঠিক ব্যবহার করা। ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান উপাদাগুলো আহরণ করে তা বাজারে কাজে লাগাতে পারলে তা হবে ব্যাপক সাফল্যের বিষয়। এজন্য সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ই-বর্জ্যরে বড় অংশই যদি আমরা কাজে লাগাতে সক্ষম হই তাহলেই সমস্যার অনেকাংশে সমাধান সম্ভব। কারণ নিত্য নতুন ফ্যাশনেও রাতারাতি থামানো সম্ভব না। রিসাইক্লিংয়ের সাথে সাথে একটি পণ্য দীর্ঘদিন ব্যবহারের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। এখন থেকে বের হতে হলে আমাদের টেকসই পণ্য এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের অভ্যাস গড়া জরুরি। আর রিসাইক্লিং করার মাধ্যমে পরিত্যক্ত পণ্যগুলো পুনরায় বাজারে আসলে তা আবার ব্যবহারের জন্য ভোক্তার হাতে পৌঁছে যাবে। এতে ই-বর্জ্যরে জঞ্জাল বৃদ্ধি একটু ধীরগতি হবে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো ই-বর্জ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা। ভবিষ্যতে ই-বর্জ্য একটি সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠবে এই প্রচেষ্টাই অব্যাহত রাখতে হবে।

লেখক : শিক্ষক কবি ও কলামিস্ট

-বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy