
X
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমান বলেছেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ও খাদ্য নিরাপত্তার এবারের বাজেট উন্নয়নমুখী। এই বাজেটে পুঁজিবাদী নয়, সমৃদ্ধ ও সুষম বাংলাদেশ নির্মাণই মূল লক্ষ্য। এজন্য রাষ্ট্র, সমাজ এবং বাজার- এই তিন নিয়ামকের মাঝে সমন্বয় খুবই জরুরি।’
শুক্রবার (১৬ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এডুকেশন, রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ (ইআরডিএফবি) আয়োজিত ‘সমৃদ্ধ ও সুষম বাংলাদেশ নির্মাণ: বাজেট ২০২৩-২০২৪’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন উপাচার্য ড. মশিউর রহমান।
দেশের ভূ-অর্থনীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রথিতযশা সমাজবিজ্ঞানী ড. মশিউর রহমান বলেন, ‘একটা সময় এই অ ল ছিল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন দিক থেকে সমৃদ্ধ। ক্রমান্বয়ে শোষণের যাঁতাকলে আত্মশক্তিকে বিলীন করেছি। আমাদের ঐতিহ্য ছিল, সংস্কৃতি ছিল, অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ছিল। মূলত শোষণের যাঁতাকলে এই অ লের মানুষ আত্ম-প্রব নার মধ্যে পড়েছে। গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় কাঁদা-মাটি জলে বেড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন এই অ লের মানুষের স্বাধীনতা দরকার। তিনি এক যুগেরও বেশি সময় কারাগারে থেকে দেশের মানচিত্র এঁকেছেন।
বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রসৃষ্টির বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কেন তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল? দ্বিতীয় বিপ্লব ছিল তাঁর বড় শত্রু। দ্বিতীয় বিপ্লবে বঙ্গবন্ধু মূলত চেয়েছিলেন নতুন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়তে। তিনি বলেছিলেন প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা আমি ভেঙে ফেলব। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই কাঠামোর অর্থনীতির বুনিয়াদে সংকট আছে। সেই সংকট তিনি ভাঙতে চেয়েছিলেন। এই অ লে তিনি যে সংবিধানের চার মূলনীতির কথা বলেছিলেন তার মধ্যে অন্যতম হলো সমাজতন্ত্র। সমাজতান্ত্রিক ধারায় যদি এই অ লের অর্থনীতি বিন্যাস হতো তাহলে পুঁজিবাদী বিশ্বের জন্য তা হতো ভয়ঙ্কর রকমের অশনি সংকেত।’
উপাচার্য ড. মশিউর রহমান বলেন, ‘আজকে কেন ড. ইউনূস তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। কারণ গরিব মানুষকে লোন দিয়ে সেখান থেকে মুনাফা করে পুঁজির যে বাজার সৃষ্টি হয়; মানুষকে শোষণ করে, মানুষকে ঋণ দিয়ে সেই ঋণ থেকে মুনাফা করে যে ব্যাংক পরিচালিত হয় তাতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সম্প্রসারণের বিষয়টিই থাকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যার নীতিমাল হচ্ছে- প্রান্তিক, নিরণ্ন, অসহায় এমনকি হিজড়া, বেদে, বিধাব থেকে শুরু করে সবার কাছে সেফটি নেট প্রোগ্রাম নিয়ে যাওয়া। একদিকে ঋণের অর্থনীতি, শোষণের অর্থনীতি- অন্যদিকে এই যে ফুড সিকিউরিটি এন্ড স্যোশাল সেফটি- এই দুটি প্রোগ্রামই একটি রাজনীতিবিদের জীবনে বড় বিষয়। একজন মানুষ তার অর্থনীতির পরিকল্পনায় খাদ্য নিরাপত্তা এবং বিত মানুষকে টেনে তুলে বাজারে ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। এটি পুঁজিবাদী দেশের পছন্দের জায়গা না। সেকারণে শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক নীতিমালা তাদের অপছন্দ। ড. ইউনূসের শোষণের এবং ঋণের অর্থনীতি তাদের পছন্দ।’
জাতীয় বি্বিবিদ্যালয় উপাচার্য আরও বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল মার্কিনিরা। আজও তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির বিপক্ষে। ওই পুঁজিবাদী ধারায় একচেটিয়া মনোপলি ক্যাপিটালিস্ট তৈরি হবে, সেটি আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোতে রাখিনি। আমরা একটি সুষম বাংলাদেশ নির্মাণের কথা ভাবছি। সেই সুষম বাংলাদেশ নির্মাণে রাষ্ট্র, সমাজ এবং বাজার নিয়ামক শক্তি। এই বাজারের নিয়ন্ত্রণ এই সময়ে একটি দুঃসাধ্য বিষয়। পুঁজিবাদী বাজার সম্প্রসারণে একচেটিয়া ধনিক শ্রেণি তৈরি হয়। একচেটিয়া ধনিক শ্রেণি তৈরি হলে ওই লুঙ্গি পরা, গেঞ্জি পরা মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের কোথায় পরিবর্তন নিশ্চিত হবে? শুধু ধনিক শ্রেণির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এই রাষ্ট্র নির্মিত হয়নি। সেই কারণে পৃথিবী যখন যুদ্ধের দামামা বাজায় আমরা তখন লাখো শরণার্থীকে আশ্রয় দেই। এতে আমাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি আছে, খাদ্যঝুঁকি আছে। তারপরেও মানবিকতার জায়গা থেকে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। এ কারণেই আমরা মানবিকতায় পৃথিবীতে রোল মডেল সৃষ্টি করেছি।’
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য প্রফেসর ড. সত্য প্রসাদ মজুমদার, প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর প্রফেসর ড. আতিউর রহমান। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন। এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুল জব্বার খান, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. বদিউজ্জামান ভুঁইয়া প্রমুখ।
বাবু/জেএম