
X
বিশ্বের সভ্যতা, ইতিহাস, উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূলে রয়েছে নদী। নদী সভ্যতাকে আধুনিক করেছে। মানুষ অপার সম্ভাবনা নিয়ে বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলেছে। আজকের আধুনিক সভ্যতায় নদীর ভূমিকা অপরিসীম। আমাদের ইতিহাস সভ্যতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে। নদী আমাদের বিশাল গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এর অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দও দেশ রেখে যেতে পারি।
বাংলাদেশে নদীমাতৃক দেশ। নদীমাতৃক বাংলাদেশ উপাধি যেন আজ প্রহসন হয়ে দাঁড়িয়েছে! নদীগুলো অধিকংশই ‘কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ নিজেদের সামান্য স্বার্থে অসেচেতন ভাবে সুদূরপ্রসারী ক্ষতির চিন্তা না করে নদী-খালগুলো ভরাট করে ফেলছি, দখলে নিয়ে নিচ্ছি। আমাদের হীন স্বার্থের মানসিকতার ভয়াবহ পরিণতি রেখে যাচ্ছি আমাদের আদরের আগামী প্রজন্মের জন্য। এদেশের আনাছে-কানাছে ছিল হাজারো নদী। একসময় এদেশে প্রায় ১২শ নদী ছিল। এখনা যা ২৩০ এ দাঁড়িয়েছে। যে নদীগুলোর জীবন প্রদীপ এখনো টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে, সেগুলো থেকে এখনো মানুষ পাচ্ছে কাক্সিক্ষত সুফল।
নদী আমাদের জাতীয় সম্পদ। একে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার, আপনার, সরকার-রাষ্ট্র এবং সবার। প্রাচীন কাল থেকেই এদেশের মানুষের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌপথ। যাতায়ত এবং পণ্য পরিবহনে নিরাপদ, সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী হওয়ায় মানুষ এই খাতকে বেছে নেয়। আমাদের নৌপরিবহন খাত এক অমিত সম্ভাবনাময় খাত। সময়ের চাহিদা বিবেচনায় রেখে একে ঢেলে সাজানোর এখনিই উপযুক্ত সময়।
নৌপরিবহনকে সহজলভ্য, আরামাদায়ক, আধুনিকায়ন করতে এ খাতের ঝঞ্জাট দূর করা করা প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই সড়ক পরিবহন থেকে নৌপরিবহন অনেক স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ, সাশ্রয়ী, আরামদায়ক এবং আনন্দদায়কও বটে। কোনো এক দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং প্রকল্পে নীরব বিপ্লব ঘটাতে চলছে। ১৫টি নৌরুটে ৩১টি ড্রেজার খনন কাজে নিয়োজিত আছে। খননে ইতোমধ্যে মৃত নদীর নাব্য ফিরেয়ে আনা হয়েছে ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার নৌপথ। পাশপাশি নদীর খননে উত্তোলনকৃত মাটি দিয়ে ৫ হাজার একর অকৃষি জমিকে কৃষি জমিতে রূপান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং প্রকল্পের পরিসর বৃদ্ধি করে খনন প্রক্রিয়া চলমান রাখতে পারলে একদিকে যেমন নদীর নাব্যতা সংকট দূর হবে তেমনি অন্যদিকে বৃদ্ধি পাবে আমাদের কৃষি জমির পরিমাণ, কৃষি উৎপাদন এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
এই খাতের উন্নতি করতে পারলে আমাদের পর্যটনখাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ২৩৫৫ জন দেশীয় জাহাজে এবং ৫৪৩৮ জন বিদেশি জাহাজে চাকরিরত আছেন। নৌ-কর্মকর্তা এবং নাবিকদের বেতন বাবদ দেশে বছরে প্রায় ২ হাজার ৪ শত তিয়াত্তুর কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। অভ্যন্তরীণ জাহাজে রিভারসিবল গিয়ার সংযোজন করে দুর্ঘটনা হ্রাস করা হয়েছে। নৌ-পরিবহন খাতে আমাদের সেবার মান নিশ্চিৎ করতে পারলে অভ্যন্তরীণ আয় আরও বৃদ্ধি পাবে এবং অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটবে। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ নৌযানের সংখ্য্যা ১২৯৫৯টি। অভ্যন্তরীণ নৌখাতে গত ৫ বছরে নিট আয় করেছে ৫ হাজার ১শ ছয় কোটি টাকার উপরে। বৈদেশিক পণ্য আমদানি কিংবা দেশিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে ও মংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথ এখনও প্রধান মাধ্যম। সারাদেশে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় নৌপথ।
আমাদের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রও অভ্যন্তরীণ নৌপথকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। যান্ত্রিক সভ্যতার চরম উৎকর্ষের এ যুগে গোটা বিশ্ব যখন একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের বহুমুখী পথ খুঁজছে, তখন বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার এক উর্বর ক্ষেত্র বাংলাদেশের পানি সম্পদ ও নৌ-পরিবহন খাত অনাদর, অবহেলা ও চরম উদাসীনতার শিকার। বহুজাতিক অটোমোবাইল কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বার্থে তাদের পৃষ্ঠপোষক বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কুপরামর্শ, রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা এবং দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়ে শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের কারণে নদী এবং নৌ চলাচল ব্যবস্থাসহ সামগ্রিক নৌখাত বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে।
একদিকে বছরের পর বছর ধরে পলি জমে ও মারাত্মক দূষণে নদীগুলো স্রোতহারা হয়ে নৌপথের আয়তন আশঙ্কাজনক হারে কমছে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, পরিবেশবিনাশী প্রকল্প প্রণয়ন এবং নদীখেকো ও ভূমিদস্যুদের করালগ্রাসে অনেক নদী বিলীন হয়ে গেছে। আমাদেও নৌপথে এখনো বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারী নাই। এই নৌপথ এখনো দেশের অন্যতম অভ্যন্তরীণ আয়ের অন্যতম উৎস হতে পারে। এখানে আমাদেরকে অন্যদের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয় না। এতো প্রতিকূলতার মধ্যে আশার কথা যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও জাতীয় অর্থনীতি থেকে নৌ-পরিবহন খাত এখনো হারিয়ে যায়নি। চলতি শতকের প্রথমদিকে বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল ব্যবস্থার ওপর এখনও বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। অভ্যন্তরীণ নৌপথে এখনও নিয়মিত ৩০ শতাংশ যাত্রী চলাচল করে আর ২০ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে গত দেড় দশকে নৌপরিবহন খাতের ওপর নির্ভরশীলতা আরো বেড়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সড়কখাতের তুলনায় নৌখাত আনুপাতিকহারে সরকারি আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নদ-নদী প্রকৃতির দান। তাই নৌপথ তৈরিতে আবাদি কিংবা বসতি জমি অথবা কোনো স্থাপনা ধ্বংস করতে হয় না। নৌপথে যাতায়ত আরামদায়ক, ব্যয়সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম।
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও সড়কপথের তুলনায় নৌপথে ব্যয় আরো কম। বৈদেশিক পণ্য আমদানি এবং দেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথ এখনও প্রধান মাধ্যম। সারাদেশে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় নৌপথ। আর এই যোগাযোগের সহজতর মাধ্যমকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র শর্ত হচ্ছে নদ-নদী রক্ষা ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন। নদী রক্ষা না হলে নৌপথ বিলুপ্ত হবে, নৌ চলাচল ব্যববস্থা মুখ থুবরে পড়বে, প্রাকৃতিক মৎস্য আহরণ কমে গিয়ে জেলে মৎসজীবী সম্প্রদায় এবং নৌযানের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে মাঝি-মাল্লারা বেকার হবে। এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। যার আঘাত জাতীয় অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলার জন্য নৌখাতের সামগ্রিক উন্নয়ন অপরিহার্য। নৌ-পরিবহন খাতে সোনালী অতীত হারালেও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও সুযোগ একেবারে হাতছাড়া হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন নৌরুটে ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী চলাচল করছে এবং এ থেকে আয় ৩ হাজার ১৪৫ কোটি ৩ লাখ টাকা। তাছাড়া ৫৪৮৩৫ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হয়ছে। যা গত ১০ বছর আগেও ছিল এর এক-তৃতীয়াংশ কম। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে প্রতিবছর যাত্রী সংখ্যা এবং পরিবহনের পরিমাণ বেড়েই চলছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়ক ও রেলপথের চেয়ে নৌপথ কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে যাই বলি, যেভাবেই বলি, আর যেভাবেই চিন্তা করি না কেন নৌপথ যাত্রীপরিবহন এবং পণ্য পরিবহনে অনেক নিরাপদ, অনেক সাশ্রয়ী, অনেক আরামদায়ক। দেশের চাহিদা বিবেচনা করে একে আরও বেশি গতিশীল করা এখন সময়ের দাবি। নদী ও নৌপথ সচল এবং পুনরুদ্ধার, নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পর্যটন শিল্প বিকাশে নেওয়া পদক্ষেপ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
লেখক : শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর
-বাবু/এ.এস