
X
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফলশ্রুতি। ১৯৭১ সালে অতর্কিত বা হঠাৎ করেই বাঙালিরা সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল ব্যাপারটা মোটেও এমন না। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, সশস্ত্র প্রস্তুতি এবং কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে লড়াই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি।
আর যারা এ লড়াই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের কাছে শুধু ঋণীই থাকব না, বরং শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করব, তাঁদের সংগ্রামী জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করব। আজ আমার নিবন্ধে একটি নাম স্মরণ করছি। নামটি কমরেড মণি সিংহ। মণি সিংহ শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। একজন সংগ্রামী মানুষ। যিনি শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রায় সকল আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন।
১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক কমিটি হিসেবে দুটি কমিটি গঠিত হয়। দুটি কমিটিতেই পূর্ব পাকিস্তান অংশের প্রধান নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে কমরেড মণি সিংহকে। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে মণি সিংহ পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৫৬ সালে গোপনে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে তিনি আবারও সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের ৪-৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস। কংগ্রেসে কমরেড মণি সিংহকে সভাপতি ও কমরেড ফরহাদকে সাধারণ সম্পাদক করে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান জুড়ে প্রতিটি আন্দোলনেই কমরেড মণি সিংহের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছিল। সে কারণেই ভীত-শঙ্কিত হয়ে গণ-আন্দোলনের আগেই পাকিস্তান সরকার, ২০ বছর আত্মগোপনে থেকে আন্দোলন, সংগ্রাম করা কমরেড মণি সিংহকে ১৯৬৭ সালে গ্রেপ্তার করে। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় জনতার দাবির কাছে নত হয়ে সরকার তাঁকে মুক্তি দেয়। কিন্তু জুলাই মাসে আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে-সময়ও আন্দোলন থেমে থাকেনি, বরং জেলে বসেই তাঁর নির্দেশ মতো পার্টির আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে। দেশব্যাপী বাঙালিদের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিও জোরালো হয়।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ৭ এপ্রিল সাধারণ কয়েদিদের সহায়তায় তিনি রাজশাহী কারাগার ভেঙে বের হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ চলাকালে তিনি মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমাজতান্ত্রিক সমর্থন আদায়ে অশেষ অবদান রাখেন। ৭০ বছর বয়সের এই মানুষটি সে সময় ৯ মাস ধরে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও আন্তর্জাতিকসহ বহু কাজে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্মক কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ার লক্ষ্যে কয়েকজন সহকর্মীর সহায়তায় রাজশাহীর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেন। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের চলমান মুক্তিযদ্ধের পক্ষে এই দুটি দেশের সমর্থন আদায়ে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন।
কমিউনিস্ট, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন সম্মিলিতভাবে একটি গেরিলা বাহিনী গঠন করে। নবগঠিত সে বাহিনীর উচ্চতর প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তায় কমরেড আবদুস সালাম, খোকা রায়, মোহাম্মদ ফরহাদ ও মণি সিংহ মে মাসের দিকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দেবার জন্য অনুরোধ জানান। মণি সিংহ শ্রীমতী গান্ধীকে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা সশস্ত্র সংগ্রাম করছি। আমাদের অস্ত্র দিলে, মুক্তিযুদ্ধ করে যাব।’ ইন্ধিরা গান্ধী অনুরোধের জবাবে বলেছিলেন, ‘আপনাদের এই সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত। সেটা আমরা অস্বীকার করি না।’ অস্ত্র দিতে সম্মত না হলেও, পরবর্তীতে অস্ত্র তুলে দিতে সম্মত হন। এই বাহিনী ভারত থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধে যথাযোগ্য অবদান রাখে। কমরেড মণি সিংহের সংগ্রামী ও বিপ্লবী চেতনা বুকে ধারণা করে দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত হোক তরুণ প্রজন্ম।
লেখক : ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক
বাবু/এ.এস