পলাশীর বিশ্বাসঘাতকদের পরিণতি

ইলিয়াজ হোসেন রানা

মতামত

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পূর্বে যখন রবার্ট ক্লাইভ ফরাসি অধিকৃত চন্দননগর আক্রমণ করেন, তখন ব্রিটিশ সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

2023-06-23T12:47:55+00:00
2023-06-23T16:10:40+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
পলাশীর বিশ্বাসঘাতকদের পরিণতি
ইলিয়াজ হোসেন রানা
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০২৩, ১২:৪৭ পিএম  আপডেট: ২৩.০৬.২০২৩ ৪:১০ পিএম  (ভিজিট : ২৪৫)
X


১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পূর্বে যখন রবার্ট ক্লাইভ ফরাসি অধিকৃত চন্দননগর আক্রমণ করেন, তখন ব্রিটিশ সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং ফরাসি সৈন্যদের সাহায্য করার জন্য নবাব সিরাজউদ্দৌলা হুগলির ফৌজদার নন্দনকুমারকে আদেশ করেন। কিন্তু নন্দন কুমার ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তো দূরে থাক, নবাবের অপর একদল সৈন্যকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বিরত রাখলেন। তিনি যে মোটা অংকের ঘুষ খেয়ে এমন বিশ্বাসঘাতকতা  করেছিলেন তা কেবল অনুমান নয়, সমসাময়িক ইংরেজ লেখকরাও এটি স্বীকার করেছেন।

সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এটা মোটেও অসংগত নয় যে, নন্দন কুমার ইংরেজদের বাধা দিলে তারা চন্দননগর  দখল করতে পারত না এবং পলাশীর যুদ্ধ ও সিরাজউদ্দৌলার পতনও ঘটতো না ( রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলায় ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা, পৃ- ৮)। মুঘল সম্রাট শাহজাহান প্রথম ইংরেজদের হুগলিতে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই সূত্রধরে ১৬৫১ সালে বাংলার সুবেদার শাহজাদা সুজা মাত্র তিন হাজার টাকা বাৎসরিক কর পাওয়ার বিনিময়ে পুরো প্রদেশে ইংরেজ বণিকদের অবাধ বাণিজ্যাধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। প্রদত্ত এ বিশেষ সুবিধাই ইংরেজদের বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার বন্দর ও শহরগুলোতে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ অবারিত করে দেয়। ভবিষ্যতে ইংরেজ নির্ভরতা বাড়বে, ইংরেজদেরও উচ্চাভিলাষ জাগতে পারে,  তাই জাতীয় স্বার্থের পরিপিন্থ এ সিদ্ধান্ত  সম্রাট আওরঙ্গজেব রহিত করেছিলেন। এই সিদ্ধান্ত ইংরেজরা মেনে নিতে পারেনি। তারা ষড়যন্ত্রের মেতে ওঠেন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ ধৃষ্টতা মেনে নেননি স্বাধীনচেতা সুবেদার শায়েস্তা খাঁ। ইংরেজ বেনিয়া গোষ্ঠীদেরকে বাংলা থেকে বিতাড়িত  করতে বাধ্য হন।

দুর্ভাগ্য সম্রাট ফররুখ শিয়ার হেমিল্টন নামের এক ইংরেজ চিকিৎসকের সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে কিছু উপঢৌকন দিতে চেয়েছিলেন।  সুচতুর ইংরেজ চিকিৎসক নিজের জন্য কিছু না নিয়ে স্বজাতির বণিকদের জন্য বাংলায় বাণিজ্য সুবিধা দাবি করে বসেন। অপরিণামদর্শী সম্রাট নামমাত্র শুল্কের বিনিময়ে এক ফরমানের মাধ্যমে ইংরেজদের আবার বাংলায় অবাধ বাণিজ্য সুবিধা দান করেন। এই  জাতিঘাতী দান নামের উদারতা বেনিয়াদের বাণিজ্যের ঐশ্বর্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি  বাড়িয়ে দিলো। নবাব আলীবর্দি খানের আমলে কর্নেল স্কট নামের ইংরেজ গোলান্দাজ বাহিনীর এক প্রকৌশলী স্থানীয় কিছু বিশ্বাসঘাতকদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে তাদের অংশ নেওয়ার সুযোগের কথা অকপটে স্বীকার করে বিলেতে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন। এরই ফলোআপ হিসেবে তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করার দুঃসাহস করল, ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গকে অস্ত্রাগারে পূর্ণ করলো, কোম্পানির কলকাতার গভর্নর ড্রেক সিরাজের সব আদেশ অমান্য করা শুরু করল, হলওয়ে  নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে অন্ধকুপ হত্যার কল্পিতকাহিনী প্রচার করল এবং পরিশেষে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন আরেকটা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মাধ্যমে বাংলার তথা উপমহাদেশের স্বাধীনতার সঞ্জীবনী শক্তি নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পলাশীর প্রান্তরে এদেশের কিছু বিশ্বাসঘাতকদের মাধ্যমে  পরাজিত করে এবং  মীর জাফরের কুসন্তান মীরনের আদেশ মুহাম্মদী বেগ তাঁকে হত্যা করে। ইতিহাসের প্রমাণ হল নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যখন মুর্শিদাবাদে লাঞ্ছিত করা হচ্ছিল তখন জনগণ বুঝতে পারেনি নবাবের শেষ পরিণতি কি হতে যাচ্ছিল। ক্লাইভ যখন বাংলার ধনসম্পদ ও মুর্শিদাবাদের কোষাগার খালি করে নৌবহরে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল তখন নদীর দু’পাড়ে জনতা তামাশা দেখেছে। বুঝতে পারে নি কি হততে যাচ্ছে। পশ্চিমা লেখক নোভাক মন্তব্য করেছেন, যে পরিমাণ দর্শক নৌবহরের দৃশ্য অবলোকন করেছে, তারা যদি বুঝতো তাদের সম্পদ লোপাট হচ্ছে,  দেশ আগ্রাসনের শিকার,  এর প্রতিক্রিয়ায় তারা যদি একটি করে ঢিলও ছুঁড়ত তাহলে ইংরেজদের সব স্বপ্নের সলিল সমাধি সেখানেই হয়ে যেতো।

ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের পরিণাম শেষ পর্যন্ত কখনো ভালো হয় না। পরকালের শাস্তি ভোগের আগেই দুনিয়াতেও তারা লাঞ্ছিত, অপমানিত এবং আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। পলাশী বিয়োগাত্মক ষড়যন্ত্রকারী বিশ্বাসঘাতকদের বেলায়ও এটি সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। মীর জাফরের পুত্র মিরন ছিল সিরাজ হত্যার মূল নায়ক। সিরাজের মা আমেনার ঘোষিত অভিশাপ অনুযায়ী তাবুতে বজ্রপাতে আগুন ধরে গেলে মিরনের মৃত্যু ঘটে। সর্বশেষে প্রাণ ভিক্ষা না চেয়ে সিরাজ মুহাম্মদী বেগের কাছে দুই রাকাত নামাজ পড়ার আকুতি জানিয়েছিলেন। মুহম্মদী বেগ সে সুযোগটুকু দিতে পারেনি। নির্মমভাবে নামাজরত সিরাজকে পিছন দিক থেকে তরবারির আঘাতে শহিদ করে। সেই মুহম্মদী বেগের মৃত্যু হয়েছিল বিকৃত মস্তিষ্ক নিয়ে অন্ধকার কুপে বিনা কারণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার মাধ্যমে। পলাশীর খলনায়ক মীরজাফরের মৃত্যু হয়েছিল প্রাণঘাতী কুষ্ঠরোগে। জগৎশেঠ এবং আমির চাঁদের মৃত্যু হয়েছিল গঙ্গায় ডুবে। ইয়ার লতিফ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। ইতিহাস আজো জানে না এই বিশ্বাসঘাতকের ভাগ্যে কি ঘটেছিল। মহারাজ নন্দন কুমার ফাঁসির আসামি হয়ে কারাগরেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। রায়দুর্লভ কারাগারে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছিলেন। উমিচাঁদ পাগল হয়ে রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরতেন এবং রাস্তায় তার মৃত্যু হয়। রাজবল্লভ পদ্মায় ডুবে মরেছিলেন। ওয়াটসন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অল্পবয়সে মারা যান। স্ক্রাফটনের মৃত্যু হয় কলকাতা থেকে বিলাত ফেরার সময় জাহাজ ডুবিতে। পলাশীর যুদ্ধের অন্যতম খলনায়ক ক্লাইভ ভারতবর্ষ থেকে বিলাতে ফিরে যাওয়ার পর সে দেশের সংসদে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। এই অভিযোগের অপমান সইতে না পেরে বাথরুমে ঢুকে ক্ষুর দিয়ে নিজের গলা নিজে কেটে আত্মহত্যা করেছিলেন।

দুর্ভাগ্য যে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নিতে চায় না। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম শিক্ষাকে এড়ানোর সাধ্য কারো নেই; দুর্বিনীত ইংরেজ জাতির অহমিকা ছিল তাদের সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না। আজ পুরো জাতি অস্তমিত। এটাই ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি। এ পরিণতি থেকে কেউ রক্ষা পায় নি এবং ভবিষ্যতেও পাবে না। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তির কিছু অংশ দুনিয়াতেই হয়ে যায়। কারণ হয়তো আমরা যাতে সতর্ক হতে পারি। বিশ্বাসঘাতকতা, জালিয়াতি, শঠতা সর্বপ্রকার নীচ স্বার্থপরতার মিলিত আঘাতে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটলে বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কারস্বরূপ ইংরেজদের সাহায্যে মীরজাফর বাংলার মসনদ লাভ করেন (২৯ জুন ১৭৫৭)।। মসনদে আরোহন করেই বিভিন্ন খাতে নবাব দেড় কোটি টাকা ইংরেজদের প্রদান করেন। ক্লাইভ একুশ লক্ষ টাকা পুরস্কার ছাড়াও বাৎসরিক ত্রিশ হাজার পাউন্ড আয়ের জায়গির লাভ করেন। এছাড়াও সামরিক বাহিনীর জন্য আরো পঁচিশ লক্ষ টাকা দিতে মীরজাফর বাধ্য হন। মীরজাফর তার পরমুখাপেক্ষী হীনাবস্থার প্রতি একেবারে অচেতন ছিলেন না। তিনি শিঘ্রই এটা বুঝতে পারেন যে, তাকে নামেমাত্র নবাব করে ইংরেজরা ভারতবর্ষে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই তিনি ইংরেজদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি খর্ব করার জন্য ওলান্দাজের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনে যত্মবান হন। ইতোমধ্যে ক্লাইড স্বদেশে ফিরে গেলে ভ্যান্সিটার্ট ইংরেজ কোম্পানির কলকাতার গভর্নর হয়ে আসেন (জুলাই ১৭৬০)। মীরজাফরকে দোহন করে যখন আর অর্থ প্রাপ্তির সম্ভবনা রইলো না, তখন ভ্যান্সিটার্ট সত্য-মিথ্যা বহু অভিযোগ তুলে মীরজাফরকে অভিযুক্ত করে অবশেষে তাকে বংলার মসনদ থেকে বিতাড়িত করেন। মীরজাফরের পদচ্যুতির ফলে তার জামাতা মীর কাশিম বাংলার মসনদে আরোহন করেন।

মীর কাশিম ইংরেজদের হাতে মীরজাফরের মতো ক্রীড়নক থাকতে প্রস্তুত ছিলেন না। পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ইংরেজগণ যে নীতি ও কর্মপন্থা গ্রহণ করে আসছিল, তাতে কোম্পানির সাথে বাংলার নবাবের মৈত্রী স্থাপন সম্ভব ছিল না। ফলে ইংরেজদের সাথে আরেকটি সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ১৭৬৪ সালের বক্সার যুদ্ধে মীর কাশিম ইংরেজ সেনাপতি মেজর হেক্টর মুনরোর নিকট শোচনীয় পরাজিত হন।  পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতার পর ব্রিটিশরা যে ক্ষমতা লাভ করেছিল তা পরিপূর্ণতা লাভ করল বক্সারের যুদ্ধের পর। এই যুদ্ধের পর ব্রিটিশ শক্তিকে আর নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য যুদ্ধ করতে হয়=নি। এজন্য বলা হয়ে থাকে বক্সারের যুদ্ধ পলাশী যুদ্ধের অনিবার্য ফল। যার জন্য দায়ী ছিল কতিপয় স্বার্থান্বেষী এদেশীয় দোসর।

লেখক : প্রভাষক, সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা

-বাবু/এ.এস







Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy