রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা কমানোর জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাদের ইতিমধ্যেই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে একটি বিধ্বংসী আঘাত। এই কাটব্যাক অনিবার্যভাবে একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলবে; যারা ইতিমধ্যেই অকল্পনীয় ভয়াবহতা সহ্য করেছে। স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবা হ্রাসের ফলে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাবে, বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের মধ্যে। বিশুদ্ধ পানি এবং স্যানিটেশন সুবিধার অভাব রোহিঙ্গাদের রোগের সম্মুখিন করবে, যা ইতিমধ্যেই উপচেপড়া ক্যাম্পে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করবে। শিক্ষামূলক কর্মসূচিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে।
তদুপরি, এই সহায়তা হ্রাস রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য একটি হতাশাজনক বার্তা পাঠায়, যারা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং মনোযোগের অভাব অনুভব করেছে। এটি তাদের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকে ক্ষুণ্ন করে, তাদের রাষ্ট্রহীনতাকে স্থায়ী করে। এই সিদ্ধান্ত তাদের প্রান্তিক অবস্থাকে আরও ঢেকে ফেলবে এবং দারিদ্র্য ও হতাশার চক্রকে স্থায়ী করবে।
ড. আজিম ইব্রাহিম ওয়াশিংটন ডিসিতে নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির বিশেষ উদ্যোগের পরিচালক এবং ‘দ্য রোহিঙ্গাস : ইনসাইড মায়ানমারস জেনোসাইড’ (হার্স্ট, ২০১৭)-এর লেখক। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অবিলম্বে প্রত্যাবর্তনের পত উন্মুক্ত করতে হবে। ২১ জুন আরব নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগণকে সমর্থন করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। রোহিঙ্গাদের সাহায্য কমানোর মাধ্যমে মানবাধিকার সমুন্নত রাখা অতিঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থাগুলোকে বরাদ্দ কমানোর এই সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করতে হবে এবং রোহিঙ্গা জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য পুনরুদ্ধার করতে চাপ দিতে। মিয়ানমার সরকারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি নিপীড়ন ও বৈষম্য বন্ধের দাবি জানাতে হবে। জাতিসংঘকে অবশ্যই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য পূর্ণ খাদ্য রেশন পুনরুদ্ধার করার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উপরন্তু, সংকটের মূল কারণগুলোকে মোকাবেলা করা অপরিহার্য। আর পূর্ণ অধিকার ও সুরক্ষাসহ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় তাদের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বরাদ্দ কমানোর এই সিদ্ধান্ত তাদের প্রান্তিক অবস্থাকে আরও সংহত করে এবং দারিদ্র্য ও হতাশার চক্রকে স্থায়ী করবে। রোহিঙ্গা জনসংখ্যার জন্য জাতিসংঘের সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত মানবতার প্রতি অবমাননা এবং দুর্বলদের রক্ষা করার জন্য আমাদের দায়িত্বেও সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের দুর্দশা ও অবিচারের দিকে চোখ থেকে চোখ অন্যদিকে ফেরাতে পাওে না। এই সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করতে হবে, প্রয়োজনীয় সহায়তা পুনরুদ্ধার এবং সংকটের স্থায়ী সমাধানের দিকে কাজ করার জন্য আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। শুধুমাত্র তা করার মাধ্যমেই আমরা মানবাধিকারের মৌলিক নীতিগুলোকে সমুন্নত রাখতে পারব, ন্যায়বিচারের প্রচার করতে পারব এবং রোহিঙ্গা জনগণের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারব।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির খাদ্য রেশনের সাম্প্রতিক হ্রাস ইতিমধ্যেই ঝুঁিিকপূর্ণ এ জনগোষ্ঠীর উপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিমাসে ১২ ডলার থেকে মাত্র ৮ ডলারে এই ঘাটতি শরণার্থীদের মিয়ানমারে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেনÑ এই হ্রাস অনিবার্যভাবে অপুষ্টি, শিশুমৃত্যু, সহিংসতা এবং এমনকি মৃত্যুর হার বাড়িয়ে তুলবে। মরিয়া পরিস্থিতি কিছু শরণার্থীকে জনাকীর্ণ শিবিরে ক্ষুধা ও সম্ভাব্য মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিবে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশত্যাগে বাধ্য করার প্রচেষ্টার সাথে খাদ্য রেশন কমানোর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকার ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফিরে যেতে বাধ্য করার জন্য খাদ্য অস্ত্র দিয়েছিল, যেখানে তাদের জন্য নিপীড়ন অপেক্ষা করছিল। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আবারও বাংলাদেশের কক্সবাজারের শিবিরে সীমাবদ্ধ, কাজ করার অনুমতি নেই। তাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে শুধুমাত্র খাদ্যের উপর।
কক্সবাজারে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সাব-অফিসের প্রাক্তন প্রধান অ্যালান সি লিন্ডকুইস্টের একটি প্রতিবেদনে ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রকাশ করা হয়েছে। সরকার শরণার্থীদের ‘এত আরামদায়ক করবে না যে তারা (মিয়ানমার) ফিরে যাবে না।’
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাতা স্বল্পতার কারণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এসব কম করছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা আন্তর্জাতিক দাতাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয় থেকে অনেক দূরে। এই সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশ উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য পূর্ণ খাদ্য রেশন পুনরুদ্ধার করার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করতে জাতিসংঘকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার ও মঙ্গল নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক দাতাদের এগিয়ে আসা উচিত এবং তাদের দায়িত্ব পালন করা উচিত।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, দাতা দেশ এবং বাংলাদেশকে অবশ্যই টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে সহযোগিতা করতে হবে; যা সংকটের মূল কারণগুলোকে মোকাবেলা করে রোহিঙ্গা জনগণের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মঙ্গল নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও উজ্জ্বলতার দিকে সচেষ্ট হতে পারি।
লেখক : গবেষক
-বাবু/এ.এস