
X
১৯৬৫-৬৬ সালের দিকে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখনকার কথা। বাণিজ্য অনুষদে আমার একটা অধীত বিষয় ছিল বিপণন (মার্কেটিং), যাকে বাজারজাতকরণও বলা হয়। এ বিষয়ে অধ্যয়নকালে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা ‘মনোপলি’, ‘সিন্ডিকেট’, ‘কার্টেল’, ‘অলিগোপলি’ ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দিতেন। তারা বলেছিলেন, এসব একচেটিয়া কারবার, যার পরিচিতি বিভিন্ন নামে-এরা পুঁজিবাদের সন্তান, বলা যায় ‘কুলাঙ্গার’ সন্তান। এরা প্রতিযোগিতা মানে না; মেধা, দক্ষতা ও শ্রমের কোনো মর্যাদা দেয় না।
‘মনোপলি’, ‘সিন্ডিকেট’, ‘কার্টেল’ ও ‘অলিগোপলি’ হচ্ছে ভোক্তাবিরোধী শক্তি। তাদের এক নম্বর এবং শেষ নম্বর অগ্রাধিকার হচ্ছে মুনাফা, অতিমুনাফা, ফুকুটে লাভ। বাজারকে প্রভাবিত করা, বাজারে সংকট তৈরি করা, ঝড়ে-বৃষ্টিতে, বন্যায় পণ্যের দাম বাড়ানো তাদের নিয়মিত কাজ। এসব শুনে শুনে মুখস্থ করেছি, বই পড়েছি, পরীক্ষা দিয়েছি, ‘টিউটোরিয়াল’ দিয়েছি। কিন্তু এসবের বাস্তবে মাহাত্ম্য কী তা বুঝতে পারিনি। এখন ধীরে ধীরে বুঝতে বুঝতে বুড়ো হওয়ার পথে।
পণ্যভিত্তিক সিন্ডিকেট কী, বাজারভিত্তিক সিন্ডিকেট কী, তারা কীভাবে বাজার থেকে টাকা তুলে নেয়, কীভাবে কর ফাঁকি দেয়Ñ এখন তা আর বইয়ের অধীত বিষয় নয়। এখন প্রতিদিন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। পাচ্ছি না শুধু, এসবের ওপর লিখছি। সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনছি, মিডিয়া রিপোর্ট পড়ছি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, কোনো সরকারই কখনো তা স্বীকার করতে চায় না। তারা একে চাহিদা ও সরবরাহের বিষয় বলে চালিয়ে দেয় এবং তা সরকারভেদে সবাই করে।
তবে ইদানীং একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারের ভেতরের লোকেরা, এমনকি মন্ত্রীরা পর্যন্ত ‘সিন্ডিকেটের’ দৌরাত্ম্যের কথা বলছেন। এই যেমন পেঁয়াজের ঘটনা। হঠাৎ করে এ খাদ্যপণ্যটির দাম হু হু করে বাড়তে বাড়তে ১০০ টাকা কেজিতে ওঠে। কোনো কারণ নেই। পেঁয়াজের ফলন দেশে ভালো হয়েছে। আমদানির পরিমাণও ভালো। কিন্তু তবুও পেঁয়াজের দাম বাড়ে অস্বাভাবিক হারে। চারদিকে হইচই। সিন্ডিকেটের কারসাজি বলে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হতে থাকে।
অনেকদিন পর সরকার পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নিলে এর দাম কিছুটা নিম্নমুখী হয়। কেন এভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করা হলো, কেনই বা পরে আমদানির সিদ্ধান্ত হলো? এতে কার লাভ, কার ক্ষতি হলো? সম্প্রতি এর ভালো একটা জবাব দিয়েছেন সরকার সমর্থক একজন সংসদ-সদস্য, যিনি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান। তিনি বাজেটের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘চড়া দামে পেঁয়াজ কিনতে হলো, তাতে কোটি কোটি টাকা অসৎ ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিল। তার ভাগ আসলে অন্য কেউ পায় কিনা, সেই প্রশ্নই থেকে যায়। নয়তো বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো বাস্তবভিত্তিক তৎপরতা দেখি না।
আমি উল্লেখ করে বলতে পারি, শুধু মুরগি ও ডিমের বাজারে সিন্ডিকেট করে কাজী ফার্মস, প্যারাগন, সিপি বাংলাদেশসহ হাতেগোনা কতিপয় প্রতিষ্ঠান মাত্র ৫২ দিনে প্রায় ৯৩২ কোটি টাকা লুটে নিয়েছে।’ মারাত্মক অভিযোগ। এটা কোনো সাধারণ ব্যক্তির অভিযোগ নয়, সরকার সমর্থক সংসদ-সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রীর। তাও অভিযোগ করা হয়েছে সংসদে সব গণ্যমান্য মন্ত্রীর সামনে। তিনি শুধু পেঁয়াজের সিন্ডিকেটের কথা বলেননি, বলেছেন মুরগি ও ডিমের সিন্ডিকেটের কথাও। শুধু তাই নয়, সিন্ডিকেটের সদস্য কারা তাদের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। কত টাকা ৫২ দিনে লুট করা হয়েছে, তাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
দেখা যাচ্ছে শুধু তিনি নন, কিছুদিন আগে শিল্প প্রতিমন্ত্রী এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পণ্যভিত্তিক সিন্ডিকেটের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা বাজারে দেখি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি; কেন ঊর্ধ্বগতি? আমাদের কোনো কিছুর অভাব নেই। আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাল, ডাল, তরিতরকারি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে সবকিছুতেই পরিপূর্ণ। এরপরও সিন্ডিকেটের কারণে দেশের এই অবস্থা বিরাজ করছে।’ মন্ত্রী মহোদয়ের কথা থেকে কী বোঝা যাচ্ছে? বোঝা যাচ্ছে না কি মন্ত্রীরাও অসহায়?
সরকার সমর্থক সংসদ-সদস্য, শিল্প প্রতিমন্ত্রী শুধু নন, এই অসহায়ত্বের কথা আমরা নিকট অতীতে আরও অনেক মন্ত্রীর মুখ থেকে শুনেছি। এই যেমন বাণিজ্যমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রীÑ দুজনই চাল, ডাল, পেঁয়াজের বাজার পরিস্থিতির ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে কয়েকবার অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। পরিকল্পনামন্ত্রী তো হরহামেশাই ফুর্তির মেজাজে অনেক সত্য কথা বলে ফেলেন। এই যেমন, তিনি সরকারি পণ্য নিয়ে এলাকায় যান, এগুলো কারা পায় তা তিনি জানেন না। এ ধরনের পরিস্থিতিকেই প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একবার বলেছিলেন, ‘সরকারের ভেতর সরকার আছে।’ এর অর্থ কী? রাজনীতিকরা বলছেন, রাজনীতি তাদের হাতে নেই। তা চলে গেছে আমলা-কামলা-বিগ বিজনেসের কাছে। তাহলে উপায়?
যে সিন্ডিকেট নিয়ে এত কথা সেই পণ্যভিত্তিক সিন্ডিকেটের কথা একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বেশ কয়েক বছর আগেই বলেছিল। তখন একে পাত্তা দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছিল, এসব হচ্ছে ব্যবসাবিরোধী, অ্যান্টি-মানি ‘লবির’ ফান্ড। সেকাল গেছে। সরকারই ‘সিন্ডিকেটে’র কথা বুঝেছে। বুঝে-শুনেই ২০১২ সালে ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন’ গঠন করেছে সরকার। তার বোর্ড আছে, চেয়ারম্যান আছে, অফিস আছে। মাঝে মাঝে তারা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলে কী কী তাদের দায়িত্ব ও কাজ। পরিষ্কার বোঝা যায়, তাদের আইনি দায়িত্ব হচ্ছে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দূর করে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ অব্যাহত রাখা। ক্রেতা সাধারণের স্বার্থ রক্ষা করা, ব্যবসায় উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা তাদের কাজ। তাহলে প্রশ্ন, এই সংগঠনটির বয়স তো হয়েছে ১১ বছর, তারা কী দায়িত্ব পালন করছে? তাদের উপস্থিতিতে কী করে একশ্রেণির ব্যবসায়ী/শিল্পপতি বাজারকে কুক্ষিগত করে সেখান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিচ্ছে? কী করে তারা কর ফাঁকি দিয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়ে তুলছে?
অভিযোগ আছে, তাদের কেউ কেউ লাভের টাকা নয় শুধু, ব্যাংক ঋণের টাকাও দেশ থেকে পাচার করে দিচ্ছে। যাচ্ছে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়। সাম্প্রতিককালে দুবাই তথা সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এসব কী করে হচ্ছে? তবে কি আইনি দুর্বলতা আছে? প্রশাসনিক দুর্বলতা আছে? সরকারের সদিচ্ছার অভাব আছে? এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। শুধু বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন নয়, দেশে রয়েছে আরেকটি জবরদস্ত আইন। এর নাম ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯’। ২০২২ সালের মার্চে তারা একটা ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, তারা ১৯ রকমের ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কাজ ও অপরাধের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। এসব শাস্তির মধ্যে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড উভয়ই আছে।
দেখা যাচ্ছে, যেসব ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজের কথা তারা বলেছে, এর সব কয়টিই হরদম বাজারে চালু আছে। অথচ এর কোনো প্রতিকার নেই। মাঝে মাঝে ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়রা ঝটিকা অভিযানে যান। এসব ইউটিউবে প্রকাশ করা হয়। লাইভ ভিডিও করা হয়। প্রচার আর প্রচার। উপরোক্ত দুই আইন ছাড়াও দেশে রয়েছে আরও কমপক্ষে ডজনখানেক আইন, যার উদ্দেশ্য পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, মজুতদারি, মুনাফাখোরি রোধ করা। একচেটিয়া কারবার নিরুৎসাহিত করা। চাল, ডাল, নুন, তেল ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিপণন কীভাবে হবে, কত পণ্য কতদিন স্টক করা যাবে, পণ্যের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবেÑ ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই এসব আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সরকারকে।
পরিস্থিতি যা আছে তা-ই নয়, বরং দিন দিন তার আরও অবনতি ঘটছে। একশ্রেণির ব্যবসায়ী সমাজ, সরকার, রাষ্ট্র, আইন-সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চুটিয়ে মুনাফা করে যাচ্ছে। তাদের ‘উইন্ডফল’ গেইনের ওপর এবার ট্যাক্সের কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ প্রত্যেক পণ্যে নিয়মিত সংকট তৈরি করে তারা বাজার থেকে টাকা লুট করে নিচ্ছে। ওই টাকার কিছু অংশ দেশে, বাকি অংশ বিদেশে পাচার করছে। এসব কথা আজ প্রকাশ্যে আলোচনা হয়। সাধারণ মানুষ অসহায়, সরকার অসহায়, মন্ত্রীরা অসহায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অসহায়। কারণ ওই ব্যবসায়ীরা প্রচণ্ড শক্তিশালী একটি গোষ্ঠী। অর্থনীতি, ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স, ব্যাংক-বিমা-সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে। উপরন্তু রাজনীতি। তারাই এখন সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী। রাজনীতি, ব্যবসা, ব্যাংকিং, বিমা সব একাকার। তাহলে করণীয়? কেন এসব হচ্ছে? ফল কী দাঁড়াচ্ছে?
স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, দেশ চলে গেছে মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল শ্রেণির লোকের হাতে। উৎপাদকরা বঞ্চিত। বঞ্চিত ভোক্তারা। চাল, ডাল, নুন, তেল, তরিতরকারি, শাকসবজি, মাছ-মাংস, দুধ-ডিম-এসব ক্ষেত্রে আমাদের কৃষক ভাইদের অবদান অতুলনীয়। তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও বাস্তব জ্ঞানের কারণে আমরা কৃষিপণ্যের প্রায় সবকটিতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎপাদন বেড়েছে আশানুরূপভাবে। মাছের উৎপাদন বেড়েছে, মাংসের উৎপাদন বেড়েছে, ফলের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-উৎপাদন বেড়েছে, এর ফল কি কৃষক/উৎপাদকরা পাচ্ছেন? এর উত্তর বড় একটি ‘না’। তাহলে কি উৎপাদন বৃদ্ধির ফল ভোক্তারা পাচ্ছেন? তাও না।
বুধবার গিয়েছিলাম পুরান ঢাকার সূত্রাপুর বাজারে। সেখানে খাসি/গরুর মাংসের দোকানের অধিকাংশই দেখলাম খালি। জিজ্ঞেস করলে দোকানিরা একবাক্যে বললেন গরু/খাসির মাংসের যে দাম তাতে ক্রেতারা দোকানমুখী হন না। গরুর মাংস ৮০০ টাকা কেজি, খাসির মাংস ১২০০ টাকা কেজি। এত দাম দিয়ে কে খাবে মাংস? যে বেলে মাছ এক সময় কেউ খেত না, তার দাম ১০০০-১২০০ টাকা কেজি। পুঁটির কেজি ৭০০-৮০০ টাকা। এর অর্থ কী? উৎপাদন বৃদ্ধি পেল, কিন্তু ভোক্তার কোনো লাভ হলো না। এসব বাজারেও নাকি ‘সিন্ডিকেট’ ঢুকেছে, যে কারণে এক টাকার পণ্য খুচরা বাজারে এলেই তিন টাকা হয়ে যায়। ছোট-বড়-মাঝারি সব ব্যবসায়ী/শিল্পপতি চুটিয়ে ব্যবসা করে নিচ্ছেন।
এই যে ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগী ও ক্রোনি ক্যাপিটালিজমভিত্তিক অর্থনীতি আমরা দাঁড় করিয়েছি, তার পরিণতি কী? কারা তৈরি করল এ পরিবেশ? বলা চলে, সরকারি নীতিই এর জন্য দায়ী। সরকার চায় কিছু লোক টাকা বানাক। এর উদাহরণ ১৯ জুন সরকার সমর্থক একজন সংসদ-সদস্য সাবেক মন্ত্রী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কুইক রেন্টালের নামে যারা পাওয়ার প্ল্যান্ট বানিয়ে বসে আছে, এর জন্য সরকার তাদের প্রতিমাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেয় ক্যাপাসিটি চার্জের নামে। আর এর পরিমাণটি কত জানেন? গত ১০ বছরে ৯০ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে তিনটি পদ্মা সেতু করা যেত। কিন্তু এখন যে বিদ্যুৎ নেই, বিদ্যুতের সংকট, তাহলে এ কোম্পানিগুলো কোথায়? তাদের বিদ্যুৎ পাচ্ছি না কেন?’ শুধু এসব হিসাব নয়Ñ কারা কারা এসব অর্থ পেয়েছেন, তাদের নামও তিনি সংসদে বলেছেন। এর দ্বারা কী বোঝা যায়? সরকারি নীতিই কি কিছু লোককে ধনী বানাচ্ছে না?
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
-বাবু/এ.এস