
X
শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা। শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ এবং সামাজিক শিশুই নির্মল পৃথিবী গড়তে পারে। শিশুর সুন্দর শৈশব এবং অনাবিল ভবিষ্যতের জন্য দরকার সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা। লেখাপড়া, খেলাধুলা এবং সুন্দরভাবে তার জীবনকে আনন্দময় করতে স্বাভাবিক জীবন একান্ত কাম্য। শৈশবেই শিশুর মেধা বিকাশের সময়। আর এ সময়ে সঠিকভাবে গড়ে ওঠা শিশুই আগামীদিনের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর একটি নিজস্ব জগৎ গড়ে ওঠে, তাতে আমাদের বাধা দেওয়া উচিত নয়।
শিশুদের মৌলিক মানবিক বিষয়ের মধ্যে চিত্তবিনোদন একটি। তাই তার সঠিক বিকাশে সুস্থ ও শিশুবান্ধব বিনোদনের ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনার ধারায়ও এসেছে পরিবর্তন। নতুন নতুন অনেক কিছুই সিলেবাসে যোগ হচ্ছে, যা আগে ছিল না। এছাড়া সচেতন নাগরিক মাত্রই চান তার সন্তান সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক, সমাজে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক। আর পড়ালেখায় ভালো ফলাফলকেই সাফল্যের চাবিকাঠি মনে করার কারণে শিশুদের সব সময় পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখতে চান অভিভাবকরা। স্কুলের পড়াশোনায় বিভিন্ন নতুন সংযোজন এবং পিতামাতার অতিসচেতনতা শিশুদের মধ্যে এক ধরনের চাপের সৃষ্টি করে যার ফলে শিশুদের ওপর পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক উভয় বিকাশকেই বাধাগ্রস্ত করে। অতিরিক্ত চাপের ফলাফল আসলে ভয়াবহ। শিক্ষা জীবন হুমকির মুখে পড়ার মতো ঘটনা ঘটাও বিচিত্র কিছু নয়। অনেক সময় দেখা যায় কিছু শিশু একটি নির্দিষ্ট ক্লাসের পর আর পড়াশোনায় ভালো ফলাফল করতে পারে না। ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, মনোযোগের প্রচণ্ড অভাব সৃষ্টি হয়। এ ঘটনাগুলো হচ্ছে পড়াশোনায় অতিরিক্ত চাপের চূড়ান্ত ফলাফল। এক্ষেত্রে শিশুটি ধীরে ধীরে পড়াশোনায় ভয় পেতে শুরু করে। কিন্তু অধিকাংশ অভিভাবকই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন না।
আজ থেকে আরও কয়েক বছর আগেই এসব নিয়ে কথা উঠেছিল, কিন্তু সাধারণের আলোচনা দিনশেষে গুরুত্বহীন থেকে যায়। যুক্তিহীনভাবে বইয়ের বোঝা বাড়ানোর কুফল তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু এর কিছু স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি কুফলগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিশুর মধ্যে পড়ালেখার প্রতি ভীতি সৃষ্টি হয়, নবিদ্যালয়ে যাওয়ার অনাগ্রহ তৈরি হয়, পাঠ্যবইকে অপছন্দ করতে শেখে, তার ব্যাগের বোঝা দিন দিন ভারি হতে থাকে। খেলাধুলা ও অন্যান্য শিশুতোষ কাজ বাদ দিয়ে বইয়ের প্রতি সময় দিতে হয়, সামাজিকতা ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্রগুলো ক্ষীণ হতে থাকে ইত্যাদি।
অপরদিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে নিজের সন্তানকে একইভাবে বা এর চেয়েও বেশি কঠোরভাবে বড় করে তোলার প্রবণতা থাকে, সৃজনশীল ও মননশীল বইপড়ার সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা, নিজের চিন্তাভাবনাকে কাঠামোর মধ্যে ফেলে রাখা ও এর বাইরে না যেতে পারা ইত্যাদি কিছু। শিশুর মানসিক, সামাজিক, আবেগিক, ভাষাগত, যোগাযোগ ও গাণিতিক দক্ষতার বিকাশে বই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম; কিন্তু একমাত্র নয় অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দিন দিন বইয়ের বোঝা বাড়ছে। সে অনুযায়ী কি বিদ্যার বোঝা বাড়ছে? উত্তরটা সম্ভবত আমাদের সবার জানা। এ সমস্যার সমাধানও জানা; কিন্তু সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিভাগ ও বিদ্যালয়গুলোকে। প্রতিযোগিতামূলক এই পৃথিবীতে অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে অন্য সবার চাইতে আলাদাভাবে গড়ে তুলতে চাইবেন তা স্বাভাবিক; কিন্তু শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক রচনা, বইয়ের বোঝা ও শিশুদের মানসিক বিকাশ যে পরস্পর-সম্পর্কিত, সেসব ধারণা ও জ্ঞান সবার মধ্যে থাকবে তা আশা করা ঠিক নয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যদি এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে বইয়ের বোঝা কমিয়ে বিদ্যার বোঝা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়, তাহলে তা সবার জন্যই মঙ্গলকর হবে।
আমরা যদি উন্নত দেশগুলোর শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে থাকাই, তখন আমাদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ব্রিটেনের প্রাইমারি স্কুলের নার্সারিতে শিশুরা যখন ভর্তি হয়, তখন স্কুলে যেতে তার কাঁধে নেই কোনো বইয়ের বোঝা। মা-বাবা শুধু টিফিন সঙ্গে করে স্কুলে দিয়ে আসেন। বাকি দায়িত্ব স্কুলের শিক্ষকদের। শিশুদের বাসায় নেই কোনো বইখাতা। স্কুলেই ড্রয়িং, খেলাধুলা আর নানা বিনোদনে ব্যস্ত শিশুরা। তাদের কাছে স্কুল শুধুই বিনোদনের ক্ষেত্র। তাই তো শিশুরা বাসায় থাকতে চায় না। কখন স্কুলে নিয়ে যাবে সেই অপেক্ষায় থাকে। বাসায় কোনো পড়াশোনা নেই। স্কুলের শিক্ষকরাই তার সব। স্কুলে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, পুরো স্কুলই যেন একটি শিশুপার্ক। শুধু প্রাইমারি স্কুলই নয়, ব্রিটেনের সব স্কুলেরই একই চিত্র। বিনোদনের মাধ্যমেই পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা। শিশুরাও স্কুলে যাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকে। অভিভাবকরা কোনো দিন স্কুলে নিতে না চাইলে বাচ্চারা কান্নাকাটি করে। স্কুলের শিক্ষকদের কাছে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠে শিশুরা।
এখানে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, সাদা-কালো বলে মেধার মানদণ্ডে কোনো বিভাজন করা হয় না। বিদ্যালয়ের স্লোগান হলোÑ সব শিশুকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। তাই কোনো শিশু যদি মনে হয় পিছিয়ে পড়ছে, তার জন্য অতিরিক্ত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। জানা যায়, ব্রিটেনের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বাচ্চাদের কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না।
এমনকি মুখস্থ বিদ্যার বিষয়টি এখানকার বাচ্চারা বোঝেও না। এখানে একটি শিশুর স্কুল শুরু হয় ৩ বছর থেকে। ৩ থেকে ৫ এই দুই বছর তারা নার্সারি ও রিসিপশন শেষ করে ইয়ার ওয়ান শুরু করে। ১১ বছরে তারা পড়ে ইয়ার সিক্সে। পুরো প্রাইমারিতে কোনো পরীক্ষা পদ্ধতি নেই। ইয়ার নাইন থেকে শুরু হয় বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা।
ছোটদের ক্লাসে বেশির ভাগই ধাঁধা মেলানো, লেগো দিয়ে নতুন কিছু তৈরি, ছবি আঁকা,রং করা এসবের মধ্য দিয়ে শেখানো হয়। স্কুলগুলো ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের নারী-পুরুষ বৈষম্যহীনতার শিক্ষার সংস্কৃতি চালু করে খেলনা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। ব্রিটেনে বাচ্চারা যখন খেলে তখন ছেলেমেয়ে হিসাব করে বল বা হাঁড়িপাতিল দেওয়া হয় না। এখানে সবাই সবকিছু নিয়ে খেলতে পারে। এখানে ইংরেজি, অংক, বিজ্ঞান, ভুগোল যেমন পড়ানো হয় তেমনি বাস্তববাদী শিক্ষার ওপরও জোর দেওয়া হয়। এখানে শারীরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক।
সত্যি কথা হচ্ছে, শিশু শিক্ষার যে ব্যবস্থাটা আমাদের দেশে রয়েছে, তা যথার্থ নয়। এটাতে আরও পরিবর্তন আনা দরকার, উন্নতি সাধন করা দরকার। যাতে করে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে পড়তে পারে। এছাড়া পরীক্ষার চাপ থেকে শিশুদের মুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের পরীক্ষা থেকে মুক্ত করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, স্কুলের পড়া আর অভিভাবকদের চাহিদার চাপে পরে শিশুদের সোনালি শৈশবই হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। অতিরিক্ত কোনোকিছুই ভাল নয়; তা সে যত ভাল জিনিস বা বিষয়ই হোক না কেন। সে হিসেবে বইয়ের বোঝা বাড়াবাড়ি রকমে বেড়ে যাওয়া যেমন খারাপ, একইভাবে বিদ্যার বোঝা বাড়াটাও খারাপের পর্যায়ে ফেলতে হয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষার যে মানের সঙ্গে আমরা পরিচিত, সেখানে বিদ্যার বোঝা বাড়াটা নেতিবাচক অর্থে দেখার সুযোগ নেই।
শিশুকে তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখালে সে সহজে শেখে শেখার কৌশল। সেটা একবার রপ্ত করতে পারলে তামাম দুনিয়া চেনা তার জন্য সহজ হয়ে যায়। সে জন্য নিজের বসতবাড়ি, গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলার ও দেশের ইতিহাস, ভূগোল, প্রকৃতি বিষয়ে জানার জন্য অভিজ্ঞতাভিত্তিক পাঠই আদর্শ। সারা দুনিয়ার বোঝা শিশুর ঘাড়ে চাপানো কখনোই উচিত নয়। কাজেই সমাজপাঠ হতে পারে এমন একটি পাঠ্যপুস্তক, যেটি শিশু তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখতে পারে। এতে শিক্ষার ভিত মজবুত হয়, দেশপ্রেম পোক্ত হয়। শিক্ষা সৃজনশীল হয়।
বাংলাদেশের মতো এত ঘন ঘন পরীক্ষা পদ্ধতিও কোথাও নেই। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমানে মানসম্মত শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গুণগত ও মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা পরবর্তী শিক্ষার মূল ভিত্তি। বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি। শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তির ওপর নির্ভর করে পছন্দমতো পরবর্তী শিক্ষার ধারাকে বেছে নেয়। কারিগরি, বিজ্ঞান, কলা বা বাস্তবমুখী শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম নিজেদের আগামী দিনের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে বাস্তব এ চিত্র সামনে রেখেই দেশকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সার্বিক প্রয়াস চালাতে হবে।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
বাবু/এ.এস