ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

অভিজিৎ বড়ুয়া অভি

মতামত

ভারতে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়। স্বাধীনতা দিবসটি ভারতের জন্য ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং একটি

2023-07-05T15:38:09+00:00
2023-07-05T15:38:09+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অর্থনীতি
অভিজিৎ বড়ুয়া অভি
প্রকাশ: বুধবার, ৫ জুলাই, ২০২৩, ৩:৩৮ পিএম   (ভিজিট : ৩৫৪)
X


ভারতে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়। স্বাধীনতা দিবসটি ভারতের জন্য ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং একটি স্বাধীন জাতির প্রতিষ্ঠা দিবস। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বর্তমানে ভারত ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথে, জাপান এবং জার্মানিকে ছাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম স্টক মার্কেট হবে। ফরাসি অর্থনীতিকে পেছনে ফেলে ভারত ২.৬৬ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রকৃত জিডিপিসহ বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। ভারতীয় অর্থনীতিও বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভারত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। পশ্চিমা দেশগুলো ভারতের সাথে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। শিল্পখাতকে বাড়ানো এবং রপ্তানি বাড়াতে ভারত ২০২১ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মরিশাসের সাথে চুক্তি করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং কানাডার সাথে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। রাশিয়া যার পশ্চিমের সাথে বাণিজ্য গতবছর ইউক্রেনে আক্রমণের পর থেকে হ্রাস পেয়েছে, তারাও ভারতের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আশা করে যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি এই বছর ৫.৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ সমস্ত বড় উদীয়মান এবং উন্নত অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাবে। যদি ভারত তার গতি বজায় রাখতে পারে, তাহলে ভারত ২০২৬ সালে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হিসাবে জার্মানিকে ছাড়িয়ে যাবে এবং ২০৩২ সালে তিন নম্বর স্থান থেকে জাপানকে ছিটকে দেবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই), বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির ধারণার তালিকায় পাকিস্তানকে ১৮০ এর মধ্যে ১২৪তম স্থান দিয়েছে। ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানি রুপির রেকর্ড সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। সরকার জ্বালানির দাম ১৬ শতাংশ বাড়িয়েছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তার সুদের হার ১০০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে, যা ২৬ শতাংশ পর্যন্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উচ্চসুদে নেওয়া বৈদেশিক ঋণে বর্তমানে পাকিস্তান চলছে। আগামী তিন বছরে ৮০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। পাকিস্তানের বর্তমান জিডিপি, মাথাপিছু আয়, এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অর্থনীতি থেকে বেশি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের ১২৬.৩ বিলিয়ন ডলার বহিরাগত ঋণ এবং দায় রয়েছে, যার ৩০ শতাংশ চীনের কাছে পাওনা। পাকিস্তানের রুপির দ্রুত অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে দেশটি খাদ্যের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে লড়াই করছে। এই সপ্তাহে মার্কিন ডলারের কাছে রুপি রেকর্ড সর্বনিম্ন ৩০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। বার্ষিক খাদ্য-মূল্যের মূল্যস্ফীতির হার মার্চ মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ ছিল, ভোক্তা মূল্যস্ফীতির ২৫ শতাংশ উপরে। ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক নীতির ভুলের কারণে পাকিস্তান ভারি মূল্য দিচ্ছে এবং ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোতে প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সামনের সারিতে বাংলাদেশ। এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে কৃষি, গার্মেন্টস এবং রেমিট্যান্স। মোট বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্স থেকে। আর মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি কৃষিতে। শুধু অর্থনীতি নয়, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে খাতগুলো। বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেক চালিকাশক্তি পোশাক শিল্প। বর্তমানে বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। সারাবিশে^ ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ খ্যাতি দিয়েছে এই পণ্য। এ খাত থেকে রপ্তানি আয় দেশে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ।

আইএমএফের হিসাবমতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৫ সালেই আমাদের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে এসেছে। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে দেশের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগের ফলে তৈরি পোশাক, খাদ্য-পানীয়-তামাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, ভোজ্যতেল, রাবার ও প্লাস্টিক পণ্য, ইলেকট্রনিকস, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং দ্রব্যাদি, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল প্রভৃতির উৎপাদন বেড়েছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো ও রপ্তানি উভয়ই সম্ভব হচ্ছে।

২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলার। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হবে। গোল্ডম্যান স্যাক্স এর সাম্প্রতিক সমীক্ষায় ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চায়না এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়াও বিশ্বেও সম্ভাবনাময় ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সর্বশেষ ম্যাকেনজি/ইউএসইউড রিপোর্টে বলা হচ্ছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কারণে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমার বর্তমান হার হ্রাস পাওয়ায় আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি লোকের কর্মসংস্থনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, চলতি অর্থ বছরে বাংলাদেশ তার কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হবে না। তাদের বিবেচনায় বাংলাদেশের পক্ষে ৫.২ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছেÑ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬. ২ হতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে মার্চে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩৩ শতাংশে। বিশ্বব্যাংক বলছে, উচ্চ দ্রব্যমূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথমার্ধে লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২০ কোটি ডলার। অর্থাৎ বিদেশি মুদ্রার মজুতে চাপ বাড়ছে। ডলারের একাধিক বিনিময় হারের কারণে ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ বাড়ছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।

নিঃসন্দেহে, আজকের বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মতোই গতিময় এক প্রবৃদ্ধির পথরেখায় রয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ড ১৯৮০-৯০ দশকে মাথাপিছু আয় ২,৪০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর যে পথে এগিয়ে ওই মাথাপিছু আয়কে ৪,০০০ ডলারের ওপর নিয়ে গেছে, এই দশকে বাংলাদেশও সে পথে এগোনোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে (বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২,৮০০ ডলার ছাড়িয়েছে)। এ পথে এগিয়ে যেতে পারলে ২০২৬-এর মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ৪,০০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার হবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার। যদি বর্তমান ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি অব্যাহত থাকে এবং প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের বেশি হলে ২০৩০ সাল নাগাদ তা অর্জিত হবে। প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলেও ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করবে।

লেখক : কবি ও গবেষক

বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy